তালেবানের প্রভাব কি এবার কাশ্মীরে? | বিশ্ব | DW | 01.09.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

তালেবানের প্রভাব কি এবার কাশ্মীরে?

আফগানিস্তান তালেবানের দখলে। এর প্রভাব কাশ্মীর সমস্যায় পড়বে বলে মনে করছেন একাধিক ভারতীয় বিশেষজ্ঞ।

সম্প্রতি কাশ্মীরে একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন হয়। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনা বাহিনীর লেফটন্যান্ট জেনারেল ডি পি পাণ্ডে। ১৫ কর্প বা কাশ্মীরের বিশেষ বাহিনী চিনার কর্পের কম্যান্ডিং অফিসার তিনি। স্টেডিয়ামে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পাণ্ডে বলেছেন, আফগানিস্তান তালেবানের হাতে চলে যাওয়ার ফলে কাশ্মীরে তার প্রভাব পড়বে না। কাশ্মীরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে সেনা।

এ বিষয়ে আরো বেশ কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল লেফটন্যান্ট জেনারেলকে। কিন্তু একই কথা বার বার বলেছেন। একইসঙ্গে কাশ্মীরের যুবসমাজকে তিনি বলেছেন,দিকভ্রষ্ট না হয়ে খেলায় আরো বেশি মনোযোগ দিতে। তিনি নিশ্চিত, কাশ্মীরের যুবকরা ভারতকে আরো অনেক সোনা এনে দেবে। প্রশ্ন উঠছে, কাশ্মীরের নিরাপত্তা যদি অটুট থাকে, তাহলে 'দিকভ্রষ্ট' শব্দটি ব্যবহার করলেন কেন সেনার উচ্চপদস্থ অফিসার?

বাস্তব পরিস্থিতি

সেনা অফিসার যা-ই বলুন, সেনা সূত্রই বলছে, গত কয়েকমাসে কাশ্মীরে উত্তেজনা অনেক বেড়েছে। ভারতীয় সেনা বাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ করা যাবে না এই শর্তে ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন, ''অন্তত ছয়টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কাশ্মীরে প্রবেশ করেছে। তারা ক্রমাগত নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।'' ৫০ থেকে ৬০ জন 'সন্ত্রাসী' নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। সেনাকে বিভিন্ন এলাকায় ব্যস্ত রাখছে তারা। কেন ব্যস্ত রাখছে? ই ব্যক্তির মতে, এই সুযোগে সীমান্তে একাধিক লঞ্চপ্যাডে পুনরায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলি নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। গত কয়েকবছরে ওইরকম একাধিক লঞ্চপ্যাড ধ্বংস করেছিল ভারতীয় সেনা।

আরো দুইটি বিষয় নিয়ে সংশয়ে আছে সেনা। গত কয়েকমাসে ৫০ থেকে ৬০ জন কাশ্মীরী যুবক বেপাত্তা হয়েছে। তাদের পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছে বলে বাড়ি ছেড়েছে ওই যুবকরা। কিন্তু কোনো যোগাযোগের ঠিকানা দিয়ে যায়নি। গত কয়েকবছরে ঘরছাড়ার সংখ্যা কাশ্মীরে অনেকটাই কমেছিল. এবছর ফের তা বাড়ছে। এছাড়া পাকিস্তানের কাশ্মীরে সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তালেবানের সঙ্গে কাজ করে আসা যোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, এমন ছবি আছে। ভারতীয় কাশ্মীরেও তা নিয়ে যথেষ্ট আলোড়ন হয়েছে বলে সেনার কাছে খবর আছে। ভারতীয় কাশ্মীরেও তালেবানের আফগান দখল নিয়ে উৎসব হয়েছে।

অতীত স্মৃতি

ডয়চে ভেলের সাংবাদিক এবং কাশ্মীর বিশেষজ্ঞ সালাউদ্দিন জেনের বক্তব্য, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান যখন আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ছিল, তখন বহু তালেবান যোদ্ধাকে কাশ্মীরে এসে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলিতে প্রশিক্ষণ দিতে দেখা গেছে। তালেবান যোদ্ধারা কাশ্মীরের সীমান্ত অঞ্চলে মিছিল করেছে, এমন ঘটনাও ঘটেছে। সালাউদ্দিনের স্পষ্ট বক্তব্য, ''দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানে ব্যস্ত ছিল। কাশ্মীরে তারা বড় একটা আসেনি। আফগানিস্তান তাদের হাতে চলে আসায় এবার ওই যোদ্ধাদের একটি অংশ কাশ্মীরে আসতে পারে। এর আগেও তাই হয়েছিল।'' সালাউদ্দিনের বক্তব্য, আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে বহু কাশ্মীরী যোদ্ধা ছিল। এবার তারা ফিরে আসছে। তারাই সীমান্ত অঞ্চলে বহু জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিচ্ছে। কাশ্মীরী যুবকরাও নতুন করে সেই সব জায়গায় যোগ দিচ্ছে। সেনা অফিসারকে তাই বলতে হয়, যুবকরা যেন খেলাধুলোয় মন দেয়।

কূটনৈতিক ব্যাখ্যা

ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এক অফিসার ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন, তালেবান আফগানিস্তান দখল করায় ভারত অত্যন্ত চিন্তিত। যে কারণে, তালেবানের সঙ্গে একাধারে সরাসরি এবং ব্যাক-চ্যানেলে আলোচনা জারি রেখেছে ভারত। এ কথা প্রায় সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তানের আইএসআই তালেবানকে মদত দিয়েছে। পাকিস্তানের পশ্চিমপ্রান্তে আফগান বাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানের যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং সীমান্ত সংঘাত, তালেবানের আমলে তা কমবে বলে মনে করছে ভারত। ফলে পাক ফৌজ কাশ্মীর সীমান্তে অশান্তি আরো বাড়াতে পারে বলে মনে করছে ভারত। একইসঙ্গে তালেবান যোদ্ধারা কাশ্মীরে ঢুকবে বলেও তারা মনে করছে। ইতিমধ্যেই পাক-কাশ্মীরে তাদের ঢোকার ছবি ভাইরাল হয়েছে। আফগানিস্তানের জমিতে ভারত-বিরোধী গোষ্ঠীগুলিকে আশ্রয় দেওয়া হতে পারে বলেও ভারতের আশঙ্কা। ভারতীয় সেনা বাহিনীর সাবেক লেফটন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্য ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ''দোহার সাম্প্রতিক বৈঠকে তালেবানের কাছে একাধিক আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ভারত। তার মধ্যে অন্যতম আফগানিস্তানের জমিতে সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া।'' এখন দেখার তালেবান বিষয়টিকে কীভাবে দেখে। ভারত যে কাশ্মীর নিয়ে চিন্তিত তা স্পষ্ট বলেই মনে করেন উৎপল।

অস্ত্র এবং অর্থ

ভারতীয় প্রশাসনের তরফে আফগান সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অমিতাভ রায় ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন, কূটনৈতিক বাস্তবতা ছাড়া আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিকে নজর দেওয়া দরকার। তার কথায়, ''গত দুই দশকে সোয়া দুই লক্ষ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর অধিকাংশই অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জামের পিছনে। আফগান সেনার হাতেও বিপুল পরিমণ সমরাস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই সমস্ত অস্ত্র এখন আফগানিস্তানে পড়ে আছে।'' শুধু তাই নয়, অ্যামেরিকা সহ ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে চলে আসার পরে তাদের বেসগুলিতে বিপুল অস্ত্র এবং সামরিক জিনিসপত্র পড়ে আছে। এই সবই এখন তালেবানের হাতে। দেশের ভিতরে দুইএকটি জায়গায় তালেবানকে এখনো যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে। কিন্তু তার জন্য ওই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। তালেবান ওই অস্ত্র নিয়ে দুইটি কাজ করতে পারে। এক, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে তা তুলে দিতে পারে। এবং দুই ওই অস্ত্র বিক্রি করে অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে। বিক্রি করলেও তা বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকেই করা হবে। এ ছাড়াও ওই অস্ত্র তারা নিজেদের কাজে লাগাবে বলেও অমিতাভ মনে করেন। এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে সহিংসতার আশঙ্কা অনেকটাই বৃদ্ধি পেল বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, তালেবান যোদ্ধাদের একটা অংশ কাশ্মীরের দিকে আসবে। ফলে কাশ্মীরে নতুন করে উত্তেজনা বাড়বে বলেই আসঙ্কা করা হচ্ছে। বস্তুত, গত একমাসে তার খানিকটা আভাসও পাওয়া গেছে।