পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরে সমস্যায় নারী ভোটারেরা
২২ এপ্রিল ২০২৬
এসআইআর-এ ৯০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছে৷ বিচারাধীন ভোটার বাদ পড়েছেন ২৭ লক্ষ৷ এর মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি৷
প্রথম দফার ভোট
দুটি পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হবে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল৷ প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার ভোট নেয়া হবে ১৫২টি আসনে৷ সমগ্র উত্তরবঙ্গ-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাংশে ভোটগ্রহণ করা হবে৷ এজন্য ১৬টি জেলায় প্রচার অভিযান শেষ হয়েছে মঙ্গলবার বিকেলে৷
প্রথম দফায় যেসব এলাকায় ভোট নেয়া হবে, সেখানে প্রতি হাজার পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা কমে গিয়েছে৷ এসআইআরের আগে ভোটার তালিকায় এক হাজার পুরুষের অনুপাতে ৯৭০ জন নারী ভোটার ছিলেন৷ ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হতে এই সংখ্যা সামান্য কমে যায়৷ প্রতি হাজার পুরুষে ৯৫৬ জন নারী৷ ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়, তাতে সংখ্যা কিছুটা বাড়ে৷ নারী ভোটারের সংখ্যা হয় ৯৬৪৷
লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির বিষয়টি সামনে আসার পরে এই অনুপাতে নারী-পুরুষের ব্যবধান বেড়েছে৷ বিচারাধীন-এর আওতায় থাকা ৬০ লক্ষ মানুষের নথি খতিয়ে দেখার পরে বিচারকরা ৩৩ লক্ষ ভোটারের অন্তর্ভুক্তিতে সিলমোহর দিয়েছেন৷ বাকি ২৭ লক্ষ মানুষ এবার ভোট দিতে পারবেন না৷ এর মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি৷
সমীক্ষায় দাবি
গবেষক সংস্থা সবর ইনস্টিটিউট তাদের সমীক্ষায় দেখিয়েছে, একের পর এক সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পরে, প্রথম দফার ১৫২ আসনের ভোটার সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, প্রতি হাজার পুরুষ ভোটারে নারীদের সংখ্যা ৯৫০৷ ২৮ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত তালিকায় ৯৫২ জন নারী ছিলেন৷
১১ এপ্রিলের ভোটার তালিকা অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ের ভোটে সবচেয়ে বেশি নারী ভোটার কমেছে পশ্চিম বর্ধমান, মালদা ও কালিম্পংয়ে৷ প্রতিটি ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে নারীদের সংখ্যা কমেছে বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার পরে৷ ১১ এপ্রিলের ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিম বর্ধমানে ৯৬০ থেকে হয়েছিল ৯৫৫, মালদায় ৯৪১ থেকে ৯৩৬, উত্তর দিনাজপুরে ৮৯৫ থেকে ৮৯১, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৯৬৮ থেকে ৯৬৪৷
মুর্শিদাবাদে বাদ পড়া বিচারাধীন ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও এখানে নারী ভোটারের আনুপাতিক সংখ্যা বিশেষ কমেনি৷ ২৮ ফেব্রুয়ারি ছিল ৯৪৩, ১১ এপ্রিলে ৯৪১৷ প্রথম দফায় দার্জিলিং ও বীরভূমের ক্ষেত্রে উল্টো ট্রেন্ড দেখা গিয়েছে৷ বিচারকদের পর্যালোচনার পরে এখানে সামান্য বেড়েছে নারী ভোটারের সংখ্যা৷
নারীরা কেন বাদ
পুরুষের তুলনায় আনুপাতিক হারে নারীরা কম থাকায় বোঝা যাচ্ছে, সার্বিকভাবে তাদের সংখ্যা ভোটার তালিকায় কমেছে৷ গবেষক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৫৮টিতে বাদ পড়া ভোটারদের অর্ধেকের বেশি নারী৷ কোনো কোনো বিধানসভায় এই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি৷ ৬৪টি কেন্দ্রে ডিলিট হওয়া ভোটারের ৬০ শতাংশের বেশি নারী৷ ১৩১ কেন্দ্রে এই হার ৫৫-৬০ শতাংশ৷
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকার মাশুল দিতে হয়েছে৷ বিয়ের পরে নারীদের পদবি বা নামের ক্ষেত্রে বদল হলেও তার প্রতিফলন নথিপত্রে পাওয়া যায়নি৷ যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির জালে আটকে পড়েছেন অনেকে৷ এছাড়া নারীদের বড় অংশের জন্ম বা স্কুল পাসের সার্টিফিকেট পাওয়া দুষ্কর৷ জমির দলিল তাদের নামে সাধারণভাবে করা হয় না৷ সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে নামের বানানে পার্থক্য বেশি থাকায় অনেকেই নিজের বাবা-মার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি৷
নারী আন্দোলনের কর্মী, অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘মূল সমস্যা হলো সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং নথিপত্র জোগাড় করতে গিয়ে আর্থিক ব্যয়৷ ভারতের প্রায় ৮৫ শতাংশ মেয়ের বিয়ের পর মাইগ্রেশন বা স্থান পরিবর্তন হয়৷ বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় তাদের কাছে মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট বা অন্য কোনো জরুরি নথিপত্র থাকে না৷ জমির দলিল বা জাতিগত শংসাপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি সাধারণত বাড়ির পুরুষদের হাতেই থাকে, এমনকী শিক্ষিত পরিবারেও মেয়েদের নথি পুরুষদের জিম্মায় রাখা হয়৷’’
বাদ পড়ার সমস্যা
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় ডি-ভোটার হওয়ার আশঙ্কা দানা বাঁধছে নারীদের মধ্যে৷ এছাড়াও নানা উদ্বেগের কথা বাতাসে ভাসছে৷
শাশ্বতী বলেন, ‘‘ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে, এই বিষয়গুলি ‘গুজব’৷ আধার কার্ড থাকলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কেন বন্ধ হবে?’’
তার মতে, ‘‘নথিপত্র জোগাড়, সেগুলোর ফটোকপি করা বা অনলাইন থেকে প্রিন্ট আউট বের করার জন্য যে খরচ হয়, তা একজন দিনমজুর বা স্বল্প আয়ের মহিলার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর৷ নথিপত্রের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে দিনমজুর মহিলাদের কাজের ক্ষতি হয় এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও জীবিকা ভীষণভাবে ব্যাহত হয়৷’’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক মইদুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ায় খুব অসুবিধা হবে নারীদের৷ যার নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের চাকরি চলে যেতে পারে৷ তাদের কেউ ঋণ দিতে পারবে না৷ সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে পরিচয়পত্রের যোগ আছে৷’’
শাশ্বতী বলেন, ‘‘২০০৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মেয়েদের ভোটদানের হার ক্রমেই বাড়ছিল৷ কিন্তু এই নথিপত্র বা ভোটার তালিকার জটিলতার কারণে কয়েক কোটি নারী এই গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন৷ রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করলেও নথিপত্র ঠিক আছে কি না, সে বিষয়ে কোনো খোঁজ নেয় না৷ প্রশাসন বা সুপ্রিম কোর্টও মেয়েদের এই বিশেষ সমস্যাটি নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি৷’’
আইনজীবী ফিরদৌস শামীম ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘রিপ্রেজেন্টেশন অফ পিপলস অ্যাক্ট অনুযায়ী নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো আইনি পার্থক্য নেই৷ তবে আর্থ-সামাজিক কারণে নারীরা পিছিয়ে থাকেন৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের কাছে স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বা মার্কশিটের মতো প্রয়োজনীয় নথিপত্র পুরুষদের তুলনায় অনেক কম থাকে৷ অনেক ক্ষেত্রেই মহিলারা নথিপত্রের জন্য পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হন৷ অন্যদিকে, পুরুষদের কাছে জমি কেনাবেচার মতো কাজের জন্য সাধারণত প্রয়োজনীয় নথিপত্র বেশি থাকে৷’’
ভোটে কী প্রভাব
রাজ্যের ২ কোটি ৪০ লক্ষ নারী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের সুবিধা পান৷ আরো অন্যান্য প্রকল্প রয়েছে রাজ্য সরকারের৷ গত কয়েকটি নির্বাচনে নারীদের বড় অংশ ভোট দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে৷ নারীদের ভোট এসআইআরের ফলে বাদ পড়লে শাসক দলের কতটা সমস্যা হবে?
ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, পর্যবেক্ষক শুভময় মৈত্র সংবাদমাধ্যমে বলেন, “লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্পের কারণে মহিলারা তৃণমূলকে বেশি ভোট দিয়েছেন, এটি একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে বলা৷ এর সপক্ষে কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আছে কি না, তা আমার জানা নেই৷ গত নির্বাচনের বাকি সব পরিস্থিতি যদি একই থাকে, তবে ভোটার তালিকা থেকে বহু মহিলা ভোটারের নাম বাদ পড়লে তৃণমূল সমস্যার সম্মুখীন হবে৷ কিন্তু আমরা জানি যে প্রতিটি নির্বাচনের চরিত্র আলাদা হয়৷ এই নির্বাচনে এমনটাও হতে পারে যে, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে আরও বেশি সংখ্যক মহিলা তৃণমূলকে ভোট দিলেন৷’’
মইদুল ইসলাম বলেন, ‘‘আপাতদৃষ্টিতে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তৃণমূলের কোর বেস নারী এবং সংখ্যালঘু৷ তাই মনে হতে পারে তৃণমূলের সমস্যা হবে৷ কিন্তু এর একটা কেমিস্ট্রি আছে৷ যাদের নাম বাদ গিয়েছে, তাদের পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীরা হয়রানির মুখে পড়েছেন৷ তাদের ভোট তৃণমূলের দিকে যেতে পারে৷ কারণ এসআইআরকে একটা ইস্যু করেছে তৃণমূল৷ এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভোট করার যে ডাক তৃণমূল দিয়েছে, সেটা বিজেপির বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে৷’’
যাদের ভোট বাদ গিয়েছে, তাদের জন্য আশার কথা শুনিয়েছেন ফিরদৌস৷ বলেন, ‘‘যদি কোনো কারণে ভোটাধিকার চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করার পথ খোলা রয়েছে৷ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ আছে৷’’
কিন্তু প্রান্তিক সমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী বা তার পরিবারের কতটা সামর্থ্য আছে যে তারা শীর্ষ আদালতে আবেদন করে ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনবেন, এই প্রশ্ন থেকেই যায়৷