1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইসলামিক ন্যাটো' কতটা সম্ভব?

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫

উপসাগরীয় অঞ্চল, অর্থাৎ গাল্ফ কো-অপারেশন অব কাউন্সিল (জিসিসি)-এর কোনো দেশে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের হামলার পর প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে দেশগুলো৷ এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি৷

https://p.dw.com/p/519xi
কাতার দোহা ২০২৫ | কাতারের উপর ইসরায়েলি আক্রমণের বিষয়ে আরব-ইসলামিক জরুরি শীর্ষ সম্মেলন
দোহায় এক জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বলেছেন, "আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইসরায়েলি আগ্রাসন মোকাবিলায় যা কিছু করা প্রয়োজন তা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।"ছবি: Mahmud Hams/AFP

দুই সপ্তাহ আগে মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি সদস্যরাষ্ট্র কাতারের রাজধানী দোহায় মিসাইল হামলা চালায় ইসরায়েল৷ ইসরায়েলের দাবি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে  ওই হামলা চালানো হয়েছে৷ দোহায় চালানো এই হামলায় ছয় জন নিহত হন৷

নজিরবিহীন এই হামলার ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে৷ বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পাচ্ছে যে, ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো কেনো রাজনীতবিদ ‘ইসলামিক ন্যাটো' গঠনের কথাও বলছেন৷  

গত ৯ সেপ্টেম্বর কাতারে মিসাইল হামলা চালায় ইসলায়েল৷ প্রতিরক্ষার ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ওভার দ্য হরাইজন' হামলা৷ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, হামলার আগে লোহিত সাগরের উপর দিয়ে ১০টি ইসরায়েলি জঙ্গি বিমান পাঠানো হয়েছিল যেন মিসাইলগুলো অন্য কোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন না করে, সেভাবে৷

মিসাইলগুলো দিগন্তের ওপার থেকে আকস্মিকভাবে ছুটে আসায় সেগুলো প্রতিহত করতে কাতার তেমন কিছুই করতে পারেনি৷ শুধু তা-ই  নয়, ইসরায়েলের মিসাইল হামলা মোকাবিলায় কাতারের যে আসলে তেমন কিছুই করার নেই- সেই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷ উল্লেখ্য, দোহায় ইসরায়েলের বন্ধুরাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে৷ আর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে ন্যাটোর বাইরে বৃহৎ সহযোগীর মর্যাদা দিয়েছে৷    

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হওয়া- এর কোনোটিই কাতারে ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে পারেনি৷ জানা গেছে, এই হামলার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই জানতো৷

যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য নয়!

ওয়াশিংটনের আরব গাল্ফ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রেসিডেন্ট স্কলার ক্রিস্টিন ডিওয়ান বলেন, ‘‘ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে জিসিসির দেশগুলোর যেই অনুমান, সেই অনুমানকে নাড়িয়ে দিয়েছে৷ মিসাইল হামলার ঘটনা এই রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের আরো কাছে নিয়ে আসবে৷''

‘‘এই তেলের রাষ্ট্রগুলো (জিসিসি রাষ্ট্র) একই রকম ... সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি এমন হামলা, তাদের সকলের কাছেই ঘৃণ্য,'' বলেন তিনি৷ 

চ্যাথম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, নিরাপত্তার বিষয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর এই দেশগুলোর নেতারা বৃহত্তর কৌশলগত সুরক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন৷ তাছাড়া তারা ক্রমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতার ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন৷

এসব মিলিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে ইসলামিক এবং আরব দেশগুলোর সমন্বয়ে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে ‘ইসলামিক ন্যাটো' গঠনের আলোচনা বেশ জোরদার হচ্ছে৷

গত সপ্তাহে আরব লীগ এবং অর্গ্যানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের এক জরুরি সম্মেলনে মিশরের কর্মকর্তারা আরব দেশগুলোর জন্য ন্যাটোর মতো জয়েন্ট টাস্কফোস গঠনের প্রস্তাব দেন৷ সম্মেলনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মেদ শিয়া আল-সুদানি৷ তাছাড়া উপসাগরীয় রাষ্ট্র বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত তাদের যৌথ সামরিক চুক্তির একটি ধারাকে আবারো সক্রিয় করার কথা বলে৷ ২০০০ সালে প্রথম স্বাক্ষরিত চুক্তির ওই ধারায় বলা হয়, এই ছয় উপসাগরীয় রাষ্ট্রের কোনো একটিতে হামলা হওয়ার মানে হলো বাকি দেশগুলোর ওপর হামলা৷ এটি মূলত ন্যাটোর আর্টিক্যাল নম্বর ৫-এর মতোই৷

এই জরুরি সম্মেলনের পর উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা কাতারের রাজধানী দোহাতে আরেকটি সভায় মিলিত হন৷ মন্ত্রীরা ওই সভায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে একমত হন৷ এর মধ্যে রয়েছে, পরস্পরের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, আকাশসীমার পরিস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদন এবং ব্যালাস্টিক মিসাইলের সতর্কতার বিষয়ে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা স্থাপন৷ তাছাড়া ওই সভায় সমন্বিত সামরিক মহড়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়৷      

একই সময়ে আরেকটি বড় ঘোষণা দেয় সৌদি আরব৷ তা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তানের সাথে পারস্পরিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি৷ দেশ দুটি ঘোষণা দেয়, কোনো একটি দেশের উপর হামলাকে উভয় দেশের উপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে৷

এখান থেকে কি ‘ইসলামিক ন্যাটোর' যাত্রা শুরু?

গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের এমন কূটনৈতিক দৌঁড়ঝাপ এই অঞ্চলের দেশগুলোর একটি সামরিক জোট বা ‘ইসলামিক ন্যাটো' তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে মনে করছেন কেউ কেউ৷ আবার কোনো বিশ্লেষক বাস্তবতায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে এমন কথাও বলছেন৷

যেমন, ন্যাটোর মতো জোট গঠনের বিষয়টি ‘অবাস্তব' বলে মনে করেন লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার আন্ড্রেয়াস ক্রিগ৷ কারণ, হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের জোট উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যেগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ উদাহরণস্বরুপ, জিসিসিভুক্ত দেশের কোনো শাসকই মিশরের পক্ষে ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে চাইবে না৷''    

তবে দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর নিরাপত্তা বিষয়ক পরিস্থিতির পরিবর্তনও লক্ষ্য করছেন এই পর্যবেক্ষক৷ যদিও তা খুব ধীরে হতে পারে বলে মনে করেন তিনি৷

ক্রিগের মতে, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি দেওয়া-নেওয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে৷ যেমন, আপনার সুরক্ষার সুবিধা পাওয়ার জন্য আপনি কাউকে টাকা দেবেন৷'' দোহায় হামলার ঘটনার পর এই মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে মনে করলেও এই বিশ্লেষক বলছেন, ‘‘এই পরিবর্তন খুব ধীর গতিতে আসছে৷''

এদিকে নিরাপত্তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এমন অস্থিরতার মাঝে ন্যাটোর মতো জোটের পরিবর্তে অন্য এক ধরনের জোটের আভাস দেখছেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিশেলন্সের উপসাগরীয় রাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিনজিয়া বিয়াংকো৷

তার মতে, ‘ইসলামিক ন্যাটোর' পরিবর্তে বিশ্ব যা দেখতে পাবে, তা হলো, ৬+২ ফর্ম্যাট৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, এটি ন্যাটোর আর্টিক্যাল ৫-এর মতো নয়৷ উপসাগরীয় দেশগুলো ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতো পরস্পরকে নিরাপত্তা দিতে ততট শক্তভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়৷ 

তার মতে, এটি বরং নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষার এক ধরনের ভঙ্গি, যা সম্ভবত ইসরায়েলকে বার্তা দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে৷

৬+২ বলতে তিনি জিসিসিভুক্ত ছয় দেশ, সেইসাথে তুরস্ক এবং মিশর এই দুই দেশকে  বুঝিয়েছেন৷ 

ইসলামাবাদ, পাকিস্তান ২০২২ | জাতীয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে শাহীন-৩ ক্ষেপণাস্ত্র
পাকিস্তান বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা চুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ছবি: আনজুম নাভিদ/এপি ছবিছবি: Anjum Naveed/AP Photo/picture alliance

অন্য জায়গা থেকে সামরিক সহযোগিতা

ক্রিগের মতে ‘ইসলামিক ন্যাটোর' চেয়ে ৬+২ ফর্ম্যাটের জোট গঠন বেশি যৌক্তিক৷ এই বিশেষজ্ঞের যুক্তি, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পশ্চিমাদের বাইরে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অংশীদার হলো তুরস্ক৷ ২০১৭ সাল থেকে দেশটির সেনাসদস্যরা কাতারে অবস্থান করছে৷ তাছাড়া সংকটের সময়ে দ্রুত এগিয়ে আসার সত্যিকারের সামর্থ্য দেশটির রয়েছে৷

আর মিশরের বিষয়টিকে তিনি একটু জটিল বলে মনে করেন৷ দেশটির বিশাল সংখ্যক সেনাসদস্য থাকলেও  উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তার নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়৷

তবে আলোচনায় থেকে থাকলেও ৬+২ খুব ধীরে এবং নীরবে ঘটবে বলে মনে করেন তিনি৷

গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো গোপনেই ঘটবে, বলেন এই বিশেষজ্ঞ৷ ‘‘আমারা আলোচনা, বৈঠক, যৌথ মহড়া ইত্যাদি দেখতে পাবো৷ কিন্তু, রাডারের তথ্য ভাগাভাগি, তড়িৎ সতর্কতা-ব্যবস্থা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো গোপনেই থাকবে৷''

তবে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আরেকটি পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজের গবেষক সানেম সেনহগিজ৷

ডয়চে ভেলেক তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবেই এই জায়গায় আরো অংশীদার রয়েছে৷ যেমন, রাশিয়া এবং চীন৷ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গাটি দখল করতে চায়৷ তবে বাইরের কেউ রাতারাতি এই জায়গায় স্থান করে নিতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম৷

বিংকোর মতে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো  অন্য কিছু চাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই৷ তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল৷ যেমন, দোহায় হামলা হওয়ার পর অ্যামেরিকার সাথে সহযোগিতার বিষয়টির নিশ্চয়তা চেয়েছে কাতার৷

এই বিশ্লেষক আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এমন প্রতিরক্ষার আঞ্চলিকায়নের বিপক্ষে নয়৷ তারা সবসময়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ব্যালিস্টিক মিসাইলের একক সুরক্ষার কৌশলের কথা বলে আসছে৷

মূলত এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতির মানে হলো, অধিক পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিতি৷ কারণ, আঞ্চলিক সুরক্ষার মেরুদণ্ডই হলো অ্যামেরিকান সিস্টেম, বললেন ক্রিগ৷

তবে তিনি এ-ও বলেন, রাজনৈতিক অর্থেরও এক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে৷ (মধ্যপ্রাচ্যে) ওয়াশিংটনকে আর নিরাপত্তার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে দেখা হয় না, বরং সহযোগী হিসেবে দেখা হয় যেই সহযোগিতা শর্তস্বাপেক্ষ এবং লেনদেনের৷ উপসাগরের নেতারা এই ধারণাটির সাথে মানিয়ে নিতে চাইছে যে, সহযোগিতা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, জিসিসির নেতৃত্বে একটি নিরাপত্তা বলয়, ইরান এবং ইসরায়েলে মাঝে একটি মধ্যবর্তী জায়গা৷

ক্যাথরিন শায়ের/আরআর