‘প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ, ঘুরে বেড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়’ | বিশ্ব | DW | 04.12.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ, ঘুরে বেড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়’

ঘাস চাষ বা খিচুড়ি রান্না শিখতে প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়া নিয়ে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে৷ কর্মকর্তাদের এই প্রশিক্ষণ আসলে কতটা কাজে লাগছে?

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, প্রশিক্ষণের অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা আছে৷ কিন্তু এর নামে বিদেশ ভ্রমণ, ঘুরে বেড়ানো, উর্ধ্বতনদের খুশি করা গ্রহণযোগ্য নয়৷ এখন তো বিদেশে না গিয়েও অনলাইনে বা ইউটিউব দেখেও প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়৷

ডয়চে ভেলে : প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি কর্মকর্তারা যে বিদেশ সফর করেন সেটা আসলে দেশের জন্য কতটা কাজে লাগে?

ড. বদিউল আলম মজুমদার : কাজে লাগাতে চাইলেই কাজে লাগবে৷ এটা আসলে কাজে লাগাতে চাই কি-না, নাকি একটা পেইড হলিডে হচ্ছে সেটাই হচ্ছে বড় প্রশ্ন৷ অনেক ক্ষেত্রেই এটা পেইড হলিডে হয়ে গেছে৷ কেনাকাটার জন্য, আত্মীয় স্বজনকে দেখার জন্য, রিলাক্স করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে৷ সরকার যদি চায় তাহলেই পরিবর্তন হবে৷ না হলে হবে না৷ সরকার পরিবর্তন চাইতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে৷ স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকতে হবে৷ এর মাধ্যমে কি অর্জিত হবে? এগুলো নির্ধারণ করা দরকার৷

অডিও শুনুন 11:36

‘অনেক ট্রেনিং উপাদান ইউটিউবে পাওয়া যায়’

সর্বশেষ যে প্রশিক্ষণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, একটি প্রকল্পে ঘাস চাষ দেখতে ৩২ জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে৷ এটা কতটা প্রয়োজনীয়?

এখন তাদের নিশ্চয় যুক্তি আছে৷ এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি দেওয়া যায়৷ হ্যাঁ, শিক্ষার যেমন কোন বিকল্প নেই, প্রশিক্ষণেরও কোনো বিকল্প নেই৷ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়ে এবং তারা বড় অবদান রাখার সুযোগ পায়৷ আইসিটি টেকনোলজির সুবাদে এখন অনেক প্রশিক্ষণ কিন্তু অনলাইনে করা যায়৷ অতিমারির সময়ে আমরা যেটাতে অভ্যস্ত হয়েছি৷ এছাড়া অনেক ট্রেনিং উপাদান ইউটিউবে পাওয়া যায়৷ আবার আমরা প্রশিক্ষককে নিয়ে আসতে পারি৷ না হলে অর্থ দিয়ে হলেও আমরা প্রশিক্ষককে রাজি করাতে পারি, অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য৷ শুধু বিদেশী প্রশিক্ষণ নয়, অনেক অনাচার হয় দেশীয় প্রশিক্ষণেও। অনেক প্রকল্পে প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট থাকে৷ এখানেও দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা এর নামে তাদের উর্ধ্বতনদের একটা খাম দেওয়ার ব্যবস্থা করেন৷ তাদের যোগ্যতা বা দক্ষতা থাকুক আর না থাকুক তারা এসে একটা বক্তৃতা দেবে এরপর একটা খাম ধরিয়ে দেওয়া হবে৷ এটা হয়ত বড় অংকের কোন টাকা না৷ আবার নির্বচন কমিশনে আমরা দেখেছি, ট্রেনিং না দিয়েও ভাতা তুলে নিয়েছেন৷ তারা সাংবিধানিক পদে নিয়োজিত৷ সরকারি বেতন ভাতা তারা পান৷ এই ভাতা নিয়ে তারা নিজেদের পকেট ভারি করেছেন৷ কারো বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না৷ শুধু বিদেশি নয়, দেশি প্রশিক্ষণের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে৷

বলা হচ্ছে, সরকারি কর্মকর্তাদের অধিকাংশ প্রশিক্ষণই কাজে আসছে না৷ যে বিষয়ে তিনি বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই তাকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হচ্ছে৷

তা তো নিঃসন্দেহে কোন কাজে আসছে না৷ এজন্যই তো বলছি, সরকার চাইলে পরিবর্তন হবে, তা না হলে হবে না৷ শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়, এই প্রবণতা আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই আছে৷ সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দু'টো প্রকল্প ছিল৷ একটা ইউএনডিপির, আরেকটা ইউএসএআইডির৷ আমি যেটা শুনেছি, এই প্রকল্পে দাবি ছিল বিদেশ সফরের৷ ফলে তারা এতটাই অতিষ্ঠ হয়েছে যে, দু'টো প্রকল্পই তারা বন্ধ করে দিয়ে দিয়েছে৷

অভিযোগ আছে, যাদের দরকার তাদের প্রশিক্ষণে না পাঠিয়ে কর্মকর্তারা নিজেরাই চলে যাচ্ছেন।তাদের কাজের সঙ্গে এই প্রশিক্ষণের কোন মিলই নেই।

অনেক প্রকল্পেই প্রশিক্ষণের বাজেট থাকে৷ আরেকটা অপ্রয়োজনীয় বিষয় গাড়ি বিলাস৷ এখানেও অনেক অর্থকড়ির অপচয় হয়৷ প্রকল্পটি যারা প্রণয়ন করেন তারা জানেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা না হলে এটা হবে না৷ অনেক সময়ই মন্ত্রী বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, অথচ তাদের হয়ত কোন সম্পৃক্ততাই নেই৷ কারণ তাদের যুক্ত না করলে এই প্রকল্প পাশ হবে না এবং তারা নিজেরাও বিদেশে যেতে পারবেন না৷ এটা আসলে একটা চক্র হয়ে গেছে৷ এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার৷

এর আগেও আমরা দেখেছি, খিচুড়ি রান্না, পুকুর কাটা, খাল খনন, মৎস্য চাষ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কাজু বাদাম চাষ এবং বিশেষ উঁচু ভবন দেখতে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে? এই প্রশিক্ষণগুলো কতটুকু প্রয়োজনীয়, কতটুকু অপ্রয়োজনীয়?

কিছু কিছু প্রশিক্ষণ আমাদের প্রয়োজনীয় নিঃসন্দেহে৷ আমি যতটুকু শুনেছি, তারা বলেছে, খিচুড়ি রান্না নয়, ব্যবস্থা৷ ব্যবস্থাপনা শিখতে হলে আমরা একজনকে এনে শিখি৷ না হলে অনলাইনে প্রশিক্ষণের আয়োজন করেও শিখতে পারি৷ আমি যতদুর জানি অনেক প্রতিষ্ঠানে মিড ডে মিল বিতরণ করা হয়৷ সেখান থেকেও আমরা শিখতে পারি৷ কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষতা আমাদের অর্জন করতে প্রশিক্ষন নিতে হবে৷ কিন্তু যেভাবে চলছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়৷

অনেক সময় এমনও বলা হয়, সাংবাদিকেরা ইচ্ছে করে খবরের কাটতি বাড়াতে আকর্ষণীয় হেডলাইন করছেন? ঘটনাগুলো আসলে মিডিয়ায় যেভাবে আসছে বিষয়টি তেমন নয়?

হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো অতিরঞ্জন আছে৷ কিছু ক্ষেত্রে তো অসততাও আছে৷ আমি আমার এক বন্ধুকে জানি৷ তিনি তিতাস গ্যাসের জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন৷ তার মতো দ্বিতীয় সৎ ব্যক্তি আমি দেখিনি৷ আমি নিশ্চিত বলতে পারি৷ কিন্তু তার বিরুদ্ধে যত দুর্নীতির রিপোর্ট বেড়িয়েছে তার সবগুলো মিথ্যা ছিল৷ এগুলো করেছে স্বার্থান্বেষীরা৷ নিজেদের আড়াল করার জন্য তারা উনার উপর দায় চাপিয়েছে৷ এমন হয়, এটা আমরা অস্বীকার করতে পারবো না৷ কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বলতে হবে যে, সাংবাদিকেরাই সমাজের আয়না। এর মাধ্যমেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পথ উন্মুক্ত হয়৷ তাই আমাদের গণমাধ্যমকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে৷ এই অজুহাতে সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা কোনভাবেই যৌক্তিক হবে না৷ সংবাদপত্রকে আমরা আরো আগ্রাসী ভূমিকায়, বড় ভূমিকায় দেখতে চাই৷

এসব খবরের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নীতি আদর্শ কী প্রতিফলিত হচ্ছে?

আমাদের গণমাধ্যম তো এক সময় স্বাধীন ছিল৷ আমার ধারণা ছিল, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না৷ কিন্তু দূর্ভাগ্য আমাদের গণমাধ্যম বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে৷ তবে সব ক্ষেত্রে নয়৷ আমি আশা করব, গণমাধ্যম তাদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তারা স্বাধীনচেতা হবে এবং তারা বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশ করবে ও সাহসী ভূমিকা পালন করবে৷

সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি নীতিমালা নিশ্চয় আছে? সেটা কী অনুসরণ করা হয়?

অনেক ক্ষেত্রেই নীতিমালা অনুসরণ করা হয় আমি নিশ্চিত৷ কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত আছে৷ এই নীতিমালাতেই পরিবর্তন আনতে হবে৷ যদি মাছ চাষের প্রশিক্ষণ নিতে হয় তাহলে যারা মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে৷ কিছু প্রশিক্ষণ নিতে হয় হাতে কলমে মাঠে গিয়ে৷ তারা মাঠ থেকে শিখবে৷ কিন্তু যেভাবে চলছে, এভাবে গ্রহণযোগ্য নয়৷ আমি কুমিল্লার একজন জজকে জানি, তিনি এখানে এসে বিচারকদের প্রশিক্ষণ দেন৷ আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন৷ এমন আয়োজন তো করা যেতেই পারে৷ এর প্রয়োজনীয়তাও আছে৷ কিন্তু প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ, ঘুরে বেড়ানো এগুলো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়৷

সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য কী ধরনের নীতিমালা প্রয়োজন?

নীতিমালাটা আসলে এমন হওয়া উচিত, যে প্রশিক্ষণটা নেবে তার যেন কাজে লাগে৷ প্রশিক্ষণের ব্যাপারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে৷ কেউ প্রশিক্ষণ নিয়েই অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যাবে, সেটার পরিবর্তে একবার সরকার করেছিল, কতগুলো রিলেটেড মন্ত্রণালয়ে মধ্যে বদলি হতে পারে৷ মন্ত্রী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা এপিএসদের রাখতে হবে না হলে প্রকল্প পাশ হবে না, এই প্রবণতা বন্ধ করতে হবে৷ আমাদের অর্থের সাশ্রয় করতে হবে৷ আমাদের অঢেল অর্থ নেই৷ এই অর্থগুলো সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন