মানুষ বনাম ভাইরাস, জিতছে কে! | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 09.04.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

মানুষ বনাম ভাইরাস, জিতছে কে!

পৃথিবীতে কোনো ভাইরাসই মানুষের সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারেনি৷ সবচেয়ে সংক্রামক বলে পরিচিত হাম রোগের ভাইরাস রুবিওলাও মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছে৷ মানুষ জিতেছে, কিন্তু মানবিকতা? মনে হয় না৷

করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষ জিতে যাবে, কিন্তু মানবতা কি জিততে পারবে?

করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানুষ জিতে যাবে, কিন্তু মানবতা কি জিততে পারবে?

সায়েন্স ফিকশন গল্প না সিনেমাতে প্রধানত দুই ধরনের গল্প দেখা যায়৷ হয় মানুষ হয় অ্যালিয়েনের সঙ্গে লড়াই করছে, অথবা অচেনা কোনো ভাইরাসের সঙ্গে৷ একসময় ভাইরাসের আক্রমণে মানুষের জোম্বি হয়ে যাওয়ার গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো বেশ চলতো৷ এখন সেটা আরো আপডেট হয়ে অ্যালিয়েনে পৌঁছেছে৷ এসব নিয়ে ভিডিও গেমসও কম হয়নি৷

যেমন আমরা যদি সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিও গেম ওয়ার্ল্ড ওয়ার জি বা ওয়াকিং ডেড এর কথা বিবেচনা করি, জোম্বি অ্যাপোকেলিপসে পুরো পৃথিবী আক্রান্ত হয়৷ এই স্ট্র্যাটেজি বা শ্যুটিং গেমগুলোতে নিজের প্রিয়জনের পাশাপাশি অন্য বেঁচে থাকা মানুষদের নিয়ে মোকাবিলা করতে হয় ‘আনডেডদের'৷

এইসব অ্যাপোক্যালিপসে প্রায় সময়ই নিজের প্রিয়জনেরাও আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তখন সিদ্ধান্ত নিতে হয় বৃহৎ ভালোর জন্য তাদেরও ত্যাগ করার৷ এইসব গেমেও দেখা যায় যারা বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে নানা দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, প্রায়শই খাবার ও ওষুধ নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়াতে হয়৷

অনেকে সায়েন্সফিকশন বইয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন, অনেকে সিনেমার সঙ্গে৷ এটা স্বাভাবিক৷ সায়েন্সফিকশনে ফিকশনটা কিন্তু সায়েন্সের সঙ্গেই মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়৷ সুতরাং যারা সাইফাইয়ের ভক্ত, তারা কেনো এতে অবাক হচ্ছেন তা আমি বুঝতে পারছি না৷ মোবাইল ফোন একসময় ছিল সায়েন্সফিকশন, এখন বাস্তবের চেয়েও বেশি৷ এ নিয়ে অবাক হওয়ার কী আছে?

আবার সিনেমার কথা যদি ধরি সেটা কন্টাজিওনই হোক আর ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস, পুরো মানবজাতি আক্রান্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বের নেতারা এক হয়ে রক্ষা করেন পৃথিবীকে৷ কিন্তু বাস্তবে কী তা হচ্ছে? মানবজাতি এক হয়ে রুখে দাঁড়াচ্ছে? তা কিন্তু আমি অন্তত দেখতে পাচ্ছি না৷ বরং এই ভাইরাস বিজ্ঞান বনাম ধর্ম, চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র, গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র, ধনী বনাম গরীব, ইত্যাদি নানা বিতর্ক আরো উসকে দিয়ে আমাদের বিভক্ত করে দিচ্ছে৷

বিশ্বের নানা প্রান্তে সিনোফোবিয়া বা চীনাবিদ্বেষ শুরু হয়েছে৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তো বরাবরই এটিকে চীনা ভাইরাস বলে উল্লেখ করে আসছেন৷ তার এই বিদ্বেষ যতোটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে৷ এণন পরিস্থিততেও কিভাবে করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব দেয়া যায় সে চিন্তায় বিভোর দুই দেশ৷

কোভেক নামে জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথে অনেকখানি এগিয়ে গেছে৷ ট্রাম্প নাকি কেবল অ্যামেরিকার জন্য এ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থও সেধেছিলেন এ প্রতিষ্ঠানকে৷ জার্মানি-ফ্রান্স-ক্যানাডার জন্য প্রস্তুত করা মাস্ক ও অন্যান্য চিকিৎসা সুরক্ষা পণ্য একপ্রকার জোর করে নিজেরা নিয়ে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে৷

অন্য়দিকে, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে একতাবোধ গড়ে তোলার মূল স্তম্ভ উন্মুক্ত সীমানা, ভিসাবিহীন চলাচল এবং একক মুদ্রাব্যবস্থা পড়েছে হুমকির মুখে৷ প্রায় সবকটি দেশ বন্ধ করে দিয়েছে নিজেদের সীমান্ত৷ এখন করোনার অর্থনৈতিক সংকট কিভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট দুই ভাগ হয়ে গিয়েছে ইউরোপ৷ একদিকে ইটালি, পর্তুগাল, স্পেন, গ্রিস চায় সহজ শর্তে করোনা বন্ড৷ অন্যদিকে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক এর বিরোধী অবস্থানে৷ এ নিয়ে দিনের পর দিন আলোচনা করেও দেশগুলো একমত হতে পারেনি৷ শিগগিরই সবাই এ বিষয়ে একমত হলেও এই ক্ষত করোনা দূর হলেও থেকেই যাবে

HA Asien | Anupam Deb Kanunjna

অনুপম দেব কানুনজ্ঞ, ডয়চে ভেলে

এ তো গেলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গৃহীত নীতির কথা৷ আমরা ব্যক্তি হিসেবেও যে খুব মানবিক ভূমিকা রাখছি, তা কিন্তু না৷ বাংলাদেশে নিজের আশেপাশের মানুষের কথা চিন্তা না করেই কিছু প্রবাসী কোয়ারান্টিন মানতে অপারগ হলেন৷ ফলশ্রুতিতে বয়ে গেল প্রবাসীবিদ্বেষের ঢেউ৷ এরপর আমরা পেতে থাকলাম করোনা শনাক্ত হলেই তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা, বাসা থেকে বের করে দেয়া, হাসপাতাল বানাতে না দেয়া, কবর দিয়ে না দেয়া, এমনকি চিকিৎসা পর্যন্ত না দেয়ার খবর৷

গার্মেন্টস কর্মীরা কেনো দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর বাস-লঞ্চ ভর্তি করে দেশের বাইরে চলে গেলেন, আবার কেন পায়ে হেঁটে বা ট্রাকে চেপে চলে আসলেন, এ নিয়ে অনেকের ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে৷ কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন, এর কারণটা কী? কখনও কোনো গার্মেন্টস শ্রমিকের বাসায় গিয়েছি আমরা? আমি গিয়েছি৷ ফলে আমি জানি, আমরা সুবিধাপ্রাপ্তরা যাকে হোম কোয়ারান্টিনের মজা বলে উপভোগ করি, একজন দিনমজুর বা গার্মেন্টস শ্রমিকের জন্য সেটা কতোটা কষ্টদায়ক৷

জার্মানিতেও দেখেছি কন্টাক্ট ব্যান ঘোষণার আগে থেকেই মানুষ দোকান খালি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গাড়ি ভর্তি করে নিয়ে যাচ্ছেন৷ অথচ এসব জিনিস হয়তো তিনি এক মাসেও শেষ করতে পারবেন না৷ নিজের প্রয়োজনটা সবার আগে, পরে যে আসছে সে না খেতে পারলেও আমার কিছু যায় আসে না?

এখনও জার্মানির ফার্মেসিগুলোতে মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে না৷ শুরুতেই অনেকে মাস্ক কিনে নিয়ে বাসায় জমিয়ে রেখেছেন৷ অথচ এই স্বার্থপরতার সময়ে এই সাধারণ জ্ঞানটুকু আমাদের মাথায় কাজ করে না, আপনার পাশের মানুষটি মাস্ক না পরার কারণে আক্রান্ত হলে আপনি মাস্ক পরে বাঁচতে পারবেন না!

আমরা কোয়ারান্টিনে থাকায় পরিবেশ বিশুদ্ধ হচ্ছে, নদী, সাগর, আকাশ নীল হচ্ছে, সাগরে ডলফিন, রাস্তায় হরিণ দেখা যাচ্ছে. আমরা এতে খুব আনন্দিত হচ্ছি৷ কিন্তু করোনা চলে গেলে? আমরা কি বন উজাড় করা ছেড়ে দেবো? আমরা কি বলবো, ‘আমার এসি দরকার নেই, ভোগবিলাস কমিয়ে দিচ্ছি তবুও পরিবেশ সুস্থ থাক'?

করোনা ভাইরাস বিশ্বকে একদিক থেকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে৷ সবাই এখন সমানভাবে আক্রান্ত৷ অন্তত আমার জীবদ্দশায় এই প্রথম এশিয়া বা আফ্রিকা বা ইউরোপ, সবাই এক সুরে বলছে, ‘ভালো থেকো, সাবধানে থেকো'৷

বিজ্ঞানীরা একযোগে কাজ করছেন, শিগগিরিই হয়তো মিলবে ভ্যাকসিন৷ মানুষ শেষ পর্যন্ত ভাইরাসের বিরুদ্ধে জিতে যাবেই৷ কিন্তু মানবতা যে ক্রমশ হেরেই চলেছে এর প্রমাণ কিন্তু চোখের সামনে৷ টের পাচ্ছেন?

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন