‘সেন্সরশিপের জন্য শুধু সরকার দায়ী নয়′ | বিশ্ব | DW | 12.06.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

‘সেন্সরশিপের জন্য শুধু সরকার দায়ী নয়'

সরকার যতটা নিয়ন্ত্রণ করে, নানা কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি আত্মনিয়ন্ত্রিতই হয় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম৷ ফেসবুক লাইভে এমনটিই বললেন বাংলাদেশের দুই শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক৷

জার্মানির বনে ১১তম গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে যোগ দিতে এসেছেন ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের নির্বাহী সম্পাদক খালেদ মুহিউদ্দীন৷ সম্মেলনের ফাঁকে নৌবিহারে ডয়চে ভেলের ফেসবুক লাইভে তাঁরা সংবাদপত্রের সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও দায়বদ্ধতা নিয়ে আলোচনায় এমনটাই বলেছেন৷

ফেসবুক লাইভের সঞ্চালক ও ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের সাংবাদিক আশীষ চক্রবর্ত্তী বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় সরকারি হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা জানতে চাওয়ায় দু’জনই বাইরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বরং সাংবাদিকদের নিজেদের ‘সেন্সরশিপ'কেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন৷

খালেদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘‘পৃথিবীতে কোনো দেশেই মিডিয়া আসলে স্বাধীন নয়৷ বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়৷ বাংলাদেশ মিডিয়াকে সরকার যতটা নিয়ন্ত্রণ করে  তার চেয়ে সাংবাদিকরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রিত হয়৷ অনেকসময়ই ছোটখাটো লোভ যেমন, বিশেষ ব্যক্তির কাছাকাছি যাওয়ার লোভ, বিদেশে সফরের লোভ, সরকারের কাছাকাছি থাকার লোভ, ইত্যাদির কারণে সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রিত হয়৷''

তিনি বলেন, ‘‘আরেকটি কারণ হচ্ছে অনেক মিডিয়া হয়েছে৷ বাজার সঙ্কুচিত হয়েছে৷ প্রতিযোগিতা বেশি হওয়ায়, কেউ কিছু করতে না পারলে দায় অন্যের ওপরে চাপানোর চেষ্টা করে৷ সরকার টুটি চেপে ধরছে – এই অভিযোগ ঠিক মেনে নিতে পারছি না৷''

আলোচনার এক পর্যায়ে ব্লগার শাম্মী হকের একটি প্রশ্নের জবাবে খালেদ বলেন, ‘‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেক বড় একটা টার্ম৷ আমরা এটাকে কীভাবে দেখি, সেটার ওপর নির্ভর করে৷ এরশাদ সরকারের সময় যেমন আমরা দেখেছি প্রেসনোট দিয়ে সংবাদ আটকে রেখেছে, সেরকম কিন্তু দেখি না আমরা৷''

‘‘বাংলাদেশের দুটি বড় পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে অনেকে বলেন, সরকার পক্ষের সংবাদ তাদের মতো করে না ছাপানোতে তারা অনেক সময়ই অসুবিধার সম্মুখীন হয়৷ কিন্তু ওই পত্রিকাগুলোর কর্তৃপক্ষ কিন্তু কখনোই এটা বলেন না৷ আমি মনে করি, এটা প্রফেশনাল অ্যাপ্রোচ৷ পেশাগত হ্যাজার্ড থাকবেই৷ কিন্তু এর সাথে টুটি চেপে ধরার কোনও সম্পর্ক নেই৷ প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত হওয়ার মতো কোনো প্রশ্ন করলে কিংবা ডেইলি স্টারে কোনও কার্টুন ছাপা হলেই কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবে এ অবস্থা বাংলাদেশে নেই৷''

সংবাদমাধ্যম দায়বদ্ধতার জায়গায় কতটা স্বচ্ছ –  সঞ্চালক আশীষ চক্রবর্ত্তীর এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক বলেন, ‘‘ঢাকা থেকে ১৫০টি সংবাদপত্র প্রকাশ হয়৷ ৩৫টির বেশি টিভি চ্যানেল আছে৷ ৫০০-র মতো অনলাইন পোর্টাল আছে৷ এটা বলা কঠিন, তারা কোন কোন ধরনের দায়বদ্ধতা মেনে চলছে৷ আমার পত্রিকার পক্ষ থেকে বলতে পারি, আমরা যতদূর সম্ভব এটা মেনে চলি বা চেষ্টা করি৷ আমরা এথিক্যাল জার্নালিজম করতে চাই, অবজেক্টিভ জার্নালিজম করতে চাই, ডেইলি স্টারের টুটি চেপে ধরার জায়গাটি নেই, কিন্তু রেস্ট্রিকশন আছে৷ এটা গ্লোবালি আছে৷ এটা মাথায় রেখেই আমাদের আরও দায়বদ্ধ হতে হবে৷ গ্লোবালি এই চাপটা আমাদের মেনে নিতে হবে৷ আমাদের ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনে জোর দিতে হবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘দায়বদ্ধতার ব্যাপারটা সম্মিলিতভাবে ভাবতে হবে৷ যেমন, এখন ফেসবুক একটি মাধ্যম মত প্রকাশের, সেখানেও কিন্তু আপনার ভাবতে হবে৷ দায়বদ্ধতার কথা মনে করে লিখতে হবে৷ একটা ‘থিন লাইন' কিন্তু আছে৷''

এসময় কয়েকটি সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম বন্ধ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হলে খালেদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘‘দৈনিক দিনকাল, সংগ্রাম এবং নয়াদিগন্ত তো ভয়ঙ্করভাবেই সরকারের বিরোধিতা করে৷ কিন্তু ওদের তো বন্ধ করা হয়নি? তাদের দশভাগের একভাগ যদি আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকাতেই লিখি, সরকার চায় যে সেটা সেভাবে লেখা না হোক৷ এটা আসলে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার লেখা মানুষ কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে, সেইটার ওপর নির্ভর করে৷ কনটেন্ট না৷ আপনি যদি ওদের কনটেন্ট দেখেন তারা কিন্তু দারুণ বিরোধিতা করে৷ কিন্তু তারা আসলে ‘ইরেলেভেন্ট'৷''

এ সময় এক দর্শক প্রশ্ন করেন, চাকরি বাঁচাতে সাংবাদিকদের বাক স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হচ্ছে কিনা, বিশেষ করে মালিকপক্ষ যখন সরকার সমর্থক!

খালেদ এ প্রশ্নটির জবাবে উদাহরণ টেনে বলেন, ‘‘যত বড় বড় ত্রুটি সরকারের ‘লিক' হয়েছে সেগুলো তো গণমাধ্যমই সামনে আনছে৷ মালিকানা সরকারি দলের কিনা সেটা কোনও বিষয় না৷ কেননা, এই সরকারের আমলে অনুমোদন পেয়েছে, এমন অনেক টিভি চ্যানেলের চেয়ে আগের সরকারের আমলে অনুমোদন পেয়েছে তারাই কিন্তু বেশি এ সরকারের স্তুতি করছে বা করে৷''

ব্লগার শাম্মী হক এসময় জানতে চান মিডিয়ার মালিকের নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব খালেদ মুহিউদ্দীন উহ্য রাখছেন কিনা৷ প্রত্যুত্তরে খালেদ বলেন, ‘‘ সারা পৃথিবীর মিডিয়ার একই চরিত্র৷ ধরুন বাংলাদেশের মিডিয়া, এটা পুরুষতান্ত্রিক, এটা মুসলমানদের, আরও স্পেসিফিকেলি সুন্নি মুসলমানদের৷ কেননা, তারাই ক্ষমতায়৷ পৃথিবীর মিডিয়াগুলো তো এভাবেই চলে৷ কাজেই গুরুত্ব তো আছেই৷ কিন্তু আমি কথাটা  দায়বদ্ধতার দিক থেকে বলতে চাচ্ছি৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করা খালেদ আরো বলেন, ‘‘মিডিয়া কোনো লিনিয়ার ব্যবসা না৷ আমি টকশো করবো বা ডেইলি স্টারের আশফাক ভাই প্রতিবেদন ছাপবেন, আমাদের মালিকরা আমাদের মাথার উপর বসে থাকে৷ তাদের ইন্টারেস্টের বিপরীতে যখন আমরা কিছু করি, মালিকদের এতে সুখ লাগে না৷ তারা তাদের জায়গায় অসুখী৷ কিন্তু এটা তাদের মানতে হয়৷ কেননা, এটা না হলে হয় না৷ সাংবাদিকদের দায়িত্ব হচ্ছে, নিজেদের একটা আলাদা অস্তিত্ব তৈরি করা৷''

খালেদ মুহিউদ্দীনের দাবি, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, সেই ইন্ডিপেন্টেন্ট টেলিভিশন মালিকের সব নির্দেশ মেনে চলে না৷ তাঁর ভাষায়,‘‘আমার টেলিভিশন কিন্তু সালমান এফ রহমানের টেলিভিশন না, আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমার টেলিভিশন সালমান এফ রহমানের টিভি না৷ সালমান এফ রহমানের আদর্শ চেতনা দিয়ে কিন্তু ইনডিপেন্ডেন্ট টিভি চলে না৷''

বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডেরপ্রসঙ্গে ডেইলি স্টার সম্প্রতি একরামুল হকের যে অডিও টেপটি প্রকাশ করেছে তার জন্য ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট প্রায় ২০ ঘণ্টার জন্য বন্ধ ছিল৷

এ বিষয়ে আশরাফুল হক বলেন, ‘‘একরামের ঘটনায় প্রকাশ হওয়া অডিও টেপটি সংবাদ সম্মেলনে তার পরিবার দিয়েছিল৷ সবাই হাতে পেলেও, একমাত্র ডেইলি স্টারই তা প্রকাশ করেছে৷ এটা কিন্তু আমাদের নিজেদের অনুসন্ধান করা প্রতিবেদন নয়৷ কেউ কেউ ভেবেছে এটা নিউজ করার উপযোগী না, অথবা এটা ভেরিফাই করা উচিত৷ আমরা ভেবেছি, প্রথমবার ভিক্টিমের পরিবার থেকে একটা রেকডের্ড পেয়েছি৷ পাওয়ার পর দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমরা ছেপেছি৷ ইট ওয়াজ এ হিউজ ডিসিশন৷ টুটি চেপে দেওয়ার ঘটনা নাই, কিন্তু কিছু রেস্ট্রিকটেড করার ঘটনা তো এসেছেই৷ সেল্ফ সেন্সরশিপ এসেছে৷ আমরা আগে কম এক্সারসাইজ করে আসছিলাম, সেটা এখন বেশি করছি৷ তবে হ্যাঁ, ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট ২০ ঘণ্টা বন্ধ ছিল৷''

কর্তৃপক্ষ কি দায় স্বীকার করেছে কি না জানতে চাইলে আশরাফুল হক বলেন, ‘‘বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেছেন, তিনি এটা জানেন না৷ বিটিআরসির দুটো সেকশন আছে৷ এটা সেইফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি উইং-এর কেউ করেছে৷ আমরা ধারণা করি, এটা সরকারের উঁচু মহলের কেউ নন৷ তারা কেবল ওই নিউজটা ব্লক করতে চাইলেও সেটার টেকনোলজি যেহেতু খুবই এক্সপেন্সিভ এবং আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সম্ভব না, ফলে ওই কনটেন্ট বন্ধ করতে হিয়ে আমাদের সাইটই বন্ধ করে দিয়েছে৷''

আশফাকুল হক বলেন, ‘‘এটা তো একটা প্রকাশনা বন্ধের সামিল৷ তবে আমরা খুশি, কেননা গভর্নমেন্টের টপ লেভেল থেকে এটার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ হয়েছে, নইলে তো এটা বন্ধই থাকতো৷ এটা ভালো দিক৷''

এইচআই/এসিবি

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়