আওয়ামী লীগের ‘ফেরা' নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজের স্ট্যাটাস
২০ মে ২০২৬
এক ফেসবুক পোস্টে এই অভিমত দিয়েছেন তিনি৷ পরে আরেক পোস্টে এই পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কেও নিজের মত জানিয়েছেন মাহফুজ৷
গতকাল মঙ্গলবার প্রথম পোস্টে মাহফুজ আলম লিখেছেন, ‘‘লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে৷ কীভাবে ফিরলো, সে গল্পই বলবো আজ৷''
যেসব কারণে না ফিরেও ‘ফিরেছে’ আওয়ামী লীগ
এরপরে আওয়ামী লীগ কীভাবে ফিরেছে, তার বিরাট একটি তালিকা তুলে ধরেছেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মাহফুজ আলম৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন ২৪–কে ৭১–এর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল স্বাধীনতার বিরুদ্ধের শক্তি৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন থেকে ডানপন্থিদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ (অন্তর্বর্তীকালীন) সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেছে, লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে৷ যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ৷''
এ ছাড়া মাজারে হামলা, হিন্দুদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সরব না হওয়াও আওয়ামী লীগের ফেরার পথ সুগম করেছে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে মজলুমগণ চুপ ছিল৷''
এছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে ডানপন্থার উত্থানের আশঙ্কা এবং উগ্রবাদীদের নিরাপদ জায়গা করে দেওয়াটা আওয়ামী লীগের ‘ফেরায়' ভুমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মাহফুজ আলম৷ তার ভাষায়, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এ দেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এ দেশে হিরো বানানো হয়েছিল৷ উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল৷''
এসব ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ওই সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা মাহফুজ আলম৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যূনতম সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হলো৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে বিএনপি ও অন্তরীণ সরকারের বিরুদ্ধে গেল আর বিএনপি ও ঠেকাতে জামাতকে কোলে নিলো অন্তরীণ ৷''
মাহফুজ আলম আরো লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব আর মবে রূপ নিয়েছিল৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন মিডিয়া আর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা প্রযোজিত হলো৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিক্যাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হলো এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু হলো৷ যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামায়াত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল৷ যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা৷''
আওয়ামী লীগের ‘ফেরায়' সহায়ক হয়েছে – এমন বিষয়ের তালিকা করতে গিয়ে মাহফুজ আলম লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র জয়ী হলো৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা দেওয়ার জন্য একজোট হইসিল কিচেন ক্যাবিনেট৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন জুলাই ঘোষণাপত্র কিংবা সনদের প্রক্রিয়া তুলে দেয়া হইসিল আমলাতন্ত্র আর ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন বাম-শাহবাগী পিটাইলে আনন্দ পেয়েছিল মজলুমগণ৷''
মাহফুজ আরো আলম লিখেছেন, ‘‘লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন এদেশে কাওয়ালি/ইনকিলাবি কালচারের মতন রিগ্রেসিভ কালচার–ব্যবস্থা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবেলার মহারম্ভ হয়েছিল৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন নির্বাচনি বাঁটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচারকে কম্প্রোমাইজ করা হলো অ্যান্ড বিএনপি-জামাতের বার্গেইনিং টুল বানানো হলো৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কমিশন, ট্রাইব্যুনাল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে একটি আদর্শের লোকদের মাধ্যমে ক্ষমতারোহণের বার্গেইনিং টুলে পরিণত করা হলো৷ লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা জুলাইয়ে আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, তাদের বাদ দিয়ে জিরো কন্ট্রিবিউশন গুপ্তদের ক্ষমতায়িত করা হলো৷''
প্রথম পোস্টের শেষাংশে মাহফুজ আলম জানান, এই তালিকা আরো দীর্ঘ হবে৷
দু' ঘণ্টা পর ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট দেন মাহফুজ৷
সেখানে ‘আমাদের এখনকার কাজ হলো' বলে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করেন তিনি৷
সেই তালিকায় রয়েছে :
- সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা৷ দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা৷
- হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা৷ সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা৷
- জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা৷
- প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করা৷
- বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদযাপন করা এবং ‘রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াই'কে জায়গা না দেয়া৷
- কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাদেরকে ‘ঔন' করা৷ লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই৷
- যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যতবেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলা৷
- জুলাইয়ের পক্ষের সকল শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটা কমন স্পেইস/ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরি করা৷ অন্তর্ঘাতের ইতিহাস মাথায় রাখা৷
- লীগের ধর্মতত্ত্ব ও বয়ানকে নর্মালাইজ করার বিরুদ্ধে জুলাই ও গত ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের বয়ানকে কেন্দ্রীয় করে তোলা৷
- যারা গত দেড় বছরকে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের চাইতে দুঃসহ/ খারাপ করে দেখাতে চেষ্টা করার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার অপকর্ম ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, সেসব ‘লীগের ফ্যাসিস্টদের' প্রতিহত করা৷
- অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিক, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবন-জীবিকার সংকট দূরীকরণে সরকারকে বাধ্য করা৷
- আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া৷
- স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং সমন্বয়হীনতা এড়াতে দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে সকল নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা চালুর পক্ষে লড়াই অব্যাহত রাখা৷
- জুলাইকে একটি মতাদর্শের ব্যানারে কুক্ষিগত ও বিভাজিত করার সকল প্রকল্পকে পরাস্ত করা৷
এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো)