ভারতের ইচ্ছায় পেঁয়াজ, বাংলাদেশের ইচ্ছায় হিন্দি ছবি? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 03.01.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

ভারতের ইচ্ছায় পেঁয়াজ, বাংলাদেশের ইচ্ছায় হিন্দি ছবি?

ভারত চেয়েছে, তাই বাংলাদেশের মানুষ আবার ‘সুলভে’ পেঁয়াজ পাবে, আবার কেউ কেউ বেশি করে পেঁয়াজ খাবেন৷ শুধু ভারতীয় পেঁয়াজ খাবেন না, বাংলাদেশ চায় বলে অনেকে দেশের সিনেমা বাদ দিয়ে হয়ত হিন্দি সিনেমাও দেখবেন৷ 

হ্যাঁ, দুটোই সাম্প্রতিক খবর৷ একটা হয়ে গেছে, অন্যটা সম্ভবত হতে চলেছে৷

অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে গত ১৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত৷ এ কাজ ভারত আগেও করেছে৷ এবং আগে যা হয়েছে এবারও ঠিক তা-ই হয়েছে৷ বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে হু হু করে৷ প্রতিদিন হতাশার , ক্ষোভের শিরোনামে নানা ধরনের খবর প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম৷ সভায়, সিম্পোজিয়ামে শোনা গেছে পেঁয়াজের চেয়েও বেশি ঝাঁঝালো কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেঁয়াজ তখন মশকরার বিষয়৷ ভারতের ‘দিলে পাবি, পেলে খাবি' নীতির নিন্দা, কিংবা দেশকে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেখার বাসনা জানানোর চেয়ে পেঁয়াজকে বউয়ের গলায় হিরার মালার বিকল্প দেখিয়ে বিস্তর ভিউ, লাইক কামানোর চেষ্টাই ছিল বেশি৷

কিন্তু ক'দিন বাদে সবাই চুপ৷

ইস্যু আসে, ইস্যু যায়, পেঁয়াজে কে বেশিদিন মাথা ঘামায়!

তবে বাংলাদেশের মানুষ মাথা না ঘামালেও পেঁয়াজের বিষয়ে ভারত ঠিকই আবার মাথা খাটিয়েছে৷ ফলে শনিবার থেকে হিলি সীমান্ত দিয়ে আবার আসতে শুরু করেছে পেঁয়াজ৷

এভাবে কতদিন আসবে? অতি সহজ উত্তর- ভারত যতদিন চাইবে ঠিক ততদিন৷

এদিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ চায় বলে কয়েকদিন আগেও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে খাইরুল নামের এক গরু ব্যবসায়ী গুলি খেয়ে মারা গেলেন৷ কোনো মহল থেকেই এর খুব কড়া প্রতিবাদ দেখা যায়নি৷ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকার বা আওয়ামী লীগের দু-একজন দু-একটা গতানুগতিক কথা বলেছেন৷ বিরোধীদলগুলোর দু-একটির হাতে গোনা কয়েকজনও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ মৌখিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন৷

ফেসবুকেও দেখা গেছে প্রতিক্রিয়ার ছিঁটেফোঁটা৷

তবে কারো আলোচনা, প্রতিক্রিয়া বা স্ট্যাটাসে খাইরুলের জীবন পেঁয়াজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে কিনা তা বাক্যের ব্যাপ্তি না মেপে বলা যাবে না৷

আজ বালিশ, কাল ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, পরশু পদ্মা সেতুর গর্ব বা ভাষ্কর্যে ধর্ম-ভাবনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক- তাজা ইস্যুর কি শেষ আছে! তার ওপর বলতে গেলে পুরো ২০২০ ছিল করোনার দখলে৷ সারা বিশ্বে কত মানুষের প্রাণই তো গেছে৷ সেখানে সীমান্তের গরিব ঘরের দু-একজনের আলোচনায় বা স্মৃতিতে বেশিক্ষণ না থাকাটা তো অনিবার্য নিয়তি!

 

‘বাংলাদেশ’ চায় বিদেশি ছবি

আরেকটা খবরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের বেশির ভাগ মানুষের জন্য বড় বিপদের ইঙ্গিত দেখছি৷ গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার ধারা ঠেকাতে বিদেশি ছবি আমদানির বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিবেশক প্রদর্শক এবং পরিচালক সমিতি৷ এর পাশাপাশি যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণের নীতিমালা সহজ করার দাবিও সরকারের কাছে জানিয়েছেন তিন সংগঠনের নেতারা৷

যারা চলচ্চিত্রে টাকা লগ্নি করেন, যারা নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র এবং যারা সেগুলো প্রেক্ষাগৃহে চালান, তারা সবাই মিলে বলছেন, ‘‘আমরা এখন থেকে হিন্দি ছবি, ইংরেজি ছবি, মোট কথা বিদেশি ছবিও আমদানি করে সারা দেশে দেখাতে চাই৷''

দিন কেমন বদলে গেল! এক সময় না হিন্দির কথা শুনলেই আগ্রাসনের হাত থেকে ভাষা, সংস্কৃতিকে রক্ষার দাবিতে সংস্কৃতি-সংশ্লিষ্টরা সোচ্চার হতেন? এখন সবাই নীরব কেন? চলচ্চিত্রে মহাসংকটকাল চলছে বলে? মহাসংকটে তো সরকার সবাইকে নিয়ে কোমর বেঁধে চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে নামবে৷ কই, সেরকম কোনো আভাস ইথারে নেই তো!

 

কার লোভে, কার লাভে?

ঢাকাই চলচ্চিত্রে সংকট অনেক দিন ধরে৷ তবে নিরসনের চেষ্টা জোরালোভাবে কখনোই হয়নি৷ হলে তো দেশ ডিজিটাল হওয়ার পাশাপাশি খুব ধীরে হলেও দেশের সিনেমা হলগুলো মোটামুটি আধুনিক হতো৷ সিনেপ্লেক্স, মাল্টিপ্লেক্স হতো শহরে শহরে৷

বাংলাদেশ ডিজিটাল হতে শুরু করার আগেই অবশ্য ‘অশ্লীলতার যুগ’ এসেছিল চলচ্চিত্রে৷ মধ্যবিত্ত বাঙালি সেই যে মুখ ফেরালো আর হলমুখো হয়নি৷

এ সময়ে দর্শককে হলে টেনে নেয়ার মতো বিশেষ কিছু ঘটেওনি৷ ভালো ছবির সংখ্যা কমেছে, হলের পরিবেশ দিন দিন খারাপ হয়েছে, এর ওপর জঙ্গিদের বোমা হামলাও হয়েছে সিনেমা হলে৷ এত কিছুর পর মানুষ কষ্ট করে হলে আসবে কেন দেশের সিনেমা দেখতে ?

খুব স্মরণীয় খুব ভালো ছবিও দু-চারটাই হয়েছে গত এক দশকে৷ অথচ লম্বা একটা সময় হলে দেদার চলেছে হিন্দি, পাঞ্জাবী, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, ফ্রেঞ্চ, এমনকি হলিউডের ছবিরও বাংলা সংস্করণ৷ বিশ্বের আর কোথাও এমন হয়েছে কিনা সন্দেহ৷

জাজ মাল্টিমিডিয়া নামের এক প্রোডাকশন হাউজ দেশের অধিকাংশ সিনেমা হলে প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও সার্ভার বসিয়ে দিয়েছিল নিজেদের খরচে৷ বিনিময়ে হল মালিকদের বলেছিল টিকিটপ্রতি তিন টাকা করে দিতে৷ কেউ দেখলেন ঝকঝকে প্রিন্ট৷ তারা খুব খুশি৷ আবার হল মালিকরা দেখলেন নগদ টাকা না দেয়া সত্ত্বেও প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম এসে গেছে৷ ফলে তারাও খুশি৷ কিন্তু হলে চলছিল মূলত হিন্দি, পাঞ্জাবী, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, ফ্রেঞ্চ এবং হলিউডের ছবির বাংলায় গোঁজামিল৷ এতে যে চলচ্চিত্রের সর্বনাশ হচ্ছে সেকথা জোরেশোরেই উঠেছে তখন৷ কিন্তু তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে চলচ্চিত্রের সার্বিক স্বার্থ সংরক্ষণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি৷ ফলে সিনেমা হলগুলোর দীর্ঘস্থায়ীত্ব এবং চলচ্চিত্রের অধিকাংশ পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলীর অস্তিত্বের বিষয়টি পেয়েছে যৎসামান্য গুরুত্ব৷ জাজ মাল্টিমিডিয়ার বিরুদ্ধে যৌথ প্রযোজনার ছবির নামে ঢাকাই ছবির ক্ষতি করার অভিযোগও উঠেছে৷ তখন তারও কোনো প্রতিকার হয়নি৷

২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ ও তার ভাই, ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ কাদেরের বিরুদ্ধে ৯১৯ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে মামলা করে দুদক৷

বলে রাখা ভালো, জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম লাগিয়ে, হিন্দি, পাঞ্জাবী, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, ফ্রেঞ্চ ইত্যাদি ভাষার ছবি বাংলায় বানিয়েও খুব যুক্তিসঙ্গত কারণেই হল বন্ধ হওয়া রুখতে পারেনি৷

নব্বইয়ের দশকেও সারা দেশে যেখানে দেড় হাজারের মতো সিনেমা হল ছিল, এ বছর তা হয়তো ৫০-এ এসে ঠেকেছে৷ সংখ্যাটা ঠিক কত তা বলা মুশকিল, কারণ, সে হিসেব কেউ রাখে না৷ সংবাদ মাধ্যমের দেয়া তথ্যের ওপরও ভরসা রাখার জো নেই৷ ২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে সারা দেশে হল সংখ্যা ৭০,ঠিক পরের দিনই সময় নিউজের প্রতিবেদন বলছে ৬০৷ ভরসা রাখবেন কীভাবে?

Ashish Chakraborty

আশীষ চক্রবর্ত্তী, ডয়চে ভেলে

তা সংখ্যাটা ৭০, ৬০ বা ৫০ যা-ই হোক না কেন এখন সেগুলোকেও টিকিয়ে রাখতে নাকি বিদেশি ছবি আমদানিতে রাজি হয়ে বসে আছে চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক, প্রদর্শক এবং পরিচালক সমিতি৷ পাশাপাশি তারা বলছেন, বিদেশি ছবি আমদানি করা হলেও দেশের নির্মাতা এবং দেশের ছবিকেই প্রাধান্য দেয়া হবে৷ তিনটি সংগঠনের নেতারা বলছেন, একে তো দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব কমে গেছে, তার ওপর করোনা আসায়  কেউ আর চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নির ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না৷ মূলত এই দুটো কারণেই নাকি বিদেশি ছবিকে ‘স্বাগতম' বলতে চান তারা৷

কিন্তু হিন্দি এবং অন্যান্য ভাষার বিদেশি ছবি এলে টিকে থাকা গোটা পঞ্চাশেক হলের মালিক কর্মাচারী মিলিয়ে দুশ'- তিনশ' মানুষের হয়ত একটা গতি হবে, কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কী হবে সেটা কি তারা ভেবে দেখেছেন?

 

পেঁয়াজ আসবে, হল বাঁচবে আর শিল্পীরা মরবেন?

সরকার বিদেশি ছবি আমদানির অনুমতি দিলে হিন্দি ছবিই যে অধিকাংশ হলে চলবে তাতে সন্দেহের সুযোগ কম৷ আর মোটামুটি বাজেটের হিন্দি ছবির পাশে অতি নগন্য বাজেটের ঢাকাই বাংলা ছবি কি আদৌ দাঁড়াতে পারবে? দর্শক দেখবে সেসব ছবি? না দেখলে কত শত শিল্পী-কলাকুশলী পথে বসবেন বিদেশি ছবি আমদানি শুরুর আগে সেটাও ভেবে দেখা দরকার৷

নইলে কারো গুলি না খেয়েও হয়ত অনেক মানুষ মারা যাবেন৷

 

‘সব জিনিসের মূল্য আছে মানুষের দাম নাই’

৪৮ বছর আগে ‘মানুষের মন’ ছবিতে নায়করাজ রাজ্জাক ফেরিওয়ালা হয়ে গানে গানে যা বলেছিলেন বাংলাদেশে তা এখনো খুব প্রাসঙ্গিক ৷ মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর গাওয়া ‘এই শহরে আমি যে এক নতুন ফেরিওয়ালা' গানটির গীতিকার গাজী মাযহারুল আনোয়ার৷ বিবিসি বাংলার তালিকা অনুযায়ী সর্বকালের সেরা কুড়িটি বাংলা গানের তিনটির রচয়িতা ওই গানের সঞ্চারিতে লিখেছিলেন,

‘‘চার চাকাতে ভাগ্য বেঁধে বুঝে নিলাম ভাই

সব জিনিসের মূল্য আছে মানুষের দাম নাই৷’’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীদের জীবনের দাম কি আছে কারো কাছে? বিদেশি ছবি আমদানি শুরুর আগে দেশের চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে কী কী করা হয় তা দেখলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে৷

গত নভেম্বরের ছবিঘর দেখুন...

নির্বাচিত প্রতিবেদন