1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বায়ুবিদ্যুতে বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মন্থর অগ্রগতি

২৪ এপ্রিল ২০২৬

নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানিতে আমদানি নির্ভরতা কমাতে চায় বাংলাদেশ৷ স্বল্পমেয়াদে সৌরশক্তি সবচেয়ে সস্তা৷ অব্যবহৃত বায়ুশক্তিতেও রয়েছে সম্ভাবনা৷

https://p.dw.com/p/5CluU
প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে বৃহত্তম নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সৌরশক্তি৷ কিন্তু বর্তমানে মোট বিদ্যুৎের ৩ শতাংশেরও কম আসে সৌরশক্তি থেকে৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সৌরশক্তি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বায়ুশক্তিরও উন্নয়ন করা উচিত৷ছবি: Georges Schneider/photonews.at/IMAGO

কিন্তু রাজনীতি, তথ্যের অপ্রতুলতা এবং অবকাঠামোর সমস্যার কারণে সেই শক্তি অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে৷

বাংলাদেশকে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়৷ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির আমদানি কমেছে, দাম বাড়ছে৷ বায়ু ও সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার থাকলে আমদানির্ভরতা কমতো৷

বাংলাদেশে বৃহত্তম নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস সৌরশক্তি৷ কিন্তু বর্তমানে মোট বিদ্যুৎের ৩ শতাংশেরও কম আসে সৌরশক্তি থেকে৷ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশের সৌরশক্তি উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বায়ুশক্তিরও উন্নয়ন করা উচিত৷

তবে সেই লক্ষ্য অর্জন বেশ কঠিন৷ কারণ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বায়ুশক্তির সম্ভাবনা অনেক কম৷ কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ০.২২ শতাংশ এখন বায়ুশক্তি থেকে আসে তাই এই ক্ষেত্রে সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ রয়েছে৷

২০১৮ সালের ইউএসএইড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল্যাবরেটরির করা এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান ৬০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত করা সম্ভব৷

ডেভেলপাররা বলছেন, দীর্ঘ উপকূলরেখা এবং বিশাল অফশোর অঞ্চল থাকায় বাংলাদেশে সর্বাধুনিক ও বেশি কার্যকর উইন্ড টারবাইন বেশ উপযোগী৷ কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্ঞানের ঘাটতি এ ক্ষেত্রে অগ্রগতিকে মন্থর করে দিয়েছে৷

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার শহরের কাছে খুরুশকুলে রয়েছে দেশের প্রথম ইউটিলিটি-স্কেল উইন্ড প্রকল্প৷ সেখানে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে আছেন মুকিত আলম খান৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা যে নতুন টারবাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছি, তা বাংলাদেশের মতো কম বায়ুপ্রবাহের অঞ্চলেও কার্যকর৷ এটি দেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বায়ুশক্তির বিকাশের পথ প্রশস্ত করছে৷''

আইনি বাধা

গত বছর বেসরকারি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করার অনুমতি দিয়েছে সরকার৷ তার আগ পর্যন্ত এমন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ বোর্ডের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারতো৷ বেসরকারি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ হওয়ার ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাছের কোনো নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস (যেমন : ছাদের সোলার প্ল্যান্ট)-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে দূরের কোনো সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ খামার থেকেও বিদ্যুৎ ক্রয় করতে পারবে৷

পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ডেনিম এক্সপার্ট-এর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘বাংলাদেশের শিল্পের জন্য, বিশেষ করে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য ক্রমবর্ধমান ভোক্তাদের চাপের মুখে থাকা বৃহৎ ও রপ্তানিনির্ভর পোশাক খাতের জন্য এটি যুগান্তকারী পরিবর্তন৷''

কিন্তু উপকূলীয় ও নিকটবর্তী সমুদ্র-সংলগ্ন অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকে সরকার উৎসাহিত করলেও এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি৷ দেশের সবচেয়ে বড় বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কক্সবাজার উপকূলের কাছে৷ ৫০০ মেগাওয়াটের সেই প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন পেয়েছিল ২০২৩ সালে৷

দেশের সর্বপ্রথম অফশোর ইউটিলিটি-স্কেল উইন্ড ফার্ম হিসেবে এটিকে গড়ে তোলার দায়িত্ব পেয়েছিল ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স৷ বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম এবং বেস্টসেলার এই প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল৷

কিন্তু ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে এবং অফশোর উইন্ড কনসোর্টিয়ামের অংশীদার বাংলাদেশি জ্বালানি কোম্পানি সামিট গ্রুপের একটি এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল করে দেয়৷ এর ফলে কাজ মন্থর হয়ে যায়৷ সামিট গ্রুপের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক মোহসেনা হাসান বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের কারণে কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল৷''

ফাস্ট ফ্যাশন জায়ান্ট এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, অফশোর উইন্ড প্রকল্পের কাজ আবার শুরু হয়েছে৷ কোপেনহেগেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনার্স-এর প্রেস ও মিডিয়া রিলেশনস-এর গ্লোবাল হেড লুইস ওয়েন্ডেলবো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রকল্প কনসোর্টিয়ামে এখন আর সামিট গ্রুপ নেই৷

প্রকল্প স্থগিত

বেশ কয়েকটি বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প এই মুহূর্তে স্থগিত থাকায় কক্সবাজারের কাছের ৬০-মেগাওয়াটের খুরুশকুল উইন্ড ফার্ম এখন দেশের একমাত্র সফল বৃহৎ বাণিজ্যিক বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প৷ ডেভেলপাররা বলছেন, দুর্বল লজিস্টিকস, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এবং তথ্যের ঘাটতি বায়ু শক্তির উন্নয়নের অগ্রগতিকে ধীর করে দিচ্ছে৷

মুকিত আলম খান বলেন, খুরুশকুল উইন্ড ফার্ম সফল হওয়া সত্ত্বেও অনেক ডেভেলপার সঠিক প্রযুক্তি, উপযুক্ত অর্থায়ন এবং বিমা পেতে হিমশিম খেয়েছে৷ এছাড়া লজিস্টিকসের বিষয়টিতেও সমস্যা ছিল৷ এ সমস্যার একটা দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের সড়কপথ দিয়ে ৬০ মিটার লম্বা ব্লেড বা ৯০ মিটার লম্বা টাওয়ার আনা যায় না৷ আমাদের তো বিশেষভাবে নির্মিত বার্জের মাধ্যমে নদী ও সমুদ্রপথে সেইগুলো পরিবহন করতে হয়েছিল৷''

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের শফিকুল আলম বলেন, অফশোর উইন্ডের জন্য বাড়তি সহায়ক অবকাঠামো, যেমন স্টেজিং পোর্ট, হেভি-লিফট ইকুইপমেন্ট, জাহাজ, ট্রান্সমিশন লিঙ্ক এবং শিল্প সহায়তা পরিষেবা প্রয়োজন৷'' তিনি মনে করেন, ‘‘বায়ু বিদ্যুৎ সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়েও গভীর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন৷

ডেনিম এক্সপার্ট-এর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘স্বল্প মেয়াদে ব্যবসার জন্য সস্তা নবায়নযোগ্য উৎস হিসেবে সৌরশক্তির প্রাধান্য থাকলেও, মধ্যম মেয়াদে বায়ু বিদ্যুতের ভালো সম্ভাবনা থাকতে পারে৷'' তিনি বলেন, উপকূলীয় পোশাক শিল্প কারখানাগুলো বায়ু বিদ্যুৎ সক্ষমতা থেকে সত্যিকার অর্থেই উপকৃত হতে পারে৷''

এসিবি/ জেডএইচ (থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন)