1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

ধর্ষণের শিকার শিশুর ছবি ও পরিচয় প্রকাশ: আইন কী বলে?

২১ মে ২০২৬

বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর ছবি এবং নাম-পরিচয় প্রকাশ নিষিদ্ধ৷ তিনি জীবিত বা মৃত যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, এই আইন প্রযোজ্য হবে৷ এবং এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ৷

https://p.dw.com/p/5E86N
প্রতীকী ছবি
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ (১) ধারায় হত্যা বা মৃতদের বিষয়টি স্পষ্ট করা নেই বলে মনে করেন অনেকে৷ তবে ২০২১ সালের ৮ মার্চ উচ্চ আদালত এক রিটের আদেশে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘‘ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো নারী বা শিশু সে জীবীত বা মৃত হোক কোনো অবস্থায়ই তার ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না৷’’ছবি: Evgeniia Gordeeva/Zoonar/picture alliance

সংবাদমাধ্যম ছাড়াও সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য৷
বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ (১) ধারায় বলা আছে, ‘‘এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তৎসম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা, ছবি বা অন্যবিধ তথ্য কোনো সংবাদপত্রে বা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে বা অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়৷’’
শাস্তির ব্যাপারে বলা আছে, ‘‘এর বিধান লংঘন করা হইলে উক্ত লংঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকে অনধিক দুই বৎসর কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷’’
কিন্তু বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যমকে প্রায়ই এই আইন মানতে দেখা যায় না৷ 
সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিষয়টি আবার সামনে এসেছে৷ প্রথম আলো অনলাইনের এক সংবাদের সঙ্গে ঐ শিশুর ছবি প্রকাশের পর দৈনিকটির উপ-সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছির সঙ্গে কথা বলেছে ডয়চে ভেলে৷ এই সময় তিনি বলেন, ‘‘আমরা হত্যার পর শিশুটির ছবি ছেপেছিলাম৷ তখন ধর্ষণের কথা জানতাম নাম৷ জানার পর আমরা ছবিটি সরিয়ে ফেলেছি৷ আমাদের ভিডিও কনটেন্ট থেকেও তার ছবি সরিয়ে ফেলেছি৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা ভাবতেই পারিনি যে অত ছোট একটা শিশু ধর্ষণের শিকার হতে পারে৷ তবে আমাদের বিষয়টি ভাবনায় রাখা উচিত ছিল৷ আমরা রেপ ভিকটিমের ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করি না৷ আইন হওয়ার আগে থেকেই আমাদের এ সংক্রান্ত নীতিমালা আছে৷’’
তবে তার সঙ্গে কথা বলার পরও প্রথম আলোর ঐ শিশু হত্যা সংক্রান্ত একটি খরের অনলাইন লিংকে শিশুটির ছবি পাওয়া যায়৷
দ্য ডেইলি স্টারের অনলাইন বাংলা ভার্সনে ‘শিশু ...কে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়: পুলিশ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে শিশুটির ছবি দেখতে পাওয়া যায়৷ এ নিয়ে পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক নাঈমুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি লিখিতভাবে জানান, ‘‘যৌন সহিংসতার শিকার কোনো ব্যক্তির পরিচয়, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করে, মর্যাদা ক্ষুন্ন এমন কোনো তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করে আমাদের কঠোর সম্পাদকীয় নীতি আছে৷ শিশুদের ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রেও আমাদের একটি কঠোর নীতি রয়েছে, যদি না কোনো ব্যাপক জনস্বার্থ থাকে অথবা পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসাধারণ ও কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কোনো জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়৷’’
তিনি বলেন, ‘‘... (শিশুটির নাম উল্লেখ করেছিলেন) ক্ষেত্রে, এটি একটি অত্যন্ত কঠিন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত ছিল৷ শেষ পর্যন্ত আমাদের মুদ্রিত সংস্করণের জন্য আমরা ছবির পরিবর্তে শিশুটির একটি স্কেচ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই৷ স্কেচটি ছিল ... একটি প্রতিকৃতি, যা আমাদের সংবাদদাতার পরিবারটির কাছ থেকে পাওয়া একটি ছবি থেকে আঁকা৷ তিনি পরিবারটির অনুমতিও নিয়েছিলেন৷ সেই সম্মতি থাকা সত্ত্বেও, সিদ্ধান্তটি নেয়া বেশ কঠিন ছিল৷ আমাদের লক্ষ্য ছিল এই অপরাধের চরম নৃশংসতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবস্থা নিতে চাপ দেয়া৷’’
নাঈমুল হক জানান, ‘‘যদিও ঘটনাটি দ্রুত পরিবর্তনের কারণে আমাদের অনলাইন বিভাগে প্রাথমিকভাবে শিশুটির একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু এই মর্মান্তিক ঘটনার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট উন্মোচিত হওয়ার সাথে সাথে আমরা অনলাইনেও স্কেচটি প্রকাশ করা শুরু করি৷’’
ডয়চে ভেলে দৃষ্টি আকর্ষণের পর ডেইলি স্টারের বাংলা অনলাইন থেকে ছবিটি সরিয়ে স্কেচ ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান তিনি৷
অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করি না৷ আর আইনে আছে ধর্ষণ মামলার আসামিদের ছবিও একটা পর্যায় পর্যন্ত প্রকাশ করা যাবে না৷ আবার এই ধরনের ঘটনার যিনি শিকার হন তিনি ও তার পরিবার যদি বিচারের দাবিতে এগিয়ে আসেন তখনো আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিই ছবি ছাপা হবে, কী হবে না৷’’
‘‘কিন্তু আমরা ... ছবিটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ছেপেছি৷ কারণ আইনে নিষেধ থাকলেও কখনো কখনো বিচার পেতে এই ছবি ছাঁপতে হয়৷ নয়তো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না৷ এখানে ছবিটি একটি মানবতার প্রতীক৷ যেমন ... (একজনের নাম উল্লেখ করেছেন) ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তার চেহারা না দেখিয়ে ভ্যানসহ মরদেহের ছবি প্রকাশ করা হয়েছিল,’’ বলেন তিনি৷
আর মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, ‘‘আমরা যেটা বুঝি তা হলো, রেপ ভিকটিম জীবিত থাকলে তার ছবি, পরিচয় প্রকাশ করলে তার ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হয়৷ তাই প্রকাশ করি না৷ এখানে ...কে তো হত্যা করা হয়েছে৷ তার কোনো ভবিষ্যতই নাই৷ ছবি প্রকাশ করে বরং এখানে ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করা হচ্ছে৷’’
জীবিত, মৃত সবার ক্ষেত্রেই আইন প্রযোজ্য
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৪ (১) ধারায় হত্যা বা মৃতদের বিষয়টি স্পষ্ট করা নেই বলে মনে করেন অনেকে৷ তবে ২০২১ সালের ৮ মার্চ উচ্চ আদালত এক রিটের আদেশে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘‘ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো নারী বা শিশু সে জীবীত বা মৃত হোক কোনো অবস্থায়ই তার ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না৷’’
ওই সময়ে ঢাকার কলাবাগানে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার এক কিশোরীর ছবি এবং পরিচয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশে ক্ষুব্ধ হয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান ‘জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশনের’ পক্ষে রিট করেন৷ হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জানের বেঞ্চ তখন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ব্যাখ্যা দেন৷ তারা বলেন, জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থায়ই ছবি, পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না৷ ওই আদেশে যারা ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়৷ আর আইনের লঙ্ঘনের ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়৷
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী গত বছরের ৯ মার্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে মাগুরায় ধর্ষণের শিকার একটি শিশুর ছবি তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন৷ ধর্ষণের পর ওই শিশুটিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল৷
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, ‘‘ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু যে কারুরই ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না৷ তিনি জীবিত বা মৃত যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন৷ এটা আইনের বিধান এবং এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ ওই আইন হওয়ার পরেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে৷’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের এখানে কেউ কেউ মনে করেন ধর্ষণের পর হত্যা করলে বা মারা গেলে তার ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে৷ কিন্তু এই ধারনা ঠিক না৷ কারণ এখানে ভিকটিমের বাইরে তার পরিবারের সদস্যরাও আছেন৷ রেপ ভিকটিম মারা গেলেও পরিচয় প্রকাশ করলে তার পরিবারের সদস্যরা বিপর্যস্ত হতে পারেন৷ সামাজিক চাপ বা স্টিগমার মুখে পড়তে পারেন৷’’
‘‘যে আইন আছে সেটা সংবাদমাধ্যমকে মানতে হয়তো বাধ্য করা যাবে৷ কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছবি ছড়িয়ে পড়ে তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে আমি বুঝতে পারছি না,’’ বলে মন্তব্য করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান৷
তবে তিনি মনে করেন, ‘‘... ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, সে প্রথমে নিঁখোজ হয়৷ তারপর হত্যার কথা জানা যায়৷ রেপের ঘটনা পরে জানা যায়৷ তার যে ছবিটি প্রকাশ হয়েছে সেটা তার স্কুল ড্রেস পরা ছবি৷ এটা হয়তো তার পরিবারই প্রথমে দিয়েছে তাকে খুঁজে পেতে৷ তারা সংবাদমাধ্যমের সামনেও কথা বলেছেন৷ কিন্তু রেপের কথা প্রকাশ হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ছিলো ছবি সরিয়ে নেয়া৷ পরিচয় সরিয়ে ফেলা৷ আর এইসব ঘটনায় সংবাদমাধ্যমকে আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার৷’’
‘‘কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেপ ভিকটিমের ছবি ছাপা হয়, পরিচয় প্রকাশ করা হয়৷ এর মাধ্যমে আসলে ওই ভিকটিম এবং পরিবারকে ক্ষতির মুখে ফেলা হয়৷ কেউ আবেগ সৃষ্টি করে প্রচার বাড়াতে এটা করে থাকতে পারেন,’’ বলে মনে করেন তিনি৷
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স্নিগ্ধা রেজওয়ানা বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যমের কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে রেপ ভিকটিম নিহত হলে বা মারা গেলে তার ছবি প্রকাশ করে ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করা যায়৷ আমি মনে করি এই চিন্তা ঠিক নয়৷ মনে রাখতে হবে তার পরিবারে আরো সদস্য আছেন, ছবি ও পরিচয় প্রকাশ করে তাদের আমরা বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি কী না তা ভাবতে হবে৷ কোনো ঘটনায় হয়তোবা আবেগ থাকতে পারে৷ কিন্তু আমরা অনেক ঘটনায় দেখেছি ভিকটিমইকেই দায়ী করা হয়৷ তখন তার পরিবারের সদস্যরাও সামাজিক সস্যায় পড়েন৷’’
‘‘তবে কোনো ভিকটিম বা ভিকটিমের পরিবার যদি স্বাধীনভাবে স্বেচ্ছায় ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করতে চান তাহলে আলাদা কথা৷ সেখানেও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে,’’ বলেন তিনি৷
২০২১ সালে কলাবাগানে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার কিশোরীর ছবি সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল৷ আর ওই ঘটনায় ভিকটিম ব্লেইম প্রবল হয়৷ তখন ওই কিশোরীর পরিবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন৷ তারা এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হয়েছিলেন৷
শুধু ২০০১ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনই নয়, প্রেস কাউন্সিল আইন ও সম্প্রচার নীতিমালায়ও ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুর ছবি ও নাম পরিচয় প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আছে৷
এছাড়া বাংলাদেশের আইনে অপরাধে জড়িয়ে পড়া ১৮ বছরের কম বয়সের শিশুর ছবি প্রকাশেও নিষেধাজ্ঞা আছে৷

‘আমরা ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর ছবি, পরিচয় প্রকাশ করি না’

‘ধর্ষণের শিকারের ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না’