‘শুধু আত্মসমর্পণ দিয়ে হবে না, শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে′ | আলাপ | DW | 30.04.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘শুধু আত্মসমর্পণ দিয়ে হবে না, শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে'

সম্প্রতি প্রায় সাড়ে ছয়শ চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করেছেন৷ এর আগে কক্সবাজারে মাদক ব্যবসায়ী ও সুন্দরবনে জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করেছিলেন৷ কিন্তু আত্মসমর্পণই কি সমাধান? নাকি আরো কিছু করার আছে?

এসব বিষয় নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন৷

ডয়চে ভেলে: সরকার উগ্রপন্থিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে৷ এটা নিয়ে আইন কী বলে?

অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন: বিষয়টা হচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন অপরাধ বা চরমপন্থা বা উগ্রপন্থার সঙ্গে জড়িয়ে যায়, সেটা কোনো এক আদর্শিক কারণে৷ তাই এদের শাস্তি দেওয়ার চেয়ে সবচেয়ে বেশি দরকার সংশোধন, পুনর্বাসন এবং সমাজে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা৷ এরা যদি অপরাধ বা উগ্রপন্থার সঙ্গে থেকেই যায়, তাহলে সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি বেড়েই যাবে৷ সেই কথাটা চিন্তা করে আত্মসমর্পণের পর এদের চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা করা, বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং এরা যেন সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে৷ কারণ তারা যদি সুস্থ জীবনে ফিরে না আসে, তবে যেহেতু তারা একবার উগ্রপন্থায় দীক্ষা গ্রহণ করেছে, সেহেতু তারা বোমা হামলা করতেই থাকবে৷ ফলে সমাজে অশান্তি করতেই থাকবে৷ এটা কারো জন্যই ভালো না৷ সেই দিক থেকে আমি মনে করি, আত্মসমর্পণ একটা ভালো উদ্যোগ৷

যেভাবে পুনর্বাসন হচ্ছে, সেই পদ্ধতি কি ঠিক আছে?

পদ্ধতিটা হলো, বেশি আনুষ্ঠানিকতা বা লোক দেখানো হয়ে গেলে মুশকিল৷ অবশ্যই সরকারের উদ্যোক্তাকে আমি সাধুবাদ জানাই, ইতিবাচক মনে করি৷ তবে অবশ্যই যেন এটা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে৷ যারা চরমপন্থি, তারা যেন পুনর্বাসিত হতে পারে বা সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে, সরকারকে অবশ্যই সেই ব্যবস্থা করতে হবে৷ তাহলে আমি মনে করি এটা সমাজের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক হবে৷

এভাবে পুনর্বাসনের ফলে কি উগ্রপন্থি দমনে সফলতা আসতে পারে?

আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে অনেক সমস্যা৷ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সমস্যা, পরিবারের মধ্যে সমস্যা, রাজনীতির মধ্যেও সমস্যা৷ আসলে একজন মানুষকে ছোটবেলা থেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে৷ তার ভেতরে যেন সাম্প্রদায়িকতা না থাকে, যেন উগ্রতা না থাকে৷ যেমন মুসলিম উগ্রপন্থি, হিন্দু উগ্রপন্থি বা বৌদ্ধ উগ্রপন্থি – কোনো একটা ধর্মের জন্য বা আদর্শের জন্য বা জাতীয়তার জন্যও অনেকে উগ্র হয়ে যান৷ আসলে আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে৷ একজনকে যদি আমরা মানুষ হিসেবে তৈরি করতে না পারি, তাহলে সে যদি উগ্রপন্থার দিকে চলে যায় এবং পরে যদি আমরা তাকে গুলি করে মেরে ফেলি বা আত্মসমর্পণ করাই – সেটা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়৷ আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এটা দেখা, যাতে মানুষ কোনোভাবেই উগ্র না হয়৷ এতে করে সমাজ এবং রাষ্ট্র ঝুঁকিমুক্ত থাকবে৷

অডিও শুনুন 07:14

‘অবশ্যই যেন এটা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে’

চরমপন্থিদের আগে সুন্দরবনে জলদস্যুদের পুনর্বাসন করা হয়৷ এতে কি সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হয়েছে?

আসলে হয় কি, এই যেমন মাদকের বিষয়টি৷ কয়েকদিন আগে তো মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণ করানো হলো৷ যে কারণে মানুষ মাদক গ্রহণ করে বা যে কারণে মাদক ব্যবসাটা চলে, সেটা হলো শেকড়ের কারণ৷ সেগুলো যদি আপনি উপড়ে ফেলতে না পারেন, তাহলে শুধুমাত্র কয়েকজন ব্যবসায়ীকে আত্মসমর্পণ করিয়ে সেটাকে নির্মূল করা খুব কঠিন৷ যে কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে আপনাকে শেকড়ে যেতে হবে৷ সেটা মাদক হোক, উগ্রবাদ হোক আর জলদস্যু হোক৷ আর কিছু কিছু বিষয় আছে, যেটা আপনি পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবেন, তা কিন্তু নয়৷ এটা যতটা নিয়ন্ত্রণে বা সহনীয় অবস্থার মধ্যে রাখা যায়৷

এক্ষেত্রে সরকার কী করতে পারে? 

সরকারের তো অনেক বড় দায়িত্ব আছে৷ জঙ্গিবাদ বা উগ্রবাদ যখন হয়েছে, তখন থেকেই এটার একটা ‘ডেটাবেজ' তৈরি করার দরকার ছিল৷ আমরা যখন জঙ্গিবাদ বলি, তখন কে জঙ্গি হচ্ছে তাকে শনাক্ত করা দরকার৷ ওটার সঙ্গে যদি কোনো সংগঠন থাকে, তাহলে সেটা কি জাতীয় সংগঠন, না আন্তর্জাতিক সংগঠন, তাদের ‘নেটওয়ার্ক' কী বা তাদের ‘ফান্ডিং' কারা করছে – এগুলো কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ সুতরাং সেটা খুঁজে বের করার ব্যাপারে সরকারি সংস্থাগুলোর অনেক দায়িত্ব রয়েছে৷ এছাড়া একজন মানুষ যেন জঙ্গি বা উগ্রপন্থি হয়ে না ওঠে, সেজন্য শুধু রাষ্ট্র না, পুরো সমাজ ব্যবস্থা, তার পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি সব কিছু মিলেই সে যেন আসল মানুষ হয়ে উঠতে পারে, সেটা দেখা প্রয়োজন৷ ধর্ম বা আদর্শের জন্য সে যেন নাশকতা না করে বা কারো ক্ষতি যেন না করে৷ ধর্ম বা আদর্শের জন্য সে যদি নিজেকে উৎসর্গ করে, তাতে তো সমস্যা নেই৷ কিন্তু সে যদি কারো ক্ষতি করে, সেটা তো হলো না৷

আমাদের সরকার কি পুনর্বাসিত উগ্রপন্থিদের উপর নজরদারি করে?

সেটা মনে হয় করে না৷ আমাদের গোয়েন্দা বা সরকারি বাহিনীগুলো এমনিতেই ‘ওভার বার্ডেন' অবস্থায় রয়েছে৷ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, যেমন পুলিশ, ব়্যাব বা গোয়েন্দাদের এত এত কাজ৷ তার মধ্যে এটা করা হয়ত সম্ভবও না৷ আমার মনে হয়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যাঁরা কর্মরত, তাঁদের মধ্যে একটি ‘উইং' তৈরি করে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে৷ এদের আসলে কী প্রয়োজন বা এরা সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে আছে কিনা– সেটা এই কর্মকর্তারা দেখভাল করবেন৷ আত্মসমর্পণের পর আপনি যদি তাদের উপর নজরদারি না রাখেন তাহলে তারা তো সেই বিপজ্জনক পথে ফিরে যেতেই পারে৷

পুনর্বাসনের পর যদি কেউ একই অপরাধ করে, তখন কী হবে?

বিদেশে কিন্তু ‘কারেকশন', শাস্তির চেয়ে অনেক ব্যাপক৷ সেখানে এগুলো দেখার জন্য অনেকগুলো সংস্থা আছে৷ আমাদের এখানে সংশোধনের জন্য ‘কনসেপ্টগুলো' সেভাবে বিকশিত হয়নি৷ এরজন্য যে কাজ করা প্রয়োজন, সেটাও আমরা খুব একটা দেখতে পাই না৷ সেটা যদি না থাকে তাহলে শুধুমাত্র আত্মসমর্পণ করে খুব একটা ফল পাওয়া যাবে না৷

উগ্রপন্থিদের পুনর্বাসনে সমাজ বা রাষ্ট্র কি লাভবান হচ্ছে?

আমার মনে হয় হচ্ছে৷ যারা চরমপন্থা বা উগ্রপন্থার দিকে চলে গেছে, তারা যদি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে তাহলে সমাজের লাভ না? আর যদি তারা ফিরে না আসে তাহলে তো ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে৷ তারা যে কোনো সময় হামলা করতে পারে, নাশকতা করতে পারে৷

এদের পেছনে সরকার যে অর্থ ব্যয় করছে, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

এটা প্রয়োজনীয় ব্যয়৷ সমাজ বা রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বা নিরাপত্তার জন্য এটা করছে সরকার৷ এটা খুবই প্রয়োজনীয় ব্যয় এবং এটা আরো বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি৷ তবে ব্যয়টা যেন যথার্থ হয় বা কাজে লাগে, সেদিকেও নজর রাখা উচিত৷

উগ্রপন্থিদের পুনর্বাসন নিয়ে সরকারের প্রতি আপনার পরামর্শ কী হবে?

শুধু আত্মসমর্পন করলেই হবে না, তারা যেন সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে, যেমন চাকরি, বাসস্থান, শিক্ষা – যা যা তাদের দরকার, তার ব্যবস্থা করতে হবে৷ কার কী দরকার সেটা দেখতে হবে৷ সবার তো আর একই ধরনের প্রয়োজন হবে না৷ সেই কাজগুলো করতে হবে৷ তাদের প্রয়োজন মেটাতে হবে এবং তত্ত্বাবধানের মধ্যে রাখতে হবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন