1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

প্রতি সাতটি ওষুধের মধ্যে একটি হয় নকল অথবা নিম্নমানের

১২৫ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ নকল, নিম্নমানের ও মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধে ছেয়ে রয়েছে৷ নিত্যদিন স্বাস্থ্যহানি ঘটছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার৷ দেশটির আমজনতার কী দশা হতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়৷

দেশটির নাম ভারত৷ সমীক্ষায় জানা গেছে, ভারতে ব্যবহৃত মোট ওষুধের ৩৫ শতাংশই নকল!‌ ভারতে এখন স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে বিতর্ক চলছে৷ রোগীর অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে ট্রাইব্যুনাল গড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার৷ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও একই পথে হাঁটতে চলেছে৷ কিন্তু স্বাস্থ্য সমস্যা আরও গভীরে৷ দেশের মানুষ তাঁদের রোগ-‌অসুখ ও চিকিৎসার জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, তার ৫৮ দশমিক ২ শতাংশই তাঁদের সাধ্যের বাইরে৷ তাই আপনজনের চিকিৎসার জন্য মূলত ঋণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ ভারতবাসী৷ এই বিপুল চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭৭ শতাংশ অর্থ খরচ হয় কেবলমাত্র ওষুধ কেনার জন্য৷ এই তথ্য কোনো বেসরকারি সংস্থার দেওয়া নয়৷ ‘‌ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন' বা ডাব্লিউএইচও জানিয়েছে এ তথ্য৷

এমন এক পরিস্থিতিতে ভারতের কোনো নাগরিক যদি আচমকা জানতে পারেন যে, সরকারি অথবা বেসরকারি হাসপাতালে দুর্মূল্য চিকিৎসা পরিষেবা পেতে গিয়ে বাজার থেকে তিনি এ যাবৎ যে ওষুধ কিনেছেন, তার বেশিরভাগটাই আদতে নকল অথবা নিম্নমানের? কিংবা জানতে পারেন, সুকৌশলে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের বাইরের প্যাকেট পরিবর্তন করে গছিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর হাতে? কেমন লাগবে তাঁর? গল্পের মতো মনে হলেও বিষয়টি সত্যি বৈকি!

একাধিক সংস্থার সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য বলছে, ভারতে প্রতি সাতটি ওষুধের মধ্যে একটি ওষুধই নাকি নকল৷ আর এই নকল ওষুধ অসুস্থ মানবশরীরে প্রয়োগের ফলে একদিকে যেমন রোগ পুষে রাখছে আমাদের শরীর, তেমনই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে৷ গত পাঁচ বছরে নকল ওষুধে ভারতের বাজার এতটাই ছেয়ে গেছে যে, গোটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে৷ ‘‌ইন্ডিয়া স্পেন্ড'‌ নামের একটি সংস্থা জানাচ্ছে এমনটাই৷

‘‌ড্রাগ অ্যাকশান নেটওয়ার্ক'‌ নামের একটি সংস্থার রিপোর্টেও উঠে এসেছে এই একই তথ্য৷ তারা জানিয়েছে, ভারতের বাজারে যে সমস্ত ওষুধ মেলে তার প্রায় ৩৫ শতাংশ ওষুধই হয় জাল, নয়ত উপযুক্ত মানের নয়৷ তবে সরকারি সংস্থা ‘‌সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন'‌-‌এর সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ভারতীয় ওষুধের মাত্র ৪ দশমিক ‌৫ শতাংশ নিম্নমানের৷ তাদের সমীক্ষ থেকে এ-‌ও জানা গেছে যে, বহু নামি-দামি কোম্পানির ওষুধ উপযুক্ত স্ট্যান্ডার্ডের ধারে-কাছে নেই৷ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘জার্নাল অফ ‌অ্যাপ্লায়েড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স'‌ যন্ত্রনা নিরাময়ের ওষুধ ‘‌ডিক্লোফেনাক সোডিয়াম'-‌এর মোট ৩২টি নমুনা পরীক্ষা করার পর জানিয়েছে, কথায় কথায় চিকিৎসকরা এই যে ওষুধটি প্রেসক্রাইব করে থাকেন, সেটা নিম্নমানের হওয়ায় এর বহু ব্যবহার মানুষের শরীরে সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে৷

অডিও শুনুন 07:21

‘ওষুধ উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রনের জন্য সরকারেই এগিয়ে আসতে হবে’

গতবছর আরও একটি সমীক্ষায় ‘‌ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস'‌ বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক ‘‌অ্যামোক্সিসিলিন ট্রাইহাইড্রেট'‌-‌এর মোট ৪৬টি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলি পরীক্ষা করার পর জানিয়েছে, নমুনার প্রায় এক তৃতীয়াংশই অত্যন্ত নিম্নমানের৷ স্টাডি কো-‌অর্ডিনেটর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আহমেদ নওয়াজ খান এই তথ্য জানিয়েছেন৷ এক্ষেত্রে ওষুধের প্যাকেটে যে ‘ইনগ্রেডিয়েন্ট' থাকার কথা, তা ৯০ থেকে ১১০ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক৷ তাছাড়া ভারতে সিডিএসসিও নিম্নসীমায় ৫ শতাংশ ছাড় দিয়ে থাকে৷ কিন্তু এত সত্ত্বেও বেশিরভাগ নমুনায় ‘ইনগ্রেডিয়েন্ট' এই নির্দিষ্ট মাপকাঠির তোয়াক্কা করেনি৷

এর আগে ২০০৩ সালে ‘‌দ্য ইকোনোমিক টাইমস'‌ পত্রিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নাম করে জানিয়েছিল, ‘‌গোটা বিশ্বের বাজারে নকল ওষুধের ৩৫ শতাংশ আসে ভারত থেকে৷'‌ কিন্তু পরে ডাব্লিউএইচও এ রকম কোনো বিবৃতির কথা অস্বীকার করায় বিষয়টি তখনকার মতো ধামাচাপা পড়ে যায়৷

এই সমস্যা প্রসঙ্গে এসইউসিআই-এর প্রাক্তন সাংসদ তথা চিকিৎসক তরুণ মন্ডল বলেন, ‘‌‘‌আমি সাংসদ থাকাকালীন ভারতের সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম৷ কিন্তু তৎকালীন স্বাস্থ্য রাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী বলেছিলেন, এমন কোনো তথ্য সরকারে কাছে নেই৷ আসলে পুরো বিষয়টি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক৷'‌'‌

সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর পরামর্শ, ‘‌‘‌ওষুধ উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রনের জন্য সরকারেই এগিয়ে আসতে হবে৷ ড্রাগ ইনস্পেক্টরদের সমস্ত পদ পূরণ করে সরকারি ওষুধ কোম্পানি গুলি থেকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উৎপাদন বাড়ানোয় জোর দিতে হবে৷'‌'‌

অডিও শুনুন 06:20

‘ভুক্তভোগী রোগীরাই জানেন নকল ওষুধ কতটা মারাত্মক’

দেশের ওষুধ কোম্পানির পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সরকারের হাতে না থাকা নকল ওষুধের এই বাড়বাড়ন্ত রোধে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওষুধ নির্মাতাদের বিস্তারিত বিবরণ অথবা তালিকা সরকারের হাতে নেই৷ ওষুধের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণের নেই কোনো ব্যবস্থা৷ ফলে ওষুধের ভালো-মন্দ পুরোটাই নির্ভর করছে ওষুধ নির্মাতাদের নিজস্ব মর্জির ওপর৷ ওষুধ ক্রেতারা কখনোই ওষুধ নির্মাতাদের লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন অথবা শেষ পর্যবেক্ষণের তারিখ জানতে চান না৷ গতবছর মোট ৭৪,১৯৯টি ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করেছে সিডিএসসিও, যা ২০১২ সালে সংগৃহিত নমুনার দেড়শ' গুণ৷ এ সব সত্ত্বেও মাত্র এই সংখ্যক ওষুধের নমুনা ভারতের মতো দেশে সমুদ্রের জলরাশির একবিন্দু জলকনা মাত্র৷

গোটা দেশে ওষুধ কোম্পানি গুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানোর দায়িত্ব যাদের কাঁধে সেই ড্রাগ ইন্সপেক্টরদের প্রায় ৫০ শতাংশ পদ ফাঁকা পড়ে রয়েছে৷ মাঝেমধ্যে কয়েকটি কোম্পানিকে নোটিস পাঠানো হয় বটে, তবে ঐ পর্যন্তই৷ এর পাশাপাশি, মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধে ছেয়ে গেছে গোটা দেশ৷ এক্ষেত্রে কোম্পানি নয়, মাঝামাঝি কোনো অসৎ চক্রের হাত থাকে৷ নির্মাতা সংস্থা গুলি যদি ওষুধ যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করে, তাহলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়৷ এ ব্যাপারে সরকারের বক্তব্য, ভেরিফিকেশন প্রযুক্তি যথেস্ট ব্যয়সাধ্য হওয়ায় ছোটখাটো কোম্পানিগুলোর পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না৷ কয়েকটি নামি সংস্থা অবশ্য এসএমএস, মোবাইল অ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে এই পদ্ধতি চালু করেছে৷

চিকিৎসক স্বপন ভৌমিক জানান, ‘‌‘‌আমাদের দেশে ভেজাল ওষুধের সমস্যা আছে৷ চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি সেটা টের পান৷ আর ভুক্তভোগী রোগীরাই জানেন নকল ওষুধ কতটা মারাত্মক৷'‌'‌

মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের প্যাকেট বদল করে নতুন স্ট্যাম্প ব্যবহার করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে৷ বিভিন্ন রাজ্যে এমন বহু ঘটনা সামনে এসেছে৷ ডা. ভৌমিকের কথায়, ‘‌‘‌ক'‌দিন আগেই কলকাতায় বড়সড় চক্রের হদিশ পেয়েছে পুলিশ৷ তবে এই চক্রের মূল পান্ডা পর্যন্ত আদৌ পৌঁছানো যাবে বলে মনে হয় না৷ আসলে আইনে কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন৷ কিন্তু বর্তমান যে আইন রয়েছে, সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে৷''

তিনি আরো জানান, ‘‘প্রতিবেশী বাংলাদেশ-‌সহ অন্যান্য দেশে কতটা ভারতীয় জাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ছে তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই৷ তবে নকল ওষুধ ধরা পড়লে ভারতীয় সেই কোম্পানির দুর্নামের পাশাপাশি ভারতের প্রতি এই সব দেশগুলির ধারণা অত্যন্ত খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক৷ তাই এই অব্যবস্থা দূর করতে সরকারের অবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত৷'‌'‌

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

সংশ্লিষ্ট বিষয়