মসনদে যেতে সচেষ্ট ′শাহজাদা′, শেষরক্ষা হবে কি? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 26.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

মসনদে যেতে সচেষ্ট 'শাহজাদা', শেষরক্ষা হবে কি?

ভারতের আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে এবার ভোট দিতে পারবেন প্রবাসী ভারতীয়রা, তাও আবার বিদেশে বসে৷ তাই ভোটের রাজনীতিতে নিজ দলকে আরো শক্ত করতে চারদিনের জার্মানি ও ব্রিটেন সফর শেষ করলেন রাহুল গান্ধী৷

‘শাহজাদা' জার্মানিতে আসছেন খবর পেয়েই সিদ্ধান্ত নেই ডয়চে ভেলের জন্য একটা সাক্ষাৎকার নেবো৷ রাহুলের হামবুর্গের ব্রুসিরাস সামার স্কুলে আর বার্লিনে ইন্ডিয়ান ওভারসিজ কংগ্রেসের একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়ার কথা ছিল৷ সেইমতো ওভারসিজ কংগ্রেসের মুখপাত্র হরদীপ সিং এবং রাভিনদর সিং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম৷

কথা ছিল, বার্লিনে আসার পর, অর্থাৎ ২৩ আগস্ট সকালে, ডয়চে ভেলেকে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার দেবেন রাহুল৷ ইন্টারভিউটা হবে সোনিয়া তনয় যেখানে উঠবেন, অর্থাৎ আডলন হোটেলেই৷ সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের গ্রন্থাগার ‘বুক' করা হলো৷ বই-পত্রের মাঝেই ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতির সাক্ষাৎকার নেবো আমি৷ দু'জন ক্যামেরাপারসন, হিন্দি ও উর্দু বিভাগ থেকে ওঙ্কার আর আদনান, সঙ্গে আমি - সবাই তৈরি৷ কিন্তু বিমান ছাড়ার মাত্র তিন ঘণ্টা আগে খবর পেলাম – শুধু ডয়চে ভেলে নয়, কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গেই নাকি কথা বলবেন না রাহুল৷ তাহলে?

নির্বাচিত প্রতিবেদন

রাজীবের ছেলে, ইন্দিরা গান্ধীর নাতি এত কাছ থেকে চলে যাবেন, একবার দেখবও না? তাও আবার হয় নাকি? অগত্যা ক্যামেরাপারসন, ওঙ্কার-আদনানকে ছাড়াই রওনা দিলাম রাজধানীর পথে৷

সে যাই হোক, ইন্টারভিউ পাবো না বলে মেজাজটা ভালো ছিল না৷ কিন্তু ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবরের কথা মনে পড়ে গেল, হঠাৎই...৷

সেদিন কলকাতা শহরে প্রায় রায়ট লাগে লাগে অবস্থা৷ ইন্দিরা গান্ধী নিহত – এ খবর চাউর হওয়ার পর পরই আমাদের স্কুল ছুটি হয়ে যায়৷ কোনোরকমে বাড়ি ফিরে দেখি, মা অঝোরে কাঁদছে৷ কিন্তু কেন? বাংলাদেশে আমার নানা বাড়ির লোকেরা বরাবরই কংগ্রেসকে সমর্থন করতেন আর বাবার দিকের সবাই ছিলেন বামপন্থি আদর্শে উদ্বুদ্ধ৷ তাই শ্বশুড়বাড়িতে একরকম একাই হয়ে গিয়েছিলেন মা৷ তাই বলে এত কান্না? ইন্দিরা গান্ধী তো আমাদের কেউ হন না! 

তখন বুঝিনি৷ এ ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে মায়ের প্যারালাইসিস হয়ে যায়, তারপর কয়েক বছর পর মৃত্যু৷ তাই কারণটা জিজ্ঞাসাও করা হয়নি কখনও৷ তবে এখন মনে হয় মা হয়ত কোনো এক অশনিসংকেত পেয়েছিলেন তখনই৷ ইন্দিরার পর রাজীবের মৃত্যু, কংগ্রেসের মধ্যে ভাঙন, বাবরি মসজিদকে ঘিরে উত্তেজনা, গোধরা, বিজেপির ক্ষমতায় আসা, উন্নয়ন থেকে দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের দূরে রাখা – সবটাই তো আমাদের সামনে ঘটেছে৷

অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠের তোপের মুখে এককালীন ক্ষমতাধর কংগ্রেসরা বিশেষ কিছু করতে পারেনি৷ দীর্ঘদিন যাবৎ রাহুলের সমালোচনাও তো কম ছিল না – রাজনীতিতে অপরিপক্ক, ‘পাপ্পু' কত না নাম ছিল তাঁর৷ মোদীর ‘ক্যারিসমা'-র সামনে বার বারই প্রশ্ন উঠছিল রাহুলের গ্রহণযোগ্যতাকে ঘিরে৷ তার ওপর রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সরকারের হাতে থাকে, তার বিরোধিতা করাই ছিল রাহুলদের মূল কাজ৷

সত্যিই তো, ভারতে একের পর এক নারী ধর্ষণ, ধর্মের নামে বাড়তে থাকা গণপিটুনি, প্রবল বেকারত্ব, জিএসটির ফলে ক্ষুদ্র ও মধ্যম শ্রেণির ব্যবসায়ীদের দুরবস্থা, বিমুদ্রাকরণ, দুর্নীতি – এত কিছুর পরও দেশে এখনও বিজেপির রমরমা৷ ‘শাহ' নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করতে করতে নিয়ে গেছেন সাধারণের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ আজও তাদের হাতে ভারতের প্রায় ১৯টি রাজ্য৷ তাই আগামী নির্বাচনে জিততে না পারলে সংঘ পরিবারের 'হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান'-এর স্বপ্নপূরণ হতে আর দেরি নেই৷ তাই জোটসঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস, থুড়ি ‘শাহজাদা' নিজে এসে দেশের হাল না ধরতে পারলে বিপদ আসছে বৈকি! তাঁর এই জার্মানি সফরও যে মসনদে যাওয়ার লক্ষ্যেই৷

কিন্তু শুধু বর্তমান সরকারের বিরোধীতা করলেই যে নির্বাচনে জেতা যায় না – সেটা বোধ হয় হালে বুঝতে পেরেছিলেন রাহুল৷ তাই দেশের হতাশাগ্রস্ত যুবক, কৃষক, সাধারণ মানুষকে শান্তি, অহিংসা ও ভ্রাতৃত্বের পথে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন তিনি জার্মানিতে৷ অবশ্য বার্লিনে আসার আগেই হামবুর্গের ব্রুসিরাস সামার স্কুলে দেয়া রাহুলের বক্তব্যকে কটাক্ষ করে বিজেপি৷ হবে না? রাহুল যে বলেছিলেন, বেকারত্বের কারণে অল্প বয়সি ভারতীয়রা জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস-এ যোগ দিচ্ছে৷ বলেছিলেন ভারতে নারীদের একটা বড় অংশ অরক্ষিত, এ কথাও৷

তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা যা-ই হোক না কেন, রহুলকে সরাসরি একটা প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারলাম না৷ ইন্ডিয়ান ওভারসিজ কংগ্রেসের অধিবেশনে একেবারে প্রথম সারিতে বসার সুযোগও পেয়ে গেলাম৷ এমনকি দর্শকের আসন থেকে প্রথম প্রশ্নটাও করলাম আমি৷ বললাম, ‘‘তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা, নারীর ক্ষমতায়ন, সাধারণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন, হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসন রোধ করা - জোটসঙ্গীর সাহায্য না পেলে এ সব কীভাবে করবেন আপনি? শুধু বিজেপি আর আরএসএস-এর বিরোধীতা করে তো হবে না, তাই না?''

দেবারতি গুহ

দেবারতি গুহ, ডয়চে ভেলের এশিয়া বিভাগের প্রধান

রাহুল বললেন, ‘‘কংগ্রেস শুধু মুসলমানদের নয়, হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-খ্রিষ্টান সকলের জন্য৷ আমার বিশ্বাস, ভারতের সমস্ত নাগরিকদের মধ্যে কংগ্রেসের মতাদর্শ, কংগ্রেসের বীজ লুকিয়ে আছে৷ আমাদের কাজ হবে, তাদের কাছে টেনে আনা৷''

চীনের সঙ্গে ভারতের তুলনা করে তিনি বললেন, ‘‘প্রতি ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ হাজার তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিচ্ছে চীন৷ অথচ ভারতে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪৫০ জন তরুণকে চাকরির সন্ধান দিতে সক্ষম হচ্ছে সরকার৷ তাঁরা একদিকে লম্বা লম্বা ভাষণ দিচ্ছে, অন্যদিকে তরুণ সম্প্রদায় তলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে আর আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন আমাদের চাষি ভাইয়েরা৷''

বললেন আরো কত কিছু...৷ বললেন ঘৃণা নয়, ভালোবাসার কথা, বিভেদ নয়, মৈত্রীর কথা৷ বললেন গণতান্ত্রিক এক সমাজ, সত্যিকারের গণতন্ত্রায়ন, সংগঠনকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার কথা৷ এমনকি আগামী নির্বাচনে কংগ্রেস-জোটই জিতবে – এমন স্বপ্নের কথাও দৃঢ়কণ্ঠে বললেন রাহুল৷ বললেন, ''বিজেপি একটা সংগঠনের কণ্ঠস্বর, কিন্তু কংগ্রেস গোটা দেশের কণ্ঠস্বর৷''

এ সব কথা বলে তিনি কি শেষ পর্যন্ত মসনদ পাবেন? যে সংগঠনের প্রবাসী কর্মীরা একটা সাক্ষাৎকার আয়োজন করতে পারে না, দলের সভাপতির উপস্থিতিতেও শুরু হয়ে যায় সমর্থকদের চিৎকার-মারামারি, তারা কি আরএসএস-বিজেপিকে মোকাবিলা করতে পারবে? জিততে পারবে ভোট-যুদ্ধ? জানি না, সেটা ভোটের ফলাফল আর তার সঙ্গে যুক্ত রাজনীতি বলবে৷

কিন্তু রাহুলের আকুতি, তাঁর কণ্ঠস্বর, সংবাদমাধ্যমগুলির সাহায্য ছাড়া হিন্দুত্বের দৌরাত্ম্যে বধির হয়ে থাকা ভারতের আপামর জনসাধারণ শুনতে পারবে তো?

লেখাটি সম্পর্কে আপনাদের মতামত জানতে চাই আমরা৷ তাই লিখুন নীচের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন