1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

ডয়চে ভেলের দুই সাংবাদিকের সঙ্গে

চলতি বছরের মে মাসের প্রথম দিকে জার্মানিতে এসেছি৷ তিন মাসের জন্য ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগে৷ গত এক দশকে ঢাকার কোনো নিউজ রুমে এত দীর্ঘ সময় আর কোনোদিনই আমি অনুপস্থিত ছিলাম না৷ ঢাকায় রিপোর্টিং করতাম৷ এখানকার কাজ মূলত ডেস্কে৷

এই দুই সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরনে বড় একটা মিলও রয়েছে৷ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগ –উভয়েরই লক্ষ্য মূলত বাংলাদেশি পাঠকরা৷ এরপরও নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজে রয়েছে নানামুখী নতুন মাত্রা৷

সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন পর নতুন একটা অফিসে কাজ করায় ভিন্নধর্মী একটা অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই হয়েছে৷ আমার কাজ করা এই দুই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত খবর এবং উপস্থাপনায়ও রয়েছে অনেক পার্থক্য৷

ডয়চে ভেলের বন অফিসেই বহু ভাষার বহু দেশের মানুষ কাজ করেন৷ উঠতে বসতে দেখা হয়ে যায় তাঁদের সাথে৷ এ যেন নতুন নতুন সংস্কৃতিকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ৷

জার্মানি এসেছি, সাংবাদিকতা করছি৷ তার মানে এটা নয়, আমার তৈরি করা খবর জার্মানরাও পড়ছে৷ নানামুখী ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এই মুহূর্তে কেউ সুযোগ দিলেও হয়ত এখানকার মানুষের জন্য সাংবাদিকতা করার পর্যায়ে আমি নেই৷ অন্তত আমার বিশ্বাসটা এ রকমই৷

Bremen Nina Haase und Sumi Somaskanda Station 5

নিনা হাসে এবং সুমি সমাস্কান্দা

কারণ বিদেশের সাংবাদিকতা মানে মানে কেবল একটি নতুন ভাষায় নয়৷ ভাষার সঙ্গে থাকা জনগোষ্ঠী, তাঁদের জীবন যাত্রা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু – পুরো প্যাকেজ৷ পুরো ব্যপারটাই ভিন্ন৷ এমনকি এখানে মানুষের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ধরনও ভূমিকা রাখে৷

আমার মনে হয়, ভিন্ন দেশ থেকে কেউ এসে কোথাওসাংবাদিকতা করতে এ সব বিষয়ে পড়াশোনা করে আসতে হবে৷ কেউ সেটা করতে চাইলে তা খুবই দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার৷ এরপরও এখানকার একেবারে মূল ধারার সাংবাদিকতা দেখার লোভ ভেতরে ভেতরে ছাড়তে পারিনি৷

তাই ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের নেতৃস্থানীয়দের এই আগ্রহের কথা বলতে কুণ্ঠিতও হইনি৷ যার ধারাবাহিকতায় জার্মান নির্বাচন ঘিরে এখানকার রাজনীতি নিয়ে বেশ কিছু খবর অনুবাদ করি৷

এর মাঝেই একটি খবর ছিল ‘গ্রীষ্ম-যাত্রায়' বের হচ্ছেন ডয়চে ভেলের দুই প্রতিবেদক৷ এরা হচ্ছেন সুমি সমাস্কান্দা এবং নিনা হাসে৷

এরমধ্যে মার্কিন নাগরিক সুমি ২০১১ সাল থেকে ডয়চে ভেলে ইংরেজি বিভাগের উপস্থাপক হিসাবে কাজ করছেন৷ আর নিনা ২০০৫ সাল থেকে ডয়চে ভেলের ইংরেজি এবং জার্মান সংস্করণে প্রতিবেদক, সম্পাদক, অনলাইন লেখক এবং উপস্থাপক হিসাবে কাজ করছেন৷

‘গ্রীষ্ম-যাত্রা' মূলত ডয়চে ভেলের নিয়মিত আয়োজন৷ প্রতি বছরই গ্রীষ্মে এ ধরনের যাত্রায় বের হয় ডয়চে ভেলের একটি টিম৷

আগামী সেপ্টেম্বরে জার্মানির সংসদের নিম্নকক্ষ বুন্ডেসটাগের নির্বাচন৷ এ উপলক্ষ্য এবারের গ্রীষ্ম-যাত্রায় নির্বাচনের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়৷ ঠিক করা হয় ছয়টি ইস্যু৷ যেগুলো নিয়ে কথা বলতে ছয়টি শহরকে ধরে মূলত ছয়টি এলাকা ঠিক করা হয়৷

এ সব এলাকায় গিয়ে দুই প্রতিবেদক সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলছেন, নিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ মতামত৷  ডয়চে ভেলের বিভিন্ন মাধ্যমের জন্য খবর সংগ্রহ এবং তৈরি করবেন৷

এখানে বলে রাখা ভালো, ডয়চে ভেলের সদরদপ্তর বনে৷ এখানে সব অনলাইন এবং রেডিও-র কার্যালয়৷ আর টিভির কার্যালয় বার্লিনে৷

সুমি সমাস্কান্দা এবং নিনা হাসে নামে দুই প্রতিবেদক তাঁদের যাত্রা শুরু করেন বার্লিন থেকে৷ যে ছয় শহরকে ঘিরে তাঁরা এই গ্রীষ্ম যাত্রায় আবর্তিত হবেন, তার মধ্যে বনের সবচেয়ে কাছের শহর কোলন৷

জার্মানির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য নর্থরাইন ওয়েস্টফালিয়ার সবচেয়ে বড় শহর কোলন৷ দুই হাজার বছরের পুরাতন এই শহর জার্মান সংস্কৃতিরও অন্যতম কেন্দ্র৷ এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করে৷ এ কারণে এখানকার জন্য গ্রীষ্ম-যাত্রায় বিষয় ঠিক করা হয় ‘ইসলাম'৷

‘ইসলাম কি জার্মানিকে বদলে দিচ্ছে' – এই প্রশ্নের জবাব খোঁজা হয় কোলন এবং আশেপাশের এলাকায়৷

গত ৫ মে কোলনের অদূরে বন শহরে আসেন সুমি৷ ঐ দিন বিকালে তাঁদের সাথে একটি মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেখা করার কথা৷ এই এলাকাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে প্রচুর মুসলিম বাস করে৷

যাই হোক, এত সব কিছু না জেনেই ঠিকানা ধরে ওই এলাকায় যাই৷ এখানে চমৎকার গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকলেও ঠিকানা খুঁজে পেতে সুবিধার জন্য ট্যাক্সিতেই যাই৷ ট্যাক্সিওয়ালা নামিয়ে দেয়ার পর আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না৷ আশেপাশে কয়েকজনকে পেলাম বটে তবে তাঁরা কেউই ইংরেজি একেবারেই বোঝেন না৷ রীতিমত ইশারা ভাষায় কথা বলার মতো দশা৷

পাশেই একটি মসজিদও খুঁজে পেলাম৷ কাভারেজের বিষয় যেহেতু ইসলাম, তাই ঠিকানা চেক করতে সেখানেও একবার উঁকি দিলাম৷ তবে সেখানেও কাউকে খুঁজে পেলাম না৷

ঠিকানা অনুসারে যদিও আমি সঠিক জায়গাতেই আছি৷ তবে বাড়িটি একেবারে জনশূন্য বলে সন্দেহ হয়৷ এদিক ওদিক ঘুরতে থাকি৷

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর ফিরে এসে দেখি দুই নারী বসে আছেন৷ একজনকে ছবিতে দেখা সুমির মতোই মনে হচ্ছে৷ হ্যাঁ, সুমিই৷ অন্যজন হচ্ছেন ম্যাক্সিমিলিয়ানে কোসচিক৷ তিনি ডয়চে ভেলে বন অফিসে কাজ করেন৷ সুমি এই শহরে আসার পর তিনি তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন৷

এবার আমাদের তিনজনের অপেক্ষা শুরু হলো৷ কিছুক্ষণ পর আফ্রিকান কিছু সাংবাদিক আসলেন৷ আসলেন ডয়চে ভেলে অন্য বিভাগের কয়েকজন সহকর্মীও৷

কথা প্রসঙ্গে জানলাম, এখানে মার্শাল আর্টের দুই শিফটের আমরা থাকবো৷ এর জন্য কর্তৃপক্ষ থেকে পূর্বানুমতিও নেয়া হয়েছে৷ এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জার্মানিতে অনুমতি ব্যতীত বাচ্চাদের ছবি তোলা যায় না৷ এটা কঠোরভাবে মানা হয়৷ অবশ্য এখানকার সমাজে ঘুরে আমার মনে হয়েছে, বাচ্চাদের সব বিষয়েই তাঁরা খুব স্পর্শকাতর৷

যাই হোক, যেহেতু একটা শিফট বাচ্চাদের, তাই অনুমতির বিষয়টা আরো যত্ন করে নেয়া হয়েছে৷ ঘণ্টাখানেক পর ক্লাবের লোকজন আসে৷ খোলে দরজা৷ আমরা ভেতরে যাই৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই অভিভাবকদের সাথে শিশুরাও আসতে শুরু করেন৷

ম্যাক্স ক্যামেরা খুলে ছবি নিতে শুরু করেন৷ তাঁর দেখাদেখি ছবি নিতে থাকি আমিও৷ এভাবে গল্পে-আড্ডা-কাজে কেটে যায় আধা ঘণ্টা৷ এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও বেড়ে অনেক হয়ে যায়৷ মাঝখানে তারা শরীরচর্চা করছে, প্র্যাকটিস করছে৷ একপাশে সারি বেঁধে বসে আছেন অভিভাবকরা৷

হঠাৎ করে এক লোক এসে ছবি তোলার বিষয়ে আপত্তি জানান৷ জার্মান ভাষায় আপত্তি৷ আমি কিছুই বুঝিনি৷ উদ্বেগ দেখি দুই প্রতিবেদকের চোখে মুখে৷ পরে নিনা ও ম্যাক্স আমাকে বুঝিয়ে বলেন৷

এক অভিভাবকের আপত্তির পর তারা জানান, ক্লাব কর্তৃপক্ষ থেকে অনুমতি নেয়া হয়েছে৷ এরপর ওই অভিভাবক বলেন, না, আমার বাচ্চা, আমি আপত্তি করার পর আপনি আর ছবি তুলতে পারেন না৷

সুলাইমান নিলয়

সুলাইমান নিলয়, ডয়চে ভেলে

ক্লাব কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তাঁরা জানায়, এভাবে তাঁরা অতীতে অনেককে অনুমতি দিয়েছেন৷ কিন্তু কেউ আপত্তি করেনি৷ কেউ আপত্তি করতে পারে বলে তাঁরা ভাবেনওনি৷

এরপর যেটা দেখলাম, দুই মারকুটে সাংবাদিক তাঁদের সব জিনিসপত্র গুটিয়ে নিলেন৷ এসে বসে পড়লেন বাইরের দুর্বা ঘাসে৷ আমি ভাবছিলাম, জার্মানির সেই আইনের কথা৷ যেখানে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে৷ তবে ব্যক্তির অধিকার তারও উপরে৷

অলস আড্ডার মাঝে আমরা তিন জন বের হলাম৷ খেয়ে আসলাম হালকা নাস্তা৷ এক সময় শেষ হয়ে যায় শিশুদের সেই সেশন৷ আমরা ফিরে আসি ক্লাবে৷

এবারে মার্শাল আর্টের শিক্ষার্থীরা নানা বয়সের৷ ১৫-১৬ থেকে শুরু করে একেবারে পরিণত বয়সের ছেলে মেয়েও আছেন৷ ম্যাক্স ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে নানাভাবে ছবি নিচ্ছিলেন৷ মাঝে মাঝেই মোবাইল ফোনে তুলছিলেন স্থির ছবিও৷ এরপরই কাজ করছিলেন ফোনে৷

কয়েকবারই দুইজন পিটিসিরও কাজ করছিলেন৷ নিনা দাঁড়াচ্ছেন ক্যামেরার সামনে৷ আর ম্যাক্স পেছনে৷ পিটিসি দিচ্ছিলেন দুই ভাষাতেই৷ জার্মান এবং ইংরেজি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

মাঝে মাঝে সুযোগমতো তাঁরা মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন৷ ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও তাঁরা ধারন করেন৷

আরো ঘণ্টা দেড়েক এভাবেই কাটলো৷ এরপর আমাদের বের হওয়ার সময় হলো৷ বের হতে হতে দেখি টুইটারে আমাকে ট্যাগ করে আমার একটি ছবি দিয়েছে নিনা৷ আরো বেশ কিছু টুইট করেছে তাঁরা৷

আলাপে আলাপে জানা গেলো, খবরে ব্যবহারের ছবির পাশাপাশি তাঁরা ডয়চে ভেলের ফেসবুক, টুইটারের জন্য ছবি এবং ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ নিয়েছেন৷ এর মধ্যে পোস্টও করেছেন অনেকগুলো৷ রসদ নেন ইংরেজি ও জার্মান সংস্করনের অনলাইনে লেখার৷ তাঁরা মূলত টিভির জন্যই কাজ করছেন৷ আমাদের টিভি সাংবাদিকদের গতানুগতিক কাজের বাইরে এতগুলো কাজ সামাল দেয়ায় আমি বেশ চমৎকৃত হয়েছি৷

একটা কথা বলতেই হবে নিনা-ম্যাক্সদের কাজের গতি এবং দক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করেছে৷

আমাদের দেশেও অনেক দক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন৷ যাঁরা হয়ত নিনা বা ম্যাক্সের চেয়েও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন৷ তাঁদের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি৷ টিভি সাংবাদিকদের কথা বলায় তাঁরা ক্ষিপ্ত হতে পারেন৷

বিষয়টাকে অন্যভাবেও দেখা যায়৷ তাঁদেরকে যদি অনলাইন সাংবাদিক ভাবি৷ তাহলে অনলাইনের কাজও আমরা কত কম করি৷ অনলাইনে যদি তাঁদের সম পরিমাণ কাজও আমরা করে থাকি, তাহলেও এর বাইরে দুই দুইটা ভাষার জন্য টিভি রিপোর্টের কাজ করা আমার মতো অযোগ্যের পক্ষে সম্ভব নয়৷ অন্তত এই মুহূর্তে৷

প্রথম দিকে বলেছিলাম, ভিন্ন দেশে ভিন্ন সংস্কৃতিতে কাজের ক্ষেত্রে অনেক কিছুর জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হয়৷ নিনাও হয়ত নিয়েছে৷ আমার মতো তিনিও জার্মান নন৷ তিনি এসেছেন দূরের দেশ অ্যামেরিকা থেকে৷ মুগ্ধ হওয়ার এটাও একটা কারণ৷ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতে ফিরতে এই দুই সাংবাদিকের সঙ্গে আরো কথা বললাম৷ তাঁদের ছোট ছোট দু'টো সাক্ষাৎকারও নিলাম৷ হয়ত কেবলই নিজের জন্য৷ আগামী দিনে তাঁদের ক্ষিপ্রতা যদি একটু গতিও বাড়ায়, সেই প্রত্যাশায়৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন