‘অর্থ কামাইয়ের জন্য এখনকার ছাত্র নেতারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করছে’ | আলাপ | DW | 03.12.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘অর্থ কামাইয়ের জন্য এখনকার ছাত্র নেতারা দলীয় লেজুড়বৃত্তি করছে’

ছাত্র রাজনীতির ধরণ কি বদলে গেছে? ছাত্র রাজনীতির সেকাল-একাল নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন এক সময়ের ছাত্রনেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স৷

ডয়চে ভেলে : আপনাদের সময়ের ছাত্র রাজনীতি আর এখনকার ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কী কী তফাৎ দেখেন?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমাদের সময় ছাত্ররাজনীতি শব্দটা ওইভাবে উচ্চারিত হতো না৷ আমরা বলতাম, আমরা ছাত্র আন্দোলনের কর্মী, সংগঠক৷ অন্যরাও আমাদের ছাত্র আন্দোলনের নেতা বলতো৷ তার মানে ছাত্র আন্দোলনটাই ছিল প্রধান বিষয়৷ এখন সেটা হয়েছে ছাত্র রাজনীতি৷ ছাত্র আন্দোলনটা হলো ছাত্রদের সমস্যা সমাধানে আন্দোলন পরিচালনা৷ আরেকটা বিষয় হলো, সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের সংকটে কথা বলা৷ ছাত্র আন্দোলনের শুরুতে আমরা সেই কাজগুলোই করে এসেছি৷ কিন্তু এখন যদি এটা দেখেন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি যারা করে তারা ছাত্রদের ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা থাকার জন্য৷ এখন ছাত্র শব্দটা কম উচ্চারিত হচ্ছে, রাজনীতিটা বেশি উচ্চারিত হচ্ছে৷ এটাই আমাদের সময়ের চেয়ে বর্তমানের একটা বড় পার্থক্য৷

আপনারা তো শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, হলে সিট ভাড়া বৃদ্ধি- এসব নিয়েও আন্দোলন করেছেন৷ আর এখন যে ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে, সেখানে আমরা দেখছি কোটা সংস্কার, নিরাপদ সড়ক, পরিবহণে হাফ ভাড়া এসব৷...

সাধারণ ছাত্ররা রাজপথে নেমে যে দাবি করছে, তার সঙ্গে দেখবেন ওই সময়ের দাবির কোনো পার্থক্য নেই৷ এমনকি আমরা একটা হলে খাবারের মান উন্নয়নের আন্দোলন থেকে শুরু করে এই যে বাসে হাফ ভাড়া সেটা কিন্তু ১১ দফায় সংযুক্ত ছিল৷ আমাদের সময়ও এটা ছিল৷ অর্থাৎ, সাধারণ ছাত্ররা যে দাবিগুলো করছে, আর আমরা যে দাবিগুলো করতাম তার সঙ্গে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই৷ এখানে আমি যে ব্যর্থতাটা দেখি, সেটা হলো এই দাবিগুলো ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রধান দাবি হিসেবে সামনে আনার প্রয়োজন ছিল৷ তারা যেহেতু এটা করতে পারেনি, জায়গা ফাঁকা থাকে না, ফলে ছাত্ররাই ওই দাবিগুলো সামনে নিয়ে এসেছে৷ এই দাবির সঙ্গে রাষ্ট্রের যে অসঙ্গতি সেটাও ছাত্র সমাজ তুলে ধরছে৷ আসলে আমাদের সময়ের দাবির সঙ্গে কোনো পার্থক্য তো নেই, উল্টো ঐক্যমত্যটাই বেশি বলে আমি দেখছি৷

অডিও শুনুন 13:00

‘এখন ছাত্র শব্দটা কম, রাজনীতি শব্দটা বেশি উচ্চারিত হচ্ছে’

শিক্ষার্থীদের কোন ইস্যুতে আন্দোলন করা উচিত? ছাত্র সংগঠনগুলোরই বা কোন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলনে সমর্থন দেওয়া উচিত?

সরলীকরণ করলে শিক্ষার্থীদের দুইটা চেহারা৷ একটা হলো সে শিক্ষার্থী, আরেকটা হলো সে এই সমাজের সচেতন নাগরিক৷ তাদের মনে রাখতে হবে, আগে তারা ছাত্র৷ ফলে শিক্ষা সংক্রান্ত যে সমস্যা আছে, সেটা সমাধানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দাবি আদায়ের সংগ্রাম করা৷ সচেতন নাগরিক হিসেবে তার সঙ্গে আরেকটা কাজ করতে হবে৷ সমাজে যে বড় বড় অসঙ্গতি, অন্যায়, অত্যাচার তার বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে৷ কিন্তু প্রধান কাজ হবে ছাত্র সমস্যা সমাধানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা৷ অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য দেখবেন৷ যেমন শাসক গোষ্ঠীর ছাত্র সংগঠন দলীয় লেজুড়৷ সুতারাং তাদের ভুমিকা হয় ওই দলের যে অ্যাজেন্ডা সেটা বাস্তবয়ন করা৷ আবার যদি ছাত্র সংগঠন কোনো দলের লেজুড় না হয় তাদের ভূমিকা সাধারণ ছাত্রদের ক্ষেত্রে যে পয়েন্টগুলো বললাম সেগুলো চলে আসে৷ আজকাল ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার যে ছাত্র সংগঠন আছে তাদের যে কোনো পদ-পদবি হচ্ছে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার৷ বিশেষ করে ক্ষমতাসীনরা এই পদ-পদবি ব্যবহার করে নিজেদের অর্থবিত্ত গড়ে তোলার জন্য৷ সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা থাকে না৷

আপনারা তো জাতীয় ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করেছেন, এখন কি জাতীয় ইস্যু নিয়ে ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে?

আমাদের কিন্তু প্রথম পয়েন্ট ছিল ছাত্র সমস্যা নিয়ে৷ তার সঙ্গে যুক্ত ছিল, এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন? যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষা করে না৷ তারা স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করে৷ তখন ছাত্ররা দুইটা কাজ করতো৷ একটা হলো, ছাত্রদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করা ৷ আরেকটা হলো জাতীয় ইস্যু নিয়ে কথা বলা৷ আপনাকে কোনো আন্দোলন করতে হলে ছাত্রদের দাবিকে সামনে নিয়েই করতে হবে৷ ছাত্র সংগঠনগুলো যুক্ত না হওয়ার কারণে ছাত্রদের দাবি সামনে থাকছে না৷ আমরা তখন যে আন্দোলন করতাম, সেই আন্দোলন কখন সফল পরিণতিতে যেতে পেরেছে? যখন সামনে এক বা একাধিক রাজনৈতিক শক্তি ছিল৷ এখন ছাত্ররা বিচ্ছিন্নভাবে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও চোখের সামনে ওই ধরনের কোনো ঐক্যবদ্ধ শক্তি দেখা যায় না, সুতারাং এগুলো অত বেশি পাত্তা পাচ্ছে না৷ আর এখনকার ছাত্ররাজনীতি নীতিহীন হওয়ার কারণে ছাত্ররা রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়ে গেছে৷ এটা মোটেই ভালো খবর না, এটা খুবই খারাপ খবর৷

আপনাদের সময় ছাত্র রাজনীতি শেষ করে আপনারা মূল দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতেন, এখনকার ছাত্রনেতারা কেন মূলদলে খুব একটা জায়গা পাচ্ছে না?

আমার মনে হয়, আপনারা ভোটের বিবেচনায় বড় দলের কথা বলছেন৷ হ্যাঁ, বড় দলগুলোতে আমরা দেখছি না৷ কিন্তু বামপন্থি দলগুলোতে আপনারা দেখবেন, যারা ছাত্র রাজনীতি করে আসছে তারা কিন্তু নানা জায়গায় দায়িত্ব পালন করছে৷ তারা কিন্তু দেখবেন, শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করছে বা কৃষকদের মধ্যে কাজ করছে৷ সুতারাং কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন বলেই তাদের আমরা দায়িত্ব দিতে পারি৷ কিন্তু বড় দলগুলোতে যেটা হয়, মাথায় ঢুকে যায় এমপি হতে হবে৷ দলের বড় পদ ছাড়া তাদের তেমন কোনো কাজ নেই৷ এই কারণে তাদের কোথাও দেওয়া যায় না৷ আমাদের দলগুলোতে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনার একটা প্রচেষ্টা থাকে৷ কিন্তু এই দলগুলোতে যারা ক্ষমতায় আসে তারা এক ধরনের জমিদারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে নেয়৷ মানে যারা আসবে তাদের ওই জমিদারের আন্ডারেই কাজ করতে হবে৷ ফলে জমিদার সাহেবরা তো তাদের জায়গা ছাড়তে চায় না৷ সেই কারণেই আমার ধারণা তাদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না৷

বর্তমান সময়ের ছাত্রনেতারা কি মূল রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি একটু বেশি করছে? নাকি আগেও এমন লেজুড়বৃত্তি হয়েছে?

আগে এই ধরনের অঙ্গ সংগঠন থাকলেও লেজুড়বৃত্তি ছিল না৷ আমরা যখন ছাত্ররাজনীতি করেছি, তখনও এত দেখিনি, এমনকি আগেও এত ছিল না৷ কারণ, তাদের মূল কাজ ছিল, ছাত্রদের দাবি আদায়৷ তাদের দায়বোধ ছিল, সমাজের সচেতন অংশ হিসেবে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা৷ সেই দায়বোধ থেকে তারা বড় কাজ করতেন৷ তখন ছাত্র থাকা অবস্থায় আয় রোজগার, পকেট ভারি করার প্রবণতা ছিল না৷ এখন হয়েছে পুরো উল্টো৷ লেজুড়বৃত্তি না করলে পদও পাওয়া যাবে না, আর্থিক কামাইও করা যাবে না৷ ফলে মূল কাজটা তারা না করে লেজুড়বৃত্তির কাজটা বেশি করছে৷

আপনাদের সময় ছাত্রদের অনেক বেশি অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যেতো, এখন কিন্তু ছাত্রদের মধ্যে অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা কমেছে, এই পরিবর্তনটা আপনি কিভাবে দেখেন?

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অস্ত্রের ব্যবহারটা ছিল৷ কারণ, একটা অস্ত্র তারা যখন নিয়ে আসতো তখন সেটাকে প্রতিহত করার জন্য অনেক সময় অনেক সাধারণ ছাত্র অস্ত্র নিয়ে এসেছে৷ অস্ত্র একবার হাতে উঠলে সেটার অপব্যবহার হয়৷ পরে আমরা দেখেছি, নিজেদের আধিপত্য রক্ষার জন্য অস্ত্রের অপব্যবহার৷ আশির দশকে এই অস্ত্র বেশি আমদানি করেছে ইসলামি ছাত্রশিবির৷ আগে যে কারণে ওইগুলো করা হতো, এখন অস্ত্র ব্যবহার না করেই সেই কাজগুলো করা যায়৷ আগে যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নিয়ে অস্ত্রের ব্যবহার হতো, এখন অস্ত্রের ব্যবহার না করেই সেই কাজগুলো করা হচ্ছে৷ এখন ওই প্রশ্রয়টা আর নেই৷ এসব কারণেই এখন আমরা আগের মতো ক্যাম্পাসে আর অস্ত্র দেখছি না৷