বাংলাদেশে অন্তত ৩১১ উগ্রপন্থি পলাতক: পুলিশ
১ জুলাই ২০২৬
নজরুল ইসলামের করা প্রতিবেদনে বলা হয়, পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা এসব ব্যক্তি উগ্রবাদী তৎপরতাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলার আসামি৷ এর বাইরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন গাজীপুরের কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান উগ্রবাদী তৎপরতাসংশ্লিষ্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ৯ জন কারাবন্দি৷ পলাতক এসব উগ্রপন্থির অবস্থান ও তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্বেগের কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে৷
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) গত এপ্রিল পর্যন্ত হালনাগাদ করা তথ্য থেকে পলাতক উগ্রপন্থিদের তথ্য পাওয়া যায়৷ পলাতকদের মধ্যে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি-বি)-র ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, ‘আল্লাহর দল'-এর ৯ জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১ জন এবং ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা'র ১ জন রয়েছেন৷ এর বাইরে নিষিদ্ধ আরেক সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের ৫৯ জন বিভিন্ন মামলায় পলাতক রয়েছেন বলে এটিইউর তথ্যে এসেছে৷
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, জেল পলাতক, জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে থাকা এবং মামলার আসামি হিসেবে পলাতক দুর্ধর্ষ উগ্রপন্থিরা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি৷ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অধিকাংশ আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি৷ এই বাস্তবতায় পলাতক উগ্রপন্থিদের ওপর নজরদারি জরুরি৷ সুযোগ পেলে তারা সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন৷
পলাতক উগ্রপন্থিদের দিক থেকে কোনো হুমকি রয়েছে কি না— জানতে চাইলে গত ৪ এপ্রিল এটিইউর প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম কোনো মন্তব্য করেননি৷ তবে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই৷ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ উগ্রবাদ পছন্দ করেন না৷''
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় কাশিমপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে হামলার ঘটনা ঘটে৷ ওই দিন দুর্বৃত্তরা কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে তৃতীয় তলার গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়৷ এ সময় উগ্রবাদী তৎপরতাসংশ্লিষ্ট মামলায় কারাবন্দি ৯ জনসহ মোট ২০২ বন্দি পালিয়ে যান৷
এটিইউ সূত্র জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা দেশে বিভিন্ন মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর ২ হাজার ১৪৩ সদস্য গ্রেপ্তার হন৷ ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছরে কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন ১ হাজার ৬১১ জন৷ তাদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন ৩৮০ জন৷ এখন কারাগারে আছেন ১৬২ জন৷
লিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট এটিইউর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেশের ১৬ কারাগারে উগ্রপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের ৫৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, ৪৬ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং ২৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামি আছেন৷ এ ছাড়া কারাবন্দি আরো ৩২ জনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর বিচার চলছে৷
পুলিশ সূত্রকে উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন আলোচিত উগ্রপন্থি নেতাও রয়েছেন৷ গত বছরের ২০ অক্টোবর জামিনে মুক্ত হন জসীম উদ্দিন রাহমানী৷ আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তার নামে আরো দুটি মামলা বিচারাধীন৷ এর একটি চলছে ঢাকার সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে, অন্যটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে৷ মামলায় পুলিশ তাকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছে৷ মুক্তি পাওয়ার পর বিভিন্ন বক্তৃতায় দাবি করেছেন, তিনি এই সংগঠনের নেতা নন৷
নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান গত ২১ মার্চ কাশিমপুর-২ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন৷ এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি মহিলা মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় পুলিশ যাকে মূল ব্যক্তি মনে করছে, সেই শেখ আল আমিন ও তার কয়েক সহযোগী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে বের হন৷ কেরানীগঞ্জের ঘটনার পর তাঁরা আবার গ্রেপ্তার হয়েছেন৷
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পলাতক ও জামিনে মুক্ত উগ্রপন্থিদের ওপর নজরদারি শিথিল করার সুযোগ নেই৷ বিশেষ করে কারাগার থেকে পালানো, জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়া এবং মামলার আসামি হয়ে পলাতক থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা ঘিরে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল৷ সেই সময় ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক ও বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা ঘটে৷ ২০১৬ সালে রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়৷ এর আগে ২০০৫ সালে ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা ফাটায় জেএমবি৷
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পলাতক ও জামিনে মুক্ত উগ্রপন্থিদের ওপর নজরদারি শিথিল করার সুযোগ নেই৷ বিশেষ করে কারাগার থেকে পালানো, জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়া এবং মামলার আসামি হয়ে পলাতক থাকা ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ৷
এসিবি/ জেডএইচ (প্রথম আলো)