উপেক্ষাও তো অস্ত্র হতে পারে | আলাপ | DW | 28.08.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

উপেক্ষাও তো অস্ত্র হতে পারে

বাঙালির আর কিছু থাক বা না থাক, মুখ আছে৷ সেই মুখ খুললেই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে প্রখর সব শব্দবান৷ সশব্দে তা আছড়ে পড়ে প্রতিপক্ষের ওপরে৷ তাতে যুক্তি থাকে খুব কম৷

থাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর নিজেদের অলীক সব ধারণার প্রকাশ৷ আমার মতে মিলছে না, একেবারে বাক্যের তোপে উড়িয়ে দাও৷ সোজাসুজি যাও চরিত্রহননে৷ তাকে রাঙিয়ে দাও মাওবাদীর অতি লালে বা তৃণমূলের সবুজে অথবা বিজেপি-র গেরুয়ায়৷ সেলফোন-যুগের আগে পাড়ার আড্ডায় এই সব চলত৷ কিন্তু এখন প্রযুক্তি সুযোগের দিগন্ত খুলে দিয়েছে৷ আমজনতার সামনে অপ্রত্যাশিত সুযোগ৷ যখন খুশি ঢুকে যাও সামাজিক মাধ্যেম৷ বর্ষণ করো গালাগালি৷ তাতে কাজ না হলে লাঞ্ছনাকর যত শব্দ আছে তা দাগিয়ে দাও৷ আমার উল্টো মতে কথা বলছে বা যুক্তি দিয়ে আমায় আক্রমণ করছে, এত বড় সাহস! এটাকেই আরো বাড়িয়ে নিয়ে যায় রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের ট্রল বাহিনী৷ দিনকে রাত, রাতকে দিন করা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে বিপক্ষকে শুইয়ে দেওয়ার জন্য লাগাতার ট্রলিং৷ গোয়েবলসের শিখিয়ে দেয়া পথে হেঁটে মিথ্যাকে দেশভর ছড়িয়ে দেয়া, যাতে তা সত্য মনে হয়৷ 

উত্তর প্রদেশে ভোটের আগে হঠাৎ সামাজিক মাধ্যমে একটা কাহিনি ছড়িয়ে গেল৷ অখিলেশ যাদব তর্কাতর্কির সময় বাবা মুলায়ম সিং যাদবকে চড় মেরেছেন৷ মুহূর্তে কাহিনি ভাইরাল৷ দলের সমর্থকরা পর্যন্ত অখিলেশের ওপর চটে লাল৷ এত বড় সাহস বাবা মুলায়মকে চড়? শিক্ষা দিতে হবে অখিলেশকে৷ ছেলে অখিলেশ প্রতিবাদ করেননি, একবারের জন্যও বলেননি, এ সব মিথ্যা কথা৷ হয়ত ভেবেছিলেন, অলীক কাহিনির কী জবাব দেবেন৷ ভোট চুকে যাওয়ার অনেক পরে দলের কর্মীদের এক সভায় চড়ের উদাহরণ তুলে অমিত শাহ বলেছিলেন, এতে বিজেপির সুবিধা হয়েছিল, তবে এরকম মিথ্যা রটানো উচিত নয়৷ 

একটা ব্যক্তিগত উদাহরণ দেয়া যাক৷ পশ্চিমবঙ্গের ওপর আমফানের তাণ্ডব সবে শেষ হয়েছে৷ উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষের কাছে খাবার জল পর্যন্ত নেই৷ চারপাশে হাহাকার৷ মাথার ছাদ গেছে৷ সঞ্চয় শেষ৷ নোনা জলে ভরে গেছে মাঠ৷ আমার সহকর্মী সম্যন্তক তার বন্ধুদের সঙ্গে ত্রাণ নিয়ে দৌড়াচ্ছে কখনো সুন্দরবন, কখনো বসিরহাট৷ একটার পর একটা ছবি পাঠাচ্ছে৷ মর্মস্পর্শী৷ এক বৃদ্ধা তার শেষ সম্বল একটা ছাগলকে পাশে নিয়ে রাস্তায় বসে আছেন৷ একটু পানীয় জল পাওয়ার আশায় হাত বাড়িয়ে আছেন মানুষ৷ আর সামাজিক মাধ্যম জুড়ে চলছে এক অমানবিক কলরব৷ কোনো নেতা একদিন সামান্য ত্রাণ নিয়ে বের হলেন, ব্যস তার ছবিতে গগন ফাটে৷ বকিরা শুধু অভিযোগের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন৷ প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে পড়ছেন৷ স্যমন্তকের ছবির পাশাপাশি এই চিরকালীন সুবিধাবাদী বাঙালির ছবি মেলানো যাচ্ছিল না৷

সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিত লেখা আমার ধাতে নেই৷ কী মনে হলো, লিখে ফেললাম, সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে না৷ রাজনীতি করার সময়৷ দেখনদারির সময়৷ অন্তত এই সময়ে যারা পারেন, তারা দুর্গত মানুষদের সাহায্যের জন্য টাকা দিন৷ আর দয়া করে কোনো জায়গায় ত্রাণ দিয়ে ফলাও করে ছবি দেবেন না৷ অসহায় মানুষের পাশাপাশি সেই ছবিগুলো দেখতে ভালো লাগছে না৷ আর দয়া করে ওই মানুষগুলোকে নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুন৷ তারা একটু সামলে উঠুন৷ তারপর যত পারেন রাজনীতি করবেন সকলে৷ ব্যস, আক্রমণ শুরু হলো৷ আমি কোন দলের হয়ে কথা বলছি, সেই প্রশ্ন উঠে গেল৷ সবিনয়ে বলেছিলাম, আমি আমার কথা বলেছি, অন্যরা তাদের কথা বলতে পারেন৷ তার জন্য ব্যক্তিগত আক্রমণের দরকার নেই৷ ভবি ভুলবার নয়৷ নেকড়ে তখন শিকার পেয়ে গেছে৷

Goutam Hore

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে

আমি উপেক্ষা করেছি ওই সব আক্রমণ৷ কারণ, ক্লেদের মধ্যে ঢোকা অর্থহীন৷ তবে সাকিবের স্ত্রী যেমন ছবি মুছে দিয়েছেন, আমি তেমনভাবে নিজের মত মুছে দেইনি৷ একবার প্রতিবাদ করে নিজের মতে স্থির থেকে উপেক্ষা করেছি ওই ব্যক্তিগত আক্রমণ৷ কারণ, উপেক্ষাও তো প্রতিবাদের হাতিয়ার৷ অর্থহীন প্রলাপকে গুরুত্ব না দেয়া৷ এই আক্রমণ তো আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে৷ বিদ্যাসাগর যখন বিধবাবিবাহ দিচ্ছেন, তখন এক বিখ্যাত ব্যক্তি বলেছিলেন, শুনিতেছি কলিকাতায় এক পণ্ডিত না কি বিধবাবিবাহ দিতেছে৷ সে যদি পণ্ডিত হয় তো মূর্খ কে? রবীন্দ্রনাথকেও তো শুনতে হয়েছে, তিনি ইংরেজ কবিদের কবিতা চুরি করে নোবেল পেয়েছেন৷ যারা রবীন্দ্রনাথকে ছাড়ে না, বিদ্যাসাগর, রামমোহন, জগদীশচন্দ্রদের তুলোধুনো করে, তারা কি আমার মতো সাধারণ মানুষকে ছাড়বে? সেই ‘অলীক কুনাট্যের’ মঞ্চ এখন সামাজিক মাধ্যম৷ বিষ উগড়ে যাও৷ সেই বিষ মন্থন করে কোনোদিন কেউ অমৃত পাবে না৷

এ সবই হতাশা, আক্রোশ, স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা, দলবাজির প্রকাশ৷ তার প্রতিবাদ হোক৷ না হলে চরম উপেক্ষা করা হোক৷ তাদের কথা না শুনলে, আমল না দিলেই তো আক্রমণকারীদের মনসা পূর্ণ হবে না৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন