পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন নির্বিঘ্নে শেষ
২৯ এপ্রিল ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে অন্তিম দফার ভোট গ্রহণে ছোটখাটো অশান্তি৷ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটের দুই দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ৷
রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে বুধবার সাত জেলার ১৫২ কেন্দ্রে ভোট নেয়া হয়৷ নজিরবিহীন নিরাপত্তায় ভোটগ্রহণে বিক্ষিপ্ত গন্ডগোল হয়েছে৷ বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ৷ সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে পূর্ব বর্ধমানে৷ প্রথম দফাতে পাঁচটা পর্যন্ত একই হারে ভোট পড়েছিল৷
মমতা শুভেন্দু মুখোমুখি
এবারের ভোটে নজরকাড়া কেন্দ্র ভবানীপুর৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটের দিনে বাড়িতেই থাকেন৷ বিকেলে ভোট দেন৷ এ দিন ছবিটা ছিল আলাদা৷ ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি শময়িতা চক্রবর্তী ভবানীপুর থেকে জানিয়েছেন, সকাল থেকে মমতা বুথে বুথে ঘুরেছেন৷ ফিরহাদ হাকিমের বাড়ি ঘুরে আসেন চক্রবেড়িয়ায়৷ ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে অনেকক্ষণ বসেছিলেন৷ তখন সেখানে শুভেন্দু উপস্থিত হন৷ সেখানে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে একপ্রস্থ বচসা হয়৷ মুখ্যমন্ত্রী বাড়ি চলে যাওয়ার পরে জয়হিন্দ ভবনের সামনে গন্ডগোল হয়৷
বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ শুভেন্দু কালীঘাটের জয় হিন্দ ভবনে গেলে উত্তেজনা তৈরি হয়৷ প্রার্থীর অভিযোগ পেয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়৷ লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়৷ বিকেল চারটেয় মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভোট দিয়ে ভিকট্রি সাইন দেখান মমতা৷
মমতার অভিযোগ, বিজেপি কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ পর্যবেক্ষক দিয়ে তৃণমূলের উপরে অত্যাচার চালাচ্ছে৷ থানায় থানায় হুমকি দিচ্ছে৷ জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দু ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি গৌতম হোড়কে বলেন, ‘‘৮০ শতাংশ ভোট পড়লে জিতব৷ ৯০ শতাংশ ভোট পড়লে অনেক ভোটে জিতব৷ ৫০ শতাংশ ভোট পড়লে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি৷''
ছোটখাট গন্ডগোল
জেলায় জেলায় বিক্ষিপ্ত সহিংসতা হয়েছে যদিও তার মাত্রা কম৷বিভিন্ন ঘটনায় শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে চাপানউতোর চলেছে৷
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দারের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়৷ দুপুরে একটি বুথের সামনে তিনি আক্রান্ত হন৷ এই ঘটনায় এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন৷
ফলতা থেকে ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি গৌতম হোড় জানিয়েছেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এলাকা ছিল শান্ত৷ এলাকায় দিনভর টহল দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা আইপিএস অজয় পাল শর্মা, সিআরপিএফ-এর ডিজি জিপি সিং টহল দিয়েছেন গ্রামে গ্রামে৷ এই কেন্দ্রে ১৭৭ নম্বর বুথে বিজেপির প্রতীকে সেলোটেপ মেরে দেয়া হয়৷ এ নিয়ে রিপোর্ট চেয়েছে কমিশন৷ ২২৭ নম্বর বুথে ইভিএমের বোতামে আতর লাগিয়ে দেয়া হয় বলে অভিযোগ যাতে ভোটারদের চিহ্নিত করা যায়৷
ডিডাব্লিউর প্রতিনিধি স্যমন্তক ঘোষ ভাঙড় থেকে জানিয়েছেন, অচেনা ভাঙড়কে দেখা গিয়েছে ভোটের দিনে৷ নির্বাচনের দিনে যে এলাকা উত্তপ্ত থাকে, বোমাবাজি, গুলিচালনা, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, সেখানে মোটের উপরে সব মিটেছে শান্তিতে৷ ভাঙড়ে কোনও কিছু না ঘটা সবচেয়ে বড় ঘটনা৷ ভাটপাড়া, জগদ্দলের মতো কেন্দ্রও ছিল অন্যান্যবারের তুলনায় অচেনা, শান্ত৷
ক্যানিংয়ে পঞ্চায়েত প্রধানকে মারধরের অভিযোগে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখায় তৃণমূল৷ ক্যানিং পশ্চিম ১১২ নম্বর বুথে ভোট বন্ধ থাকে কিছুক্ষণ৷
অভিযোগ, ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রে ছয় বিজেপি কর্মীকে মারধর করেছে তৃণমূল৷ একজনের আঘাত গুরুতর৷
নদিয়ার শান্তিপুরে বিজেপির ক্যাম্প অফিসে ভাঙচুর হয়৷ চাপড়ায় ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ৷ উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়ায় তৃণমূল কাউন্সিলর বুথের ১০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে চলে এলে বিরোধী প্রার্থীর সঙ্গে তার হাতাহাতি হয়৷
পানিহাটিতে ১৬৫ নম্বর বুথে বিজেপি প্রার্থী, আরজি করে নিহত চিকিৎসকের মায়ের উদ্দেশ্যে গো ব্যাক স্লোগান দেয়া হয়৷ শাসনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোটারদের ভয় দেখানোর অভিযোগ৷ অভিযুক্তদের তাড়া করে গ্রামছাড়া করেন আইএসএফ কর্মীরা৷ আমডাঙায় বাইক বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় আধাসেনা ও পুলিশ৷
গোবরডাঙায় লুঙ্গি পরে এলে ভোটদানে কেন্দ্রীয় বাহিনী বাধা দেয় বলে অভিযোগ৷ গ্রামবাসীদের দাবি, লুঙ্গির বদলে প্যান্ট পরে এলে ভোট দিতে দেয়া হয়৷ টিটাগড় পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ৷
হুগলির খানাকুলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আইএসএফের ভুয়ো এজেন্ট বসানোর অভিযোগ৷ এই কেন্দ্রে বিরোধী দলের কর্মীকে মারধর করা হয়৷ এই জেলার সপ্তগ্রাম বিধানসভার বাঁশবেড়িয়ায় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে স্লোগানের যুদ্ধ দেখা গিয়েছে৷ হাওড়ার আমতায় আইএসএফের হাতে আক্রান্ত তৃণমূল৷ মাথা ফাটে এক কর্মীর৷
নির্ণায়ক দফা
এদিন যে জেলাগুলিতে ভোট নেয়া হয়, সেখানে তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য৷নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া প্রধান এলাকা বাদ দিলে বাকি এলাকায় বিজেপি গত বিধানসভা নির্বাচনে খালি হাতে ফিরেছে৷
২০২১ সালের নির্বাচনে সাতটি জেলার মধ্যে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, কলকাতা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপি কোনো আসনে জিততে পারেনি৷ ১৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জয় পায় ১২৩টিতে, বিজেপির জয় পায় ১৮ কেন্দ্রে এবং একটি আসনে জেতে আইএসএফ৷
এবার কি পরিবর্তন হবে, না প্রত্যাবর্তন ঘটবে তৃণমূলের?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘যখন মানুষ বিপুল সংখ্যায় ভোট দেয়, তখন মনে করা হয়, শাসক দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভোট পড়েছে৷ সেই সম্ভাবনা থাকছেই৷ এই নির্বাচনে কিন্তু জাল ভোট নেই৷ প্রতি বুথে ৫০–১০০ ভুয়ো ভোটের যে হিসেব, অর্থাৎ ১৫–২০ হাজার ভোটের লিড নেয়ার যে কৌশল এই নির্বাচনে কাজে আসেনি৷ প্রতি কেন্দ্রে শাসক দল ১০–১৫ হাজার ভুয়ো ভোট দিতে না পারলে বিজেপির সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষমতা দখলের৷''
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ সুশীল সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পেরে নির্বাচন কমিশনের কাজে খুশি৷ কমিশনকে এবার কঠোর হাতে ইভিএম রক্ষা করতে হবে৷ তারপরে যে ক্ষমতায় আসবে, তাকে আমরা মেনে নেব৷''