সাকিব এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দেখার ধাঁধা | আলাপ | DW | 26.03.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

সাকিব এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দেখার ধাঁধা

একটা জিনিস ভেবে মেলাতে পারি না- আফগানিস্তানের সঙ্গে যখন টেস্ট হারলো বাংলাদেশ, তখন আমরা অত সহজে কিভাবে ব্যাপারটা হজম করলাম! সেই অর্থে তো হাহাকার তৈরিই হয়নি আমাদের মধ্যে৷

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে দেশের মাটিতে টেস্টে হোয়াইটওয়াশ হওয়াও সমতুল্য ক্রিকেটীয় অকৃতিত্ব৷ কই, তাতেও কারো বিশেষ কিছু আসে-যায় বলে মনে হয়নি৷

তাহলে কি বিষয়টা এই যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই অধোগতি আমরা মেনে নিয়েছি? বা ক্রিকেটীয় ব্যর্থতায় দেশের ক্রিকেটের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে প্রজন্ম? না, সে রকম কিছু নয়৷ ক্রিকেটীয় উন্মাদনা আছে৷ তীব্রভাবে৷ কিন্তু ফোকাসটা বোধ হয় বদলে গেছে৷ মাঠের খেলা বা এর ফল আর খুব গুরুত্বের নয়৷ বরং বাইরের বিরোধ-উত্তেজনাতেই বেশি মন৷

কাজেই সাকিব টেস্ট না খেলার সিদ্ধান্ত নিলে, বোর্ডের বিরুদ্ধে একহাত নিলে, মাশরাফির অবসরবিষয়ক কোনো একটা ক্লু বের হলে সেসব নিয়েই মেতে থাকি৷ এখানে একটা দায় অবশ্যই মিডিয়ার৷ মিডিয়া আবার বলবে, মানুষ এটাই চায়৷ ‘ডিম আগে না মুরগি আগে'র বিতর্ক৷ তবে সোশ্যাল মিডিয়া যুগে এসে মিডিয়াকে আর একতরফাভাবে দায়ী করা যায় না৷ আগের মতো মিডিয়া আর জনমত তৈরি করে না৷ বরং ক্ষেত্রবিশেষে জনমত দেখে নিজের গতিপথ ঠিক করার সুবিধাজনক পথে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে আরো বেশি৷ সামগ্রিকভাবে ক্রিকেট বা ক্রীড়া অভিভাবকত্বের ঘাটতিতে দেশের ক্রীড়া আসলে দিকভ্রান্ত৷ সাকিবের নিয়মবিরোধিতা বা উচ্চবাচ্য সেটা প্রকাশ করে মাত্র৷

প্রথমে বুঝতে চেষ্টা করি খেলার সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা অল্পতেই থিতিয়ে যায় কেন? কারণ, এখানে বাইনারি নেই৷ পক্ষে-বিপক্ষে তর্কের সুযোগ না থাকলে মানুষ বিষয়টার মধ্যে নিজেকে ঢোকাতে পারে না৷ টানা প্রশংসা বা একমুখী নিন্দা তাই বেশিক্ষণ চলে না৷ বাংলাদেশের পারফর্ম্যান্সের ক্ষেত্রে বিষয়টা এ রকম৷ বোর্ডকে কিছু গালাগাল, দীর্ঘ মেয়াদের ক্রিকেট কেন হয় না, ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো ঠিক করতে হবে- এই কয়েকটা বিষয়ের বেশি পাণ্ডিত্য সাধারণত আমাদের নেই বলে এ আলোচনা খুব এগোয় না৷ তাছাড়া এখানে সবাই এক পক্ষ বলে তর্কও খুব জমে না৷ ও হ্যাঁ, কেউ কেউ মাঝেমধ্যে তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন৷ তবে খুব জোরালো স্বরে না৷ তাহলে আমাদের তারকারা আক্রান্ত বোধ করতে পারেন৷ ওদের আবার বিশাল ব্র্যান্ড ভ্যালু-বাণিজ্যিক কদর-ফেসুবক ফ্যানপেজজনিত শক্তি৷ কাজেই এটা খুব জমে না৷ জিতে গেলেও সেই সবাই মিলে, আমরা অসাধারণ-আমাদের অমুক পৃথিবীর সেরা-তমুক বিশ্বের বুকে...এই জাতীয় অলংকারের বেশি কিছু বলার থাকে না বলে অচিরেই ঢোল বাজানো শেষ৷ মিডিয়ার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার৷ এগুলো নিয়ে তর্ক বাধানো যায় না৷ টিভি টিআরপি বা ফেসবুক ভিউ এটাই এখন নিয়ামক, আর এ ক্ষেত্রে তর্ক চাই৷ তাদের জন্য সাকিব অসাধারণ বিষয়৷ প্রায় নিয়মিত জোগানটা দেন এবং এখানে পক্ষ-বিপক্ষ আছে৷

সাকিবের প্রায় সব কাজকে দুইভাবে ব্যাখ্যার সুযোগ আছে বলে আলোচনার জন্য অসাধারণ৷ সাকিবের মাপের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বিতর্কিত একটা কথা বের করতেই যেখানে জীবন বেরিয়ে যায়, সেখানে সাকিব মেঘ না চাইতেই বন্যা বইয়ে যাচ্ছেন৷ সবাই তাই ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ সাকিবের ভক্তকুল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কর্মীরাও নেমে পড়েন৷ তখন ওরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন, যারা মাঠের ক্রিকেটের আলোচনায় ‘ভালো খেলেছে-খারাপ খেলেছে' জাতীয় কথাবার্তার বাইরে খুব কিছু বলতে পারেন না৷ কাজেই জমজমাট সোপ৷

মুশফিকও মাঝেমধ্যে এটা-ওটা বলেন৷ তামিমেরও কিছু কথাবার্তা আসে; কিন্তু ওরা কেউ শেষ পর্যন্ত সাকিব নন৷ ক্যারিয়ারের প্রথম কয়েক বছর সাকিব-তামিম একসঙ্গে উচ্চারিত হতো, মুশফিক পরে এসে ব্যবধান কমিয়েছেন, মাশরাফিও দ্বিতীয় দফা ফিরে জনপ্রিয়তায় সাকিবের প্রতিদ্বন্দ্বী; কিন্তু সত্যি বললে, পারফর্ম্যান্সে সাকিব সবার চেয়ে বহু এগিয়ে৷ আইপিএলে তার যাওয়া এবং অন্যদের সুযোগ না পাওয়াও ওকে আলাদা করে দিয়েছে৷ তারপর তর্ক-বিতর্কের কারণে (যেটা অন্য দেশে হলে ক্ষতিকরও হতে পারতো) সব সময় আলোচনায় থাকা আমাদের বর্তমানের ভিন্নধর্মী সমাজ বাস্তবতায় সাকিবের উচ্চতা বাড়িয়েছে৷ আর হালের কর্পোরেট-বাণিজ্যিক দুনিয়া সেটাই চায়৷ সাকিব তাই একদিকে সব মিলিয়ে ফুল প্যাকেজ৷ আবার অদ্ভুত শোনালেও সত্য, কাছাকাছি মাপের অন্য তারকাদের তুলনায় তার বিরোধিতাও অনেক বেশি৷ কারণ এক, ১ নম্বরের একটা স্বাভাবিক বিরোধিতা থাকেই৷ দুই, সাকিবের অনেক কাজে সত্যিকার অর্থে নীতিগত জায়গা থেকেই বিরোধিতার সুযোগ আছে৷ ফলে সাকিব প্রায়ই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে৷ দেখে দেখে আফসোসও হয় এ জন্য যে, সাকিবের পারফর্ম্যান্স নিয়ে তো এর চেয়ে অনেক বেশি আলোচনা হতে পারতো৷ আফসোস হয় এ জন্য যে, বাংলাদেশের মানের তুলনায় তার এগিয়ে থাকা এবং সমাজে-তারুণ্যে তার প্রভাব নিয়ে বড়সড় লেখা বা গবেষণা হতে পারতো৷ সেসব বাদ দিয়ে আলোচনায় তার বিতর্ক৷ সাকিবের টেস্ট না খেলার সিদ্ধান্তে আমি মোটা দাগে দেশপ্রেমহীনতার দোষ দিই না, সেটা নিয়ে তার দিকটাও দেখার আছে, এটা পুরো ক্রিকেটবিশ্বেরই সমস্যা, আইসিসির বরং ভাবা উচিত আইপিএলের সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ করে সব দেশের ঘরোয়া লিগের জন্য উইন্ডো করা যায় কি না! এবং সাকিব বা অন্য কেউ টেস্ট খেলতে না চাইলে তাদের মোটিভেট করার চেষ্টা করা যেতে পারে (যা বোর্ড আগে করেছে বলে আমরা শুনি)৷ তবে জোর করে খেলানো যাবে না৷ আমার বরং আপত্তি আছে সেই সব জায়গায়, যেটা টিম গেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে৷ খেলাকে একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি, আমার কাছে খেলায় হার-জিতের সঙ্গে দলবদ্ধতা, একের জন্য অন্যের জীবন বাজি রেখে লড়াই, সহমর্মিতা, সমতা এগুলোরও মানে আছে৷ সেটা প্রতিষ্ঠায় দলের সেরা তারকা বা তারকাদের ভূমিকা থাকা উচিত সবচেয়ে বেশি৷ যখন কেউ সাকিবের মতো বড় হয়ে যান, তখন তাকে শাসন করার শক্তি অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে ফেলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা৷ এবং তখন যদি সেই খেলোয়াড় সহযোগিতা না করেন, তাহলে কাজটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায় বোর্ডের জন্য৷ এখানে বোর্ড বা নিয়ন্ত্রকদের অবস্থানটা আবার বেশ ইন্টারেস্টিং৷ তারকারা যখন এভাবে বড় হয়ে উঠছেন, তখন তাদের তারকাখ্যাতিকে নানাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ দেশের ক্রিকেটের পারফর্ম্যান্স যখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তখন তারাও সামনে পর্দা হিসেবে কাজে লাগিয়েছে তারকাদের দ্যুতি৷ এতে একদিকে তারকাদের কেউ কেউ নিজেদের সব কিছুর ঊর্ধ্বে ভেবে বসেছেন এবং তাদের মধ্যে এসব কিছুর প্রাপ্য হিস্যা চাওয়ার একটা অঙ্কও তৈরি হয়েছে৷ বোর্ডও তাদের হাতে রাখতে একটা পর্যায় পর্যন্ত দাবি-আবদার মেনে নিজেদের গুরুত্বই কমিয়ে ফেলেছে৷ আর তাই যখন সেই তারকা বা সাকিব বিগড়ে গিয়ে ঢিল দিচ্ছেন, তখন সঙ্গত কারণেই টালমাটাল৷ টালমাটাল আসলে পুরো ব্যবস্থাই৷ সমাধান চাইলে দুই পক্ষকেই সমঝোতায় আসতে হবে৷ বসতে হবে৷ মিডিয়াকে না জানিয়ে৷ তারা ভিনগ্রহের বাসিন্দা নন, নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমরা জানি, তাহলে এসব বিষয় সাক্ষাৎকার-পাল্টা সাক্ষাৎকারে জানান দিতে হবে কেন? এবং তার চেয়েও বড় কথা, দল না জিতলে-সফল না হলে আসলে ব্যক্তিগত পারফর্ম্যান্স যেমন খেলোয়াড়ের কাছে অর্থ বহন করে না, তেমনি সামগ্রিক বিচারেও স্মরণীয় কিছু না৷

সাংবাদিক মোস্তফা মামুন

সাংবাদিক মোস্তফা মামুন

খেয়াল করে দেখুন, সাকিবের বিশ্বকাপে অমন পারফরম্যান্সের পরও ৮ নম্বর৷ সাকিবের দোষ নেই, তিনি তো যা করার তার চেয়ে বেশি করেছেন৷ তাহলে দোষ কার? কেন ইতিহাসের সেরা পাঁচ খেলোয়াড়ের আমলেও আমরা আফগানিস্তানের কাছে হারি৷ কেন পিছিয়ে পড়ছি ওদের চেয়ে? মাঝেমধ্যে ভেবে মনে হয়, তাহলে হাতুরাসিংহে ভেলকিতেই আমাদের মাঝখানে এমন ঊর্ধ্বমুখী দেখাচ্ছিল৷ যারা তখন খেলতেন, তারা এখনো খেলেন৷ যারা তখন বোর্ড চালাতেন, তারা এখনো বোর্ড চালান৷ নেই হাতুরাসিংহে৷ আর তাই ভারত-পাকিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকা-অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডকে থমকে দেওয়া দল আফগানিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে খেই হারাচ্ছে৷

এই সমস্যাটাকে যে আমাদের খুব বড় মনে হয় না এরও কারণ কিন্তু সাকিব-সূত্র৷ তার পারফর্ম্যান্স এবং নানা বিতর্ক তৈরিতে ক্রিকেট ঠিক আলোচনায় থাকছে৷ হারাচ্ছে না৷ সঙ্গে অন্য তারকাদের সমর্থকগোষ্ঠী, তাদের তৈরি উত্তেজনা, তর্ক-বিতর্কের হাওয়ায় মনে হয়, ক্রিকেট তো জেগে আছে৷ এটাই ভ্রান্তির পর্দা৷ দু-তিন বছর পর প্রায় একসঙ্গে যখন ওরা সরে যাবেন, ওদের গুণমুগ্ধরাও ক্ষান্তি দেবেন, তখনই বেরোবে আড়ালের সব দগদগে দাগ৷

আবার কে জানে, তখন হয়তো অঙ্ক-বাণিজ্য-গ্ল্যামার ছেড়ে মাঠের ক্রিকেটে মন ফিরবে৷ তখন সব ছাপিয়ে ক্রিকেটীয় যৌক্তিকতা হবে বিচার্য৷ আর তাহলেই আফগানিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে পড়াটা লজ্জার মনে হবে৷ এবং তখন হয়তো...

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়