সহিংসতা, দলবদল মনে করাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে ভোট আসছে
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নির্বাচন মানেই কি দলবদল আর বারুদের গন্ধ? অতীতের অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত সমীকরণ এবং পেশির লড়াই এখন রাজ্যের ভোট সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
দলবদলের হিড়িক
ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগে বা পরে এক দল থেকে অন্য দলে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটায় যেমন ৫১টি পরিবার বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছে, তেমনই নাগরাকাটায় উল্টো ছবি ধরা পড়েছে। বিজেপির পরিবর্তন সংকল্প সভায় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন ১১ জন।
তবে সাধারণ কর্মীদের চেয়েও আলোচনার কেন্দ্রে থাকছে পরিচিত মুখগুলো।
সিপিএমের প্রাক্তন নেতা প্রতীক-উর রহমান থেকে শুরু করে ফুটবলার-রাজনীতিবিদ দীপেন্দু বিশ্বাস কিংবা কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা দলবদল করেছেন।
এসএফআই-এর প্রাক্তন রাজ্য সহ-সভাপতি এবং সিপিএমের একসময়ের উদীয়মান যুব নেতা প্রতীক-উর রহমান তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।
আবার বিজেপির টিকিটে পাহাড় থেকে জয়ী হওয়া বিষ্ণুপ্রসাদ তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।
প্রাক্তন ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাসের রাজনৈতিক সফর বেশ বৈচিত্র্যময়। তিনি তৃণমূল থেকে বিজেপিতে গিয়েছিলেন, আবার পরে তৃণমূলে ফিরে এলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে টিকিট না পেয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি মানিয়ে নিতে পারেননি। নির্বাচনের পর মোহভঙ্গ হওয়ায় তিনি পুনরায় পুরনো দল তৃণমূলে ফেরার আবেদন জানান।
নীতির উপরে স্বার্থ?
রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে দলবদল করার উদ্দেশ্য মূলত ব্যক্তিস্বার্থ।
অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্ম (এডিআর) সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সঞ্চালক উজ্জয়িনী হালিম ডিডাব্লিউকে বলেন, "বর্তমানে নির্বাচনের আগে দলবদল বা নতুন দল গঠন একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই প্রবণতার পিছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো আদর্শগত লড়াইয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সমীকরণ এবং জয়-পরাজয়ের হিসাব বেশি কাজ করে। নেতারা দল ছাড়ার সময় যেসব অভিযোগ তোলেন, পরবর্তী সময়ে নতুন বা পুরোনো, কোনো দলেই সেই নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে আর চর্চা হতে দেখা যায় না। ফলে এই পরিবর্তনকে 'আদর্শের লড়াই' হিসেবে গণ্য করা কঠিন।"
তিনি বলেন, "একটি আদর্শ রাজনৈতিক দলের ভেতরে গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ থাকা জরুরি। রাজনৈতিক কর্মীদের অন্ধ আনুগত্য কাম্য নয়, যদি দল পথভ্রষ্ট হয়, তবে কর্মী নিশ্চিতভাবেই তা ত্যাগ করার অধিকার রাখেন। বাস্তবে দেখা যায়, আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত পদমর্যাদা বা সুযোগ-সুবিধার দ্বন্দ্বেই দলবদল বেশি ঘটে। এটি মূলত রাজনৈতিক সততার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।"
সহিংসতার রাজনীতি
দলবদলের খবরের সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সহিংসতা। ভাঙড়ে বিধায়ক শওকত মোল্লার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ও বোমাবাজি কিংবা বীরভূমের শান্তিনিকেতনের মতো পর্যটন কেন্দ্রের হোটেল থেকে তাজা বোমা উদ্ধার ফের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তুলছে।
বিপুল পরিমাণ বোমা উদ্ধার প্রসঙ্গে সাবেক পুলিশকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, "শাসকদলের আশ্রয় থাকলে অপরাধীদের কাছ থেকে অস্ত্র বা বোমা উদ্ধার করা হয় না। এই যে বিপুল পরিমাণ বোমা মজুত থাকছে, তা নিশ্চিতভাবেই বৃহত্তর অশান্তির আগাম সংকেত। ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং ভোটের পরেও এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে অশান্তি ছড়ানোর পরিকল্পনা থাকে।"
তার মতে, "যেখানে অনবরত বোমা পড়ছে বা গুলি চলছে, সেখানে কোনো সাধারণ ও শান্তিপ্রিয় মানুষের পক্ষে ভোট দিতে যাওয়া নিরাপদ নয়। দুষ্কৃতীদের কাজে লাগিয়ে এমন একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয় যাতে সাধারণ ভোটাররা নিরুৎসাহিত হয়। এর ফলে প্রভাবশালীরা নিজেদের লোক দিয়ে ভোট করিয়ে যাকে খুশি জিতিয়ে নিতে পারে।"
কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি
নির্বাচন কমিশন সাধারণত ভোট ঘোষণার পর বাহিনী মোতায়েন করে, তবে এবার বাংলার পরিস্থিতি বিচার করে ১ মার্চ থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম দফায় সেদিন প্রায় ২৪০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে প্রবেশ করবে। দ্বিতীয় দফায় ১০ মার্চ আরও ২৪০ কোম্পানি বাহিনী যোগ দেবে। প্রাথমিকভাবে মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী গোটা রাজ্যে মোতায়েন করা হচ্ছে।
মোট ৪৮০ কোম্পানির মধ্যে সিআরপিএফ ২৩০ কোম্পানি, বিএসএফ ১২০ কোম্পানি, আইটিবিপি ৪৭ কোম্পানি থাকছে। সঙ্গে থাকছে এসএসবি ৪৬ কোম্পানি এবং সিআইএসএফ ৩৭ কোম্পানি ।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা সাবেক পুলিশকর্তা ডিডাব্লিউকে বলেন, "কেন্দ্রীয় বাহিনী নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করে না। যাদের অধীনে এই বাহিনীকে রাখা হয়, তারা যদি এদের সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তবেই অশান্তি রুখে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তাদের সেভাবে ব্যবহার করা হয় না বলেই গন্ডগোল বন্ধ হচ্ছে না।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক মইদুল ইসলামের মতে, "কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে কয়েকশা কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হলেও, তারা কেবল নির্বাচনের সময়টুকু অর্থাৎ বড়জোর দু’মাস থাকে। ২৮ তারিখের পরে যখন কেন্দ্রীয় বাহিনী চলে যাবে, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার আগের মতোই হয়ে যাবে। তাই কেবল বাহিনী মোতায়েন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।"
কেন এই পরিস্থিতি?
নির্বাচন এলেই রাজনীতি কেন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিমবঙ্গে, এই পুরোনো প্রশ্ন এবারো ফিরে এসেছে।
অধ্যাপক ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মানুষের অতি-নির্ভরশীলতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাপক কর্মহীনতা। যুবসমাজের একটি বড় অংশ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলে তাদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। ফলে তারা রাজনৈতিক 'দাদাদের' অনুগামী হয়ে থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণতা বা 'লুম্পেনাইজেশন'-এর দিকে ঠেলে দেয়।"
তার মতে, "এই সমস্যার শিকড় নিহিত রয়েছে গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭২ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেই সময়ে শুরু হওয়া 'ক্যাপিটাল ফ্লাইট' বা ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। অথচ ৫০ বা ৬০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত শিল্পে পশ্চিমবঙ্গ মহারাষ্ট্রের থেকেও এগিয়ে ছিল। সত্তরের দশকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক গুন্ডাবাহিনীর দাপট বাম আমলেও অব্যাহত ছিল। তবে বর্তমান সময়ে একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, আগে যেখানে অপরাধীরা রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই অপরাধী বা অসাধু উপায়ে অর্থ উপার্জনকারীরাই সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন।"
সমাধানের পথ কোথায়?
সাবেক পুলিশকর্তা রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করেন,
"রাজনৈতিক দলগুলো যদি এই ভরসায় থাকতো যে মানুষ যাকে ভোট দেবে সেই জিতবে, তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতো। কিন্তু বর্তমানে দলগুলো যে কোনো প্রকারে ক্ষমতায় থাকতে বা আসতে চায়। এই মানসিকতার কারণে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির বদল হওয়ার কোনো আশা আমি দেখছি না।"
মইদুল বলেন, "কেবল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন বা নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিয়ম দিয়ে এই পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজ্যের 'পলিটিক্যাল ইকোনমি' বা রাজনৈতিক অর্থনীতির মৌলিক সংস্কার। পশ্চিমবঙ্গে এমন শিল্পায়ন প্রয়োজন যা 'শ্রমনিবিড়', অর্থাৎ যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মানুষের বেকারত্ব না ঘুচলে এবং রুটিরুজির জন্য রাজনীতির ওপর নির্ভরশীলতা না কমলে এই নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলতেই থাকবে।"
মানুষের রুটি-রুজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তুলনায় দলবদলের হিড়িক এখন বেশি আলোচনায় উঠে আসছে
উজ্জয়িনী হালিমের মতে, "নেতাদের এই ঘনঘন দলবদল সাধারণ মানুষের কাছে কোনো ইতিবাচক বার্তা পৌঁছায় না। বরং এটি বর্তমান দলীয় রাজনীতির গভীর নৈতিক সংকট ও আদর্শহীনতাকে বারবার জনসমক্ষে উন্মোচিত করে। শেষ পর্যন্ত প্রতীক-উর রহমান বা দীপেন্দু বিশ্বাসের মতো নেতাদের রাজনৈতিক নিষ্ঠার বিচার কিন্তু জনতার আদালতেই হবে।"