মাদ্রাসায় পড়া ‘সফল’ নারীদের কথা | আলাপ | DW | 22.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

মাদ্রাসায় পড়া ‘সফল’ নারীদের কথা

বাংলাদেশে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগের মতো মেয়ে৷ তবে লেখাপড়া শেষে তাদের জন্য কাজের সুযোগ মাদ্রাসায় পড়া ছেলেদের তুলনায় কম৷ তবে সীমিত সুযোগ কাজে লাগিয়েই কর্মজীবনে সফল হচ্ছেন অনেকে৷

নাশিদ কামাল রাইয়ান পল্লী বিদ্যুতের সহাকারী পরিচালক৷ পড়েছেন যাত্রাবাড়ির জান্নাতুল বানাত মহিলা মাদ্রাসায়৷ তিনি সেখান থেকে আলিম পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে৷ অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন৷ এরপর যোগ দেন সরকারি চাকরিতে৷ মাদ্রাসায় লেখাপড়ার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘শুরুতে যখন মাদ্রাসায় পড়তাম তখন কেউ কেউ মনে করতেন এখানে লেখাপড়া হয় না৷ এখানে পড়ে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না৷ কিন্তু পরে তাদের ভুল ধারনা কেটে গেছে৷’’ তিনি জানান, মাদ্রাসায় তার মানসিক বিকাশে কোনো সমস্যা হয়নি৷ তাদের মাদ্রাসায় গিয়ে তারকা শিল্পীরাও অনুষ্ঠান করেছেন৷ তিনি নিজেও অনেক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন৷ পেয়েছেন সাফল্য৷ তার কথা, ‘‘সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আমি মাদ্রাসায় পড়ার কারণে ইসলামি শিক্ষাও পেয়েছি৷ এটা আমার জীবন গঠনে সহায়তা করেছে৷ আমি তো মনে করি মাদ্রাসায় পড়ার কারণে আমি অনেক বেশি সহনশীল৷’’

অডিও শুনুন 05:05

আমি মনে করি মাদ্রাসায় পড়ার কারণে আমি অনেক বেশি সহনশীল: নাশিদ কামাল রাইয়ান

নাশিদ কামাল রাইয়ান যে মাদ্রাসার পড়েছেন সেই জান্নাতুল বানাত মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহসেনা আক্তার৷ তার পুরো শিক্ষাই মাদ্রাসায়৷ আলিম পাসের পর তিনি ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তা না পড়ে মাদ্রাসা থেকেই সর্বোচ্চ কামিল ডিগ্রি নিয়েছেন৷ সেটা মাস্টার্স সমমান হিসেবে স্বীকৃত৷ তিনি জানান, তার মাদ্রাসার অনেক মেয়ে সরকারি চাকরি পেয়েছেন৷ এমবিবিএস ডাক্তারও হয়েছেন৷ মাদ্রাসার সাবেক ছাত্রী আমেনা খাতুন এখন আসগর আলি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেও জানালেন তিনি৷

মোহসেনা আক্তার বলেন, ‘‘আমাদের মাদ্রাসায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-র বই ও সিলেবাস অনুসরণ করা হয়৷ বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান সবই পড়ানো হয়৷ ফলে তারা সবই শিখছে৷ এসবের পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষাও নিচ্ছে৷ তাছাড়া চাকরির ক্ষেত্রেও তাদের সঙ্গে কোনো বৈষম্য করা হয় না’’

ভিডিও দেখুন 02:44

বাংলাদেশের মাদ্রাসা ছাত্রীদের যৌনশিক্ষা (১৮.১১.২০১৯)

নরসিংদির লাখপুর মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ছাত্রীদের জন্য নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে৷ নিয়মিত শরীর চর্চাও করানো হয় সেখানে৷ শরীর চর্চার জন্য নারী শরীর চর্চা শিক্ষকও আছেন বলে জানান মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুল হোসাইন৷ তিনি বলেন, ‘‘এখান থেকে ছাত্রীরা পাস করে কেউ সাধারণ উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে৷ সরকারি ও বেসরকারি চাকরি করছে৷ অধ্যাপক হয়েছেন, শিক্ষক হয়েছেন৷ অনেকে নার্স হয়েছেন৷ একজন দেশের বাইরেও চাকরি পেয়েছেন৷’’ আর মাদ্রাসায় চাকরির বড় একটি সুযোগ আছে সবার৷ এটা বাড়তি৷ তিনি জানান, তিনি নিজেই মাদ্রাসার সর্বেচ্চ শিক্ষা নিয়ে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারেননি৷ পরে সাধারণ শিক্ষা নিয়ে বিএড ও এমএড করেছেন৷

এই যে সাফল্য আর বৈষম্যহীনতার কথা, এগুলো সব আলিয়া ধারার এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার৷ এগুলো পরিচালিত হয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে৷

মাদ্রাসার দুই ধারা

বাংলাদেশে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাত্র তিনটি৷ ১. মাদ্রাসা -ই-আলিয়া, লালবাগ, ঢাকা ২. সিলেট সরকারি কামিল মাদ্রাসা এবং ৩. সরকারি মুস্তাফাবিয়া কামিল মাদ্রাসা, বগুড়া৷

এছাড়া আলিয়া ধারায় এমপিওভুক্ত মাদ্রাসাও আছে৷ তার মধ্যে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর এবতেদায়ি মাদ্রাসা আছে তিন হাজার ৪৩৩, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর দাখিল মাদ্রাসা ছয় হাজার ৪৯৩, একাদশ ও দ্বাদশ শেণি পর্যন্ত পড়ানোর আলিম মাদ্রাসা এক হাজার ৫৫৮ এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ানোর কামিল মাদ্রাসা ২১৮টি৷ এই মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে, অর্থাৎ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন৷

এর বাইরে সারাদেশে ২৫ হাজারের মতো কওমি মাদ্রাসা আছে৷ এই মাদ্রাসাগুলো পুরোপুরি বেসরকারি৷ বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া (বেফাক)-এর অধীনে পরিচালিত হয়৷ সিলেবাস ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার৷ সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই৷

কওমি মাদ্রাসার ছাত্রীদের চাকরির সুযোগ

হাটহাজারীর জামিয়া ইসলামিয়া ওবায়দিয়া নানুপুরি কওমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরি জানান, সরকার দাওরা হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিলেও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে সুযোগ নেই৷ কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা সাধারণত মসজিদ মাদ্রাসায় চাকরি করে৷ ইমাম হয়, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক হয়৷ এছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কিছু চাকরির সুযোগ আছে৷ তিনি বলেন, কওমি মহিলা মাদ্রাসা আছে৷ সেখান থেকে যারা পাস করেন তারা মহিলা মাদ্রাসায় চাকরি পান৷

অডিও শুনুন 02:34

কওমি মহিলা মাদ্রাসা থেকে যারা পাস করেন তারা মহিলা মাদ্রাসায় চাকরি পান: সালাহউদ্দিন নানুপুরি

কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আরবি ও উর্দু পড়ানো হয়৷ আর কোরআন, হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি দেয়া হয়৷ তবে এখন কেউ কেউ একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাও নেন৷ তারা ব্যাংকসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি পান৷ তবে তাদের সংখ্যা কম বলে জানান তিানি৷

হাটহাজারির মেখল এলাকার আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া হামিসুন্নাহ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজি বলেন, মাদ্রাসা থেকে যে নারীরা পাস করেন, তারা ইমামের চাকরি বা মসজিদে চাকরি পান না৷ কিন্তু মহিলা মাদ্রাসায় তাদের প্রচুর চাকরি আছে৷ অনেক মহিলা মাদ্রাসার প্রিন্সিপালই এখন নারী৷ তিনি দাবি করেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসা থেকে যারা পাস করেন, ইনশাল্লাহ তারা তাদের লাইনে চাকরি পান৷ কেউ বেকার নাই৷’’  মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়েজি আরো বলেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি, সমাজ বিজ্ঞান, বিজ্ঞান পড়ানো হয়৷ আর এরপর আমাদের যে বইগুলো আরবি ও উর্দুতে আছে তার মধ্যেই বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান আছে৷ কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার৷ আর শিক্ষা বোর্ড হলো বেফাক৷’’

বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘‘কওমি মাদ্রাসায় যা পড়ানো হয় সরকার সেই অনুযায়ী চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করছে৷ কওমি মাদ্রাসায় সর্বোাচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সৌদি আরবসহ কিছু মুসলিম দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ আছে৷ অনেকে সেখানে শিক্ষকতা করছেন৷’’

মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা

কওমি মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা না থাকলেও আলিয়া ধারার কোনো কোনো মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষা আছে৷ এরকম একটি মাদ্রাসা গাজীপুরের ‘শ্রীপুর বাংলাহাটি কামিল মাদ্রাসা’৷ ১৯৪৯ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ১৯৯১ সাল থেকে সহশিক্ষা শুরু হয় সেখানে৷ সেখানে দুই হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচশ’রও বেশি মেয়ে৷ মাদ্রাসাটির প্রিন্সিপাল মাওলানা সাব্বির আহমেদ মমতাজী বলেন, ‘‘ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা ভালো করছে৷ আর তারা পাস করলেই মাদ্রাসায় চাকরি তাদের কনফার্ম৷ কারণ, ৩০ ভাগ কোটা পূরণ করতে হয়৷ কিন্তু তারা সাধারণ ও সরকারি চাকরিও পাচ্ছে৷ বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে৷ সরকারি চাকরি পাচ্ছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘সবচেয়ে বড় কথা হলো, মাদ্রাসায় পড়লে মেয়েদের সহজেই বিয়ে হয়ে যায়৷ অনেকেই মাদ্রাসা পাস করা পরহেজগার পাত্রী পছন্দ করেন৷ আমার কাছে অনেকেই আসেন পাত্রীর জন্য৷’’

মাদ্রাসায় সহ-শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, শুরুতে অনেকেই মনে করেছিল কোনো সমস্যা হবে৷ তাই কমন রুমে ছাত্রীরা থাকতো, শিক্ষকদের সাথে ক্লাসে যেতো এবং তার সাথেই আবার কমন রুমে ফিরে যেতো৷ এখন তারা কমন রুমে নয়, পর্দা মেনে একই ক্লাসে থাকে৷ কোনো সমস্যা হয় না৷ তিনি বলেন, ‘‘সিলেটের একটি মাদ্রাসায় একটি ক্লাসে গিয়ে দেখি চার জন ছাত্র, ১৭ জন ছাত্রী৷ ১৭ জন ছাত্রীকে পর্দা দিয়ে আড়াল করা হয়েছে৷ আমি তখন বললাম চার জন ছাত্রকে তো পর্দার ভিতরে নেয়া সহজ৷ তাই করো৷ আসলে সমস্যা আমাদের মনে৷’’

কওমির বঞ্চনার কথা

কওমি মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা, ইরেজি পড়ানো হলেও তারা দেওবন্দের সিলেবাসই অনুসরণ করতে চান৷ তার এই শিক্ষার উচ্চ পর্যায়ে আর কিছু অন্তুর্ভুক্ত করতে চান না৷ তবে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কায়সার আহমেদ বলেন, তাদের মূল ধারার সাথে সমন্বয় করতে চাইছে সরকার৷ আলাপ-আলোচনা হচ্ছে৷ আর আলিয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার মূল ধারার সাথে সমন্বয় হয়ে গেছে৷ ফলে তারা এখন সাধারণ শিক্ষার মতোই সব সুবিধা পাচ্ছে৷

ভিডিও দেখুন 02:28

হিজড়াদের মাদ্রাসা আরও বিস্তৃত হচ্ছে

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়