1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

আলাপ

ঢাকার উন্নয়ন ও কিছু অপ্রিয় কথা

না জেনে, না বুঝে কল্পকাহিনি শুনে বিশ্বাস করবেন; কথা বলবেন; লিখবেন – তবে আপনি আশাবাদী মানুষ৷ কল্পকাহিনি বিশ্বাস না করে, একটু জেনে বুঝে লিখলে বা কথা বললে আপনি হতাশাবাদীদের দলে পড়ে যাবেন৷ কথা বলছি রাজধানী ঢাকা নিয়ে৷

ধারণা করা হয় প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস রাজধানী ঢাকায়৷ যদিও এই নগরে ঠিক কত মানুষ বাস করেন, তার সঠিক সংখ্যা কারো জানা নেই৷ কত রিকশা আছে, তাও কেউ জানেন না৷ ভাঙাচোরা, রংচটা মিনিবাস ৩০ থেকে ৩৫ বছরের পুরোনো৷ পৃথিবীর সবচেয়ে অনুন্নত দেশটিতেও এমন মানের বাস চোখে পড়ে কিনা, সন্দেহ আছে৷ পৃথিবীর অন্যতম মানসম্পন্ন ভলভো দোতলা বাস কেনা হয়েছিল ৫০টি৷ যেহেতু বিএনপি সরকার কিনেছিল, আওয়ামী লীগ সরকার তা গ্যারেজে ফেলে রেখেছে৷ যা এখন আর চলার উপযুক্ত নেই৷ অথচ একেকটি বাসের দাম কয়েক কোটি টাকা৷ পুরোনো বাস নিয়ে নাড়াচাড়া করার চেয়ে নতুন বাস কিনলে লাভ বেশি! গত ৫-৭ বছরে হাজার খানেক বাস কিনেছে আওয়ামী লীগ সরকার৷ এর মধ্যে কয়েক'শ অত্যন্ত নিম্নমানের প্লাস্টিক বডির৷ হাজার খানেক বাসের মধ্যে ৫ থেকে ৬'শ বাস নষ্ট হয়ে পড়ে আছে৷ এখন আবার নতুন বাস কেনার পরিকল্পনা চলছে!

যে রাজধানী শহরে গণপরিবহন বলতে কিছু নেই, সেই রাজধানী এখন ‘উন্নয়নের জোয়ারে' ভাসছে! ফ্লাইওভার তৈরি হচ্ছে, মেট্রোরেল তৈরি হবে৷ এই উন্নয়নের ফলে নগর ঢাকার নজিরবিহীন যানজট সমস্যার কতটা সমাধান হবে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশ কিভাবে তার যানজট সমস্যার সমাধান করেছে, আর আমরা কী করছি? এ সব বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলার আছে...৷

১. যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়৷ মেট্রো রেল বা ফ্লাইওভার নির্মাণ পরিকল্পনার প্রথমদিকে সেভাবেই ভাবা হয়েছিল৷ তা করতে হলে কিছুটা সময় দরকার৷ আমাদের সরকারের হাতে তেমন সময় নেই! উন্নয়ন দৃশ্যমান করা জরুরি৷ ফলে মেট্রোরেল নয়, ফ্লাইওভার নির্মাণের দিকে সকল মনোযোগ দেয়া হয়েছে৷ তা-ও যদি সঠিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে হতো!

অপরিকল্পনার একটি উদাহরণ দেই৷ বাংলাদেশের গাড়ি ডান হাতে চালিত৷ তেজগাঁও-মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে বাম হাতে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করে৷ এখন ডিজাইন পরিবর্তন করতে হলে ৬০টি পিলার ভাঙতে হবে৷ যদিও প্রকল্প পরিচালক বলছেন, ‘‘আমি মনে করি এতে কোনো সমস্যা হবে না৷'' ভুল নকশায় রাষ্ট্রীয় অর্থ ধ্বংস করে তিনি ‘মনে করছেন'৷

২. এখন বিচ্ছিন্নভাবে ঢাকা নিয়ে যে ‘উন্নয়ন' কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তার ফলে আরো জটিলতা বাড়বে৷ এমনিতেই ঢাকা অপরিকল্পিত শহর৷ মহা অপরিকল্পিতভাবে এখন ‘উন্নয়ন' হচ্ছে৷ দু-একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে৷ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হবে রেল লাইনের উপর দিয়ে৷ এর ফলে আর কখনোই রেল পথ সম্প্রসারণ করা যাবে না৷ সম্প্রসারণ করতে হলে উপরের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ভাঙতে হবে, যা সম্ভব নয়৷ তেজগাঁও-মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভার তৈরির ফলে আর কখনো এই অঞ্চলে মেট্রোরেল নির্মাণ করা যাবে না৷ সামরিক বাহিনীর বাধার কারণে মেট্রোরেল জাহাঙ্গীর গেটের সামনে দিয়ে করা যায়নি৷ এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে মেট্রোরেলের ভবিষৎ কী হবে, বলা মুশকিল৷ যদি মেট্রোরেল নির্মাণ হয়ও, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এসে আটকে থাকবে৷ মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের কারণে মেট্রোরেল যাত্রাবাড়ি সায়দাবাদের দিকে নেয়া যাবে না৷

Bangladesh Journalist Golam Mortoza

গোলাম মোর্তোজা, সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক এবং টিভি টকশো-র মডারেটর

৩. ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল নির্মাণ পরিকল্পণার সময় বিবেচনায় নেয়া জরুরি ছিল কোনোটার সঙ্গে কোনোটা সাংঘর্ষিক হবে কিনা৷ যা আমাদের পরিকল্পনায় করা হয়নি৷ বাংলাদেশে মেট্রোরেল নাম দিয়ে যা নির্মাণ করা হবে তা আসলে মনোরেল বা স্কাইট্রেন৷ আমাদের পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া স্কাইট্রেন, মনোরেল তৈরি করেছে৷ ফ্লাইওভারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে তারা নির্মাণ করেনি৷ তারা প্রথমে স্কাইট্রেনের একটি রুট নির্মাণ করেছে৷ পুরো শহরের সব কটি রুটের পরিকল্পনা করেছে শুরুতেই৷ বাস্তবায়ন করেছে পর্যায়ক্রমে, সময় নিয়ে৷ ব্যাংককের বেশির ভাগ অঞ্চল এবং কুয়ালালামপুরের পুরোটা এখন স্কাইট্রেনের আওতায়৷ এয়ারপোর্ট থেকে যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যায় স্কাইট্রেনে৷ সিংগাপুর মেট্রো রেল নির্মাণ করেছে মাটির নীচ দিয়ে৷ মাটির নীচ দিয়ে মেট্রোরেল অনেক বেশি ব্যায় সাপেক্ষ৷ মাটির গুণাগুণের উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে৷ ঢাকায় তা নির্মাণ করা সম্ভব কিনা, নিশ্চিত নয়৷ পার্শ্ববর্তী কলকাতা নব্বইয়ের দশকে ঢাকার চেয়েও ভয়াবহ যানজট আক্রান্ত ছিল৷ সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এখন তারা যানজট অনেক খানি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে৷ প্রথমে মাটির নীচ দিয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ করেছে৷ আস্তে আস্তে বিভিন্ন দিকে তা সম্প্রসারণ করেছে, করছে৷ ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে পরিকল্পিতভাবে৷ বিশাল দিল্লি শহর পুরোটা এখন মেট্রোরেলের আওতায়৷ এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি মেট্রোরেলে দিল্লির যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যায়৷ তাছাড়া এ সব শহর সমন্বিত ট্রাফিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেছে৷ ঢাকায় যার কোনো উপস্থিতি নেই৷

৪. ঢাকায় চূড়ান্ত অপরিকল্পিতভাবে মেট্রোরেলে নামে স্কাইরেল নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে৷ এই পরিকল্পনার শুরুতে জাপানি বিশেষজ্ঞরা সরকারকে জানিয়েছিলেন, রাজধানী ঢাকা অন্যত্র সরিয়ে না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না৷ বুয়েট-এর বিশেষজ্ঞরা আরো আগে থেকেই এ কথা বলছেন৷ আমাদের পরিকল্পনায় তা সামান্যতমও গুরুত্ব পায়নি৷ বলা হয়, ঢাকা সরিয়ে কোথায় নেয়া হবে? জায়গা নেই৷ আসলে বিষয়টি জায়গার অভাব নয়, সমস্যা আন্তরিকতার, সমস্যা পরিকল্পনার৷

রাজধানী সরানোর জন্য বন্যামুক্ত শক্ত মাটি দরকার৷ যা সাভার, ভাওয়াল গড়, পূর্বাচল অঞ্চলে ছিল৷ পুরো পূর্বাচল অঞ্চলের আয়তন ৬,৫০০ একর৷ মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে পুত্রাজায়ায়, যার আয়তন ৭,০০০ একর৷ পূর্বাচলে ক্ষমতাবানরা ভাগ করে প্লট বানিয়ে নিয়েছে৷ সরকার চাইলে প্লট বরাদ্দ না দিয়ে পুরো রাজধানী পূর্বাচলে সরিয়ে নিতে পারতো৷ মালয়েশিয়া ছাড়াও আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ রাজধানী সরিয়ে সমস্যার সমাধান করেছে৷ দিল্লি থেকে নয়া দিল্লি করা হয়েছে৷ করাচি থেকে রাজধানী নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইসলামাবাদে৷ মায়ানমার, শ্রীলঙ্কাও রাজধানী সরিয়ে নিচ্ছে৷ বাংলাদেশের এ রকম কোনো পরিকল্পনাই নেই৷

৫. অপরিকল্পিত উন্নয়ন কোনো উপকারে আসে না৷ নতুন নতুন অনেক সমস্যা তৈরি করে৷ মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভারের কারণে ঢাকার তেমন কোনো সমস্যার সমাধান হবে না৷ অপরিকল্পিত ঢাকা নগরে আরো কিছু অপরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরি হবে শুধু৷ স্থবির রাজধানী ঢাকা প্রায় স্থায়ী ‘ডেড সিটি'-তে পরিণত হবে৷

আপনি কি লেখকের সঙ্গে একমত? জানান নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়