কতটা বুদ্ধি থাকলে বুদ্ধিজীবী হয়? | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 09.07.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

কতটা বুদ্ধি থাকলে বুদ্ধিজীবী হয়?

বুদ্ধিহীন মানুষ যেমন দেখিনি৷ বুদ্ধিমান মানুষও তেমন দেখিনি বিশেষ৷ বুদ্ধি বিক্রির ফিকির দেখেছি অনেকটাই৷

কলকাতা বইমেলা ২০২০

কলকাতা বইমেলা ২০২০

পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের তৎকালীন প্রধান সম্পাদক দপ্তরে নিজের ঘরে ডাকলেন৷ দৃশ্যত ক্ষুব্ধ৷ ঘরে ঢুকতেই কার্যত ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াতে হলো৷ একটি কপিতে সাংবাদিক পশ্চিমবঙ্গের এক প্রথম সারির লেখকের উদ্ধৃতি ব্যবহারের সময় লিখেছিলেন ‘বুদ্ধিজীবী’৷ প্রধান সম্পাদকের প্রশ্ন, ‘‘শ্রমজীবীর কি বুদ্ধি থাকে না? নারকেল গাছ থেকে ডাব পাড়ার জন্য যিনি বেয়ে বেয়ে ওঠেন, তার জন্যও বুদ্ধি খরচ করতে হয়৷ এমনকী, দেহব্যবসায়ীকেও বুদ্ধির সাহায্য নিতে হয়৷ একজন ঠান্ডা মাথার খুনি প্রমাণহীন খুন করার সময় কি বুদ্ধির আশ্রয় নেন না? অকারণে একদল লেখক, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, সাংবাদিককে বুদ্ধিজীবী দাগিয়ে দেওয়ার মানে কী? সম্মান জানাতে হলে বিশিষ্টজন লেখ অথবা বিদ্বজ্জন৷ ওসব বুদ্ধিজীবী-ফিবি লেখা যাবে না৷’’

ছোটবেলা থেকে যে পরিবারে মানুষ হয়েছি, সেখানে এই বুদ্ধিজীবী শব্দটির আনাগোনা একটু বেশিই৷ বাবা-জ্যাঠাদের বুদ্ধিজীবী বলতে শুনেছি অনেককেই৷ যতবারই শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে, ততবারই মুখ টিপে হাসতে দেখেছি তাদের৷ হাসতে দেখেছি বিদ্বজ্জন শব্দটি নিয়েও৷ কেন? তাহলে কি বুদ্ধিজীবী শব্দটি হাস্যকর কোনো জড় পদার্থ?

কলকাতার এক বিশিষ্ট চিত্র পরিচালকের কাছে প্রশ্নটি একদিন পেড়েই ফেলা গেল৷ সম্প্রতি সেই চিত্র পরিচালকের জীবনাবসান হয়েছে৷ বামপন্থি হিসেবে পরিচিত সেই ব্যক্তি বেশ অনেকক্ষণ ধরে বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন৷ তারপর আশ্রয় নিলেন এক রূপকের৷ 

‘‘বার্ডস আই ভিউ অ্যাঙ্গেলের ছবি দেখতে কেমন লাগে তোমার?’ বললাম, দিব্য৷ পরিচালকের বক্তব্য, ওই অ্যাঙ্গেলে সাবজেক্টের ছবিটি আসলে ডিসটর্টেড হয়ে যায়৷ ওই ডিসটর্শনটাই আসলে অবাস্তব, তাই মানুষের চোখে প্রিয়৷ কারণ ওই ডিসটর্শনে পরিচালক অথবা চিত্রগ্রাহকের সুপিরিওরিটি বা শ্রেষ্ঠত্ব ধরা পড়ে৷ বুদ্ধিজীবী শব্দটিও অনেকটা সেরকম৷ বুদ্ধি দিয়ে যিনি সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চাইছেন৷ নিজেকে সুপিরিওর মনে করছেন৷ সত্যি সত্যিই যিনি পণ্ডিত, তিনি অকারণে নিজেকে সুপিরিওর বা শ্রেষ্ঠ ভাবতে যাবেন কেন? 

মনে ধরেছিল কথাটা৷ পাণ্ডিত্যের জন্য সমাজ কাউকে ‘ঈশ্বর’ মনে করতে পারেন, যেমন ফুটবলে মারাদোনা৷ কিন্তু পণ্ডিত যখন নিজেই নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করে দেন, তখন বোঝা যায়, আসলে তিনি আর বুদ্ধির চর্চা করছেন না৷

অফিস শেষে কলকাতার চাঁদনি চক অঞ্চলে বসেছিলাম এক স্বনামধন্য সাংবাদিক তথা গদ্যকারের সঙ্গে৷ কথায় কথায় সেখানেও উঠল বুদ্ধিজীবীর প্রসঙ্গ৷ কারণ তার কয়েকদিন আগেই আরেক স্বনামধন্য সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশ করেছেন-- বুদ্ধিজীবীর ডায়েরি৷ ওই পত্রিকা নিয়ে কলকাতায় তখন হুলুস্থুল চলছে৷ সকলের হাতে হাতে ঘুরছে বইটি৷ লেখক বুদ্ধিজীবী শব্দটির ময়নাতদন্ত শুরু করলেন৷ টি এস এলিয়টের একটি বিখ্যাত কবিতা উদ্ধৃত করলেন-- হোয়্যার ইস দ্য উইসডম, উই হ্যাভ লস্ট ইন নলেজ/হোয়ার ইস দ্য নলেজ, উই হ্যাভ লস্ট ইন ইনফরমেশন৷ লেখকের প্রশ্ন, সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী কে? যিনি তথ্য বা ইনফরমেশন ঘাঁটাঘাঁটি করে কিছু একটা লেখার আকারে নামিয়ে দেন? নাকি, যিনি উইসডম নিয়ে কাজ করেন? উইসডমের চর্চা করেন, এমন মানুষ সমাজে ক'জন? লেখককে প্রশ্ন করা গেছিল, তাহলে নিজের পরিচয় কী দেবেন? সহাস্য উত্তর, ‘‘কলমজীবী৷ কলম পিষে খাই৷’’ বছরকয়েক আগে বহু সম্ভাবনা ফেলে রেখে অকালে মৃত্যু হয়েছে ওই কলমজীবীর৷

Syamantak Ghosh

স্যমন্তক ঘোষ, ডয়চে ভেলে

মৃত্যুর প্রসঙ্গেই আরও একটি কথা মনে পড়ে গেল৷ তখন সদ্য বাম শাসন থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বাম অরাজকতার বিরুদ্ধে তার আগে কলকাতার রাস্তায় মহামিছিল করেছেন বিশিষ্ট মানুষেরা (পড়ুন বুদ্ধিজীবী)৷ মমতা বলে দিয়েছেন, বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ সম্মান দেবে রাজ্য সরকার৷ এরই মধ্যে মৃত্যু হলো  বরাবর প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলে পরিচিত এক বিশিষ্ট সাহিত্যিকের৷ তিনি মমতা-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত৷ মৃত্যুর পর রাজ্য সরকার সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিল হাতে৷ জানানো হলো, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্তিম সৎকার হবে বুদ্ধিজীবীর৷ গান স্যালুট দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হলো তাকে৷ সেই দৃশ্য বহুদিন ভুলতে পারেননি পশ্চিমবঙ্গের এক বিশিষ্ট কবি৷ পরিবারকে জানিয়েছিলেন শেষ ইচ্ছার কথা৷ সরকার চাইলেও যেন তাকে গান স্যালুট দেওয়া না হয়৷ প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করাই যার কাজ, তাকে প্রতিষ্ঠান কেন গান স্যালুট দেবে? কেনই বা লাগিয়ে দেবে 'রাষ্ট্রীয় বুদ্ধিজীবী'র ব্যাজ৷

ওই কবিও নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলে মনে করতেন না৷ শ্রমজীবী হিসেবে ব্যাখ্যা করতেই পছন্দ করতেন নিজেকে৷ মনে করতেন, কায়িক শ্রম আর মগজের শ্রমের মধ্যে আসলে কোনো তফাত নেই৷ দুই দুয়ের পরিপূরক৷ মানুষ ভেদে সেই শ্রম ব্যবহারে ডিগ্রির তফাত হয় মাত্র৷

এত কিছুর পরেও ছোটবেলার প্রশ্ন তবু থেকে গেছে৷ বুদ্ধিজীবী কি তবে হাস্যকর কোনো জড় পদার্থ? একদল মানুষ বাজার করতে গিয়েও যা জাহির করতে পছন্দ করেন, আর একদল, শুনলে মুখ টিপে হাসেন!

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়