মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইসলামিক ন্যাটো' কতটা সম্ভব?
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দুই সপ্তাহ আগে মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি সদস্যরাষ্ট্র কাতারের রাজধানী দোহায় মিসাইল হামলা চালায় ইসরায়েল৷ ইসরায়েলের দাবি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়েছে৷ দোহায় চালানো এই হামলায় ছয় জন নিহত হন৷
নজিরবিহীন এই হামলার ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে৷ বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পাচ্ছে যে, ওই অঞ্চলের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো কেনো রাজনীতবিদ ‘ইসলামিক ন্যাটো' গঠনের কথাও বলছেন৷
গত ৯ সেপ্টেম্বর কাতারে মিসাইল হামলা চালায় ইসলায়েল৷ প্রতিরক্ষার ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ওভার দ্য হরাইজন' হামলা৷ গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, হামলার আগে লোহিত সাগরের উপর দিয়ে ১০টি ইসরায়েলি জঙ্গি বিমান পাঠানো হয়েছিল যেন মিসাইলগুলো অন্য কোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন না করে, সেভাবে৷
মিসাইলগুলো দিগন্তের ওপার থেকে আকস্মিকভাবে ছুটে আসায় সেগুলো প্রতিহত করতে কাতার তেমন কিছুই করতে পারেনি৷ শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলের মিসাইল হামলা মোকাবিলায় কাতারের যে আসলে তেমন কিছুই করার নেই- সেই বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷ উল্লেখ্য, দোহায় ইসরায়েলের বন্ধুরাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে৷ আর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে ন্যাটোর বাইরে বৃহৎ সহযোগীর মর্যাদা দিয়েছে৷
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি থাকা, কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী হওয়া- এর কোনোটিই কাতারে ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে পারেনি৷ জানা গেছে, এই হামলার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই জানতো৷
যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরযোগ্য নয়!
ওয়াশিংটনের আরব গাল্ফ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রেসিডেন্ট স্কলার ক্রিস্টিন ডিওয়ান বলেন, ‘‘ইসরায়েলের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে জিসিসির দেশগুলোর যেই অনুমান, সেই অনুমানকে নাড়িয়ে দিয়েছে৷ মিসাইল হামলার ঘটনা এই রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের আরো কাছে নিয়ে আসবে৷''
‘‘এই তেলের রাষ্ট্রগুলো (জিসিসি রাষ্ট্র) একই রকম ... সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি এমন হামলা, তাদের সকলের কাছেই ঘৃণ্য,'' বলেন তিনি৷
চ্যাথম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, নিরাপত্তার বিষয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর এই দেশগুলোর নেতারা বৃহত্তর কৌশলগত সুরক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন৷ তাছাড়া তারা ক্রমেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতার ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন৷
এসব মিলিয়ে গত দুই সপ্তাহ ধরে ইসলামিক এবং আরব দেশগুলোর সমন্বয়ে পশ্চিমাদের সামরিক জোট ন্যাটোর আদলে ‘ইসলামিক ন্যাটো' গঠনের আলোচনা বেশ জোরদার হচ্ছে৷
গত সপ্তাহে আরব লীগ এবং অর্গ্যানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের এক জরুরি সম্মেলনে মিশরের কর্মকর্তারা আরব দেশগুলোর জন্য ন্যাটোর মতো জয়েন্ট টাস্কফোস গঠনের প্রস্তাব দেন৷ সম্মেলনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মেদ শিয়া আল-সুদানি৷ তাছাড়া উপসাগরীয় রাষ্ট্র বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার সৌদি আরব এবং আরব আমিরাত তাদের যৌথ সামরিক চুক্তির একটি ধারাকে আবারো সক্রিয় করার কথা বলে৷ ২০০০ সালে প্রথম স্বাক্ষরিত চুক্তির ওই ধারায় বলা হয়, এই ছয় উপসাগরীয় রাষ্ট্রের কোনো একটিতে হামলা হওয়ার মানে হলো বাকি দেশগুলোর ওপর হামলা৷ এটি মূলত ন্যাটোর আর্টিক্যাল নম্বর ৫-এর মতোই৷
এই জরুরি সম্মেলনের পর উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা কাতারের রাজধানী দোহাতে আরেকটি সভায় মিলিত হন৷ মন্ত্রীরা ওই সভায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে একমত হন৷ এর মধ্যে রয়েছে, পরস্পরের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, আকাশসীমার পরিস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদন এবং ব্যালাস্টিক মিসাইলের সতর্কতার বিষয়ে নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা স্থাপন৷ তাছাড়া ওই সভায় সমন্বিত সামরিক মহড়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়৷
একই সময়ে আরেকটি বড় ঘোষণা দেয় সৌদি আরব৷ তা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দেশ পাকিস্তানের সাথে পারস্পরিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি৷ দেশ দুটি ঘোষণা দেয়, কোনো একটি দেশের উপর হামলাকে উভয় দেশের উপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে৷
এখান থেকে কি ‘ইসলামিক ন্যাটোর' যাত্রা শুরু?
গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের এমন কূটনৈতিক দৌঁড়ঝাপ এই অঞ্চলের দেশগুলোর একটি সামরিক জোট বা ‘ইসলামিক ন্যাটো' তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে মনে করছেন কেউ কেউ৷ আবার কোনো বিশ্লেষক বাস্তবতায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে এমন কথাও বলছেন৷
যেমন, ন্যাটোর মতো জোট গঠনের বিষয়টি ‘অবাস্তব' বলে মনে করেন লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র লেকচারার আন্ড্রেয়াস ক্রিগ৷ কারণ, হিসেবে তিনি বলেন, ‘‘এ ধরনের জোট উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যেগুলো তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ উদাহরণস্বরুপ, জিসিসিভুক্ত দেশের কোনো শাসকই মিশরের পক্ষে ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে চাইবে না৷''
তবে দোহায় ইসরায়েলের হামলার পর নিরাপত্তা বিষয়ক পরিস্থিতির পরিবর্তনও লক্ষ্য করছেন এই পর্যবেক্ষক৷ যদিও তা খুব ধীরে হতে পারে বলে মনে করেন তিনি৷
ক্রিগের মতে, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি দেওয়া-নেওয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে৷ যেমন, আপনার সুরক্ষার সুবিধা পাওয়ার জন্য আপনি কাউকে টাকা দেবেন৷'' দোহায় হামলার ঘটনার পর এই মানসিকতায় পরিবর্তন আসছে মনে করলেও এই বিশ্লেষক বলছেন, ‘‘এই পরিবর্তন খুব ধীর গতিতে আসছে৷''
এদিকে নিরাপত্তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর এমন অস্থিরতার মাঝে ন্যাটোর মতো জোটের পরিবর্তে অন্য এক ধরনের জোটের আভাস দেখছেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিশেলন্সের উপসাগরীয় রাষ্ট্র বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিনজিয়া বিয়াংকো৷
তার মতে, ‘ইসলামিক ন্যাটোর' পরিবর্তে বিশ্ব যা দেখতে পাবে, তা হলো, ৬+২ ফর্ম্যাট৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, এটি ন্যাটোর আর্টিক্যাল ৫-এর মতো নয়৷ উপসাগরীয় দেশগুলো ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতো পরস্পরকে নিরাপত্তা দিতে ততট শক্তভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়৷
তার মতে, এটি বরং নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষার এক ধরনের ভঙ্গি, যা সম্ভবত ইসরায়েলকে বার্তা দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে৷
৬+২ বলতে তিনি জিসিসিভুক্ত ছয় দেশ, সেইসাথে তুরস্ক এবং মিশর এই দুই দেশকে বুঝিয়েছেন৷
অন্য জায়গা থেকে সামরিক সহযোগিতা
ক্রিগের মতে ‘ইসলামিক ন্যাটোর' চেয়ে ৬+২ ফর্ম্যাটের জোট গঠন বেশি যৌক্তিক৷ এই বিশেষজ্ঞের যুক্তি, উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে পশ্চিমাদের বাইরে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অংশীদার হলো তুরস্ক৷ ২০১৭ সাল থেকে দেশটির সেনাসদস্যরা কাতারে অবস্থান করছে৷ তাছাড়া সংকটের সময়ে দ্রুত এগিয়ে আসার সত্যিকারের সামর্থ্য দেশটির রয়েছে৷
আর মিশরের বিষয়টিকে তিনি একটু জটিল বলে মনে করেন৷ দেশটির বিশাল সংখ্যক সেনাসদস্য থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তার নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়৷
তবে আলোচনায় থেকে থাকলেও ৬+২ খুব ধীরে এবং নীরবে ঘটবে বলে মনে করেন তিনি৷
গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো গোপনেই ঘটবে, বলেন এই বিশেষজ্ঞ৷ ‘‘আমারা আলোচনা, বৈঠক, যৌথ মহড়া ইত্যাদি দেখতে পাবো৷ কিন্তু, রাডারের তথ্য ভাগাভাগি, তড়িৎ সতর্কতা-ব্যবস্থা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো গোপনেই থাকবে৷''
তবে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আরেকটি পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজের গবেষক সানেম সেনহগিজ৷
ডয়চে ভেলেক তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবেই এই জায়গায় আরো অংশীদার রয়েছে৷ যেমন, রাশিয়া এবং চীন৷ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গাটি দখল করতে চায়৷ তবে বাইরের কেউ রাতারাতি এই জায়গায় স্থান করে নিতে পারার সম্ভাবনা খুবই কম৷
বিংকোর মতে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো অন্য কিছু চাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই৷ তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল৷ যেমন, দোহায় হামলা হওয়ার পর অ্যামেরিকার সাথে সহযোগিতার বিষয়টির নিশ্চয়তা চেয়েছে কাতার৷
এই বিশ্লেষক আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এমন প্রতিরক্ষার আঞ্চলিকায়নের বিপক্ষে নয়৷ তারা সবসময়ই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ব্যালিস্টিক মিসাইলের একক সুরক্ষার কৌশলের কথা বলে আসছে৷
মূলত এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতির মানে হলো, অধিক পরিমাণে যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিতি৷ কারণ, আঞ্চলিক সুরক্ষার মেরুদণ্ডই হলো অ্যামেরিকান সিস্টেম, বললেন ক্রিগ৷
তবে তিনি এ-ও বলেন, রাজনৈতিক অর্থেরও এক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে৷ (মধ্যপ্রাচ্যে) ওয়াশিংটনকে আর নিরাপত্তার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে দেখা হয় না, বরং সহযোগী হিসেবে দেখা হয় যেই সহযোগিতা শর্তস্বাপেক্ষ এবং লেনদেনের৷ উপসাগরের নেতারা এই ধারণাটির সাথে মানিয়ে নিতে চাইছে যে, সহযোগিতা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রয়েছে৷ যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, জিসিসির নেতৃত্বে একটি নিরাপত্তা বলয়, ইরান এবং ইসরায়েলে মাঝে একটি মধ্যবর্তী জায়গা৷
ক্যাথরিন শায়ের/আরআর