1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

‘বাণিজ্যিক' নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সাফল্যের জন্য যা করণীয়

৮ মে ২০২৬

কার্বন নিঃসরণ ও বিদ্যুৎ খরচ কমাতে বাংলাদেশের কারখানাগুলো রুফটপ সোলারের দিকে ঝুঁকছে৷ তবে ছাদের সীমিত জায়গায় উৎপন্ন সৌরবিদ্যুৎ মোট চাহিদার সামান্য অংশই পূরণ করতে পারে৷

https://p.dw.com/p/5DUuZ
প্রতীকী ছবি
পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, একটি মাঝারি আকারের কারখানা রুফটপ সোলারের মাধ্যমেই তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে৷ তবে কারখানার বাইরে উৎপাদিত বিদ্যুতে মোট চাহিদার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব৷ছবি: DW/M. Mostafigur Rahman

তাই দূরবর্তী প্ল্যান্ট থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেনার মতো বিকল্প খুঁজছে তারা৷

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে বড় গ্রাহকদের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে৷ ফলে বাণিজ্যকভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় গ্রিডে৷ ব্যবহারকারীরা গ্রিড ও বিতরণ সংস্থাকে অর্থ পরিশোধ করেন৷

বাংলাদেশ মাত্র গত বছর থেকে শুরু করলেও ভারত দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের অনুমতি দিয়ে আসছে৷ তবে ভারতের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান প্রতিযোগিতামূলক দ্বিপাক্ষিক বাজার তৈরির দিকে এগোচ্ছে৷

এদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিয়ন্ত্রক কমিশন তাদের নিজস্ব উন্মুক্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মূল খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে৷ গ্রিড ব্যবহারের জন্য গ্রাহকদের প্রদেয় চার্জের বিষয়টিও রয়েছে সেখানে৷

জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলেছেন, উন্মুক্ত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে খানিকটা উন্মুক্ত গ্রিড চার্জ এবং অতিরিক্ত সারচার্জের ওপর৷ এটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং কৃষকদের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তারা৷

গ্রিড চার্জ এবং নিয়ম-কানুন চূড়ান্ত হয়ে গেলে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে এমন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকদের মতো কর্পোরেট ক্রেতারা প্রত্যন্ত সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরাসরি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয় করবে৷

পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, একটি মাঝারি আকারের কারখানা রুফটপ সোলারের মাধ্যমেই তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে৷ তবে কারখানার বাইরে উৎপাদিত বিদ্যুতে মোট চাহিদার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব৷

নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে কোম্পানিগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সার্টিফিকেট বা আরইসি কিনতে পারে৷ তবে পোশাক সরবরাহকারীদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে এই সার্টিফিকেট পর্যাপ্ত সরবরাহ করার মতো আরইসি বাজারের অভাব রয়েছে৷

পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজার মাশুক মুজিব বলেন, ‘‘বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আমাদের সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয় করার সুযোগ করে দেবে৷ এর ফলে বাজার থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সনদ কেনার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে৷''

মূল বিবেচ্য চার্জ বা মাশুল

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিস-এর জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বার্ষিক বিনিয়োগ ২৫ কোটি ডলারেরও কম, যা কিনা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক নগণ্য৷

তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে৷

তবে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি কিলোওয়াট (প্রতি ঘণ্টায়) নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দাম ৯ মার্কিন সেন্ট হতে পারে৷ উন্মুক্ত উৎস থেকে পাওয়া বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াটে আরো ২ মার্কিন সেন্ট ধার্য করা হতে পারে৷ ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিস-এর জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, এ ধরনের মাশুল শিল্প-গ্রাহকদের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে৷ শিল্পখাতে এর প্রতিক্রিয়া খারাপ হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি৷

সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই বলছেন, এই মাশুল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা উচিত৷

বাংলাদেশের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসআইডিএ)-এর সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম বলেন, ‘‘প্রতিটি পক্ষেরই রয়েছে নিজস্ব চাহিদা৷ গ্রাহকদের প্রয়োজন সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ৷ প্রকল্প উন্নয়নকারীদের প্রয়োজন এমন প্রকল্প, যা ব্যাংকের ঋণ পাওয়ার উপযুক্ত এবং যার আয়ের প্রবাহ নিশ্চিত ও পূর্বানুমানযোগ্য৷ অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ও গ্রিড পরিচালনাকারীদের প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থাটির সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাদের সেবার খরচ পুনরুদ্ধার করা৷''

প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাদের দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের মিশ্র শিক্ষা হতে পারে৷

পাকিস্তানের সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইন্সটিটিউট -এর গবেষক খালিদ ওয়ালিদ জানান, পাকিস্তানে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য ধার্য করা মাশুলের কারণে শিল্পখাতের নিজস্ব স্থাপনার বাইরে থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে৷ তিনি বলেন, ‘‘পাকিস্তানের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সতর্কবার্তার কাজ করতে পারে৷''

খালিদ ওয়ালিদ আরো জানান, পাকিস্তান সরকার বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের জন্য ১২.৫৫ পাকিস্তানি রুপি (০.০৪৫ মার্কিন ডলার) হারে একটি মাশুল ধার্য করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে৷ কিন্তু শিল্পখাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই মাশুল প্রতি কিলোওয়াটে ৫.৮৫ রুপি (০.০৪৫ মার্কিন ডলার)-এর কাছাকাছি হওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত৷

পাকিস্তানের বিদ্যুৎ গ্রাহকরা যখন জাতীয় গ্রিড থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন, তখন সরকার তাদের হারানো রাজস্ব পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে পুরনো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও যুক্ত করছে বলেও জানান তিনি৷

অন্যদিকে ভারত দীর্ঘমেয়াদী ওপেন-অ্যাক্সেস, অর্থাৎ উন্মুক্ত প্রবেশাধিকারের চুক্তির পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে দূরের কোনো স্থান থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে৷

উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থার আওতায় বিদ্যুৎ কেনে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রিড চার্জেরবাইরেও অতিরিক্ত মাশুল পরিশোধ করতে হয়৷ এই অর্থে অনেক পরিবার ও কৃষকদের দেওয়া ভর্তুকির খরচ মেটানো হয়৷

ডাব্লিউআরআই ইন্ডিয়ার জ্বালানি বিষয়ক ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর দীপক কৃষ্ণন বলেন, ‘‘ওপেন-অ্যাক্সেস গ্রাহক, যারা সাধারণত বড় কর্পোরেট ক্রেতা এবং যাদের পক্ষে এই খরচ বহন করা সম্ভব, তারা কাছ থেকে এই মাশুল আদায় না করা হলে তা দরিদ্র গ্রাহকদের জন্য খুব ভারী বোঝা হয়ে যাবে৷''

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মাশুল নির্ধারণের মাধ্যমে পরস্পরবিরোধী স্বার্থগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, যাতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সেই সঙ্গে বিদ্যুতের বাজার ব্যবস্থাও ধ্বংস না হয়৷

ভারতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘জেএমকে রিসার্চ'-এর পরামর্শক প্রভাকর শর্মা বলেন, ওপেন-অ্যাক্সেস মাশুলগুলো নির্দিষ্ট কোনো সময়ের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল হওয়া উচিত, যাতে বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে পারেন৷

প্রভাকর শর্মা মনে করেন, ‘‘সরকার শিল্প-গ্রাহকদের জন্য সৌর ও বায়ুশক্তি-ভিত্তিক ওপেন-অ্যাক্সেস বাজারকে উৎসাহিত করতে চাইলে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত এই মাশুল মওকুফ করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে৷''

আইইএফএ-র শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে ওপেন-অ্যাক্সেস পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তিগুলো শিল্পখাতের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সহায়ক হতে পারে৷ তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ও নীতি-নির্ধারকরা চাইলে এখনই উচ্চহারে মাশুল আরোপ করা থেকে বিরত থেকে তিন বছর পর বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো প্রকৃতপক্ষে কোনো রাজস্ব হারাচ্ছে কি না সে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন৷

বাংলাদেশের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসআইডিএ)-এর সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম বলেন, বাংলাদেশের শেষ পর্যন্ত এনার্জি এক্সচেঞ্জ-এর মতো কিছু বাজারভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনকারীরা তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিকল্প ক্রেতা, বিশেষ করে কোনো কর্পোরেট ক্রেতা বিদ্যুৎ কিনবে না, তখন তাদের কাছে বিক্রির সুযোগ পাবে৷

এসিবি/ জেডএইচ (রয়টার্স)