1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বিশ্ব

জার্মানিতে নাৎসি ভাবনাকে কি উসকে দেয়া হচ্ছে?

জার্মানিতে গত এক দশকে নাৎসি অনেক এলাকা সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে৷ কিছু ভবন করা হয়েছে জাদুঘর বা প্রদর্শনীর স্থান৷ এ মাসে ফোগেলসাং স্কুলটিতে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী, যেটি ছিল নাৎসিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা স্কুল৷

ফোগেলসাং দুর্গে প্রতিটি কোণায় নাৎসি প্রতীক ছড়িয়ে আছে৷ আছে ভাস্কর্যও৷ ১৯৩০-এর দশকে ফোগেলসাং দুর্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল স্কুলটি৷ সেখানে এই চিত্রকলা প্রদর্শনী শুরু হয়েছে, যা দেখলে মনে হবে নাৎসীদের আভিজাত্য নতুন করে জেগে উঠেছে৷ এক দশক আগে আইফেল এলাকার এই স্থানটিতে ৬০ বছর ধরে সাধারণের প্রবেশ সীমিত ছিল৷ এতদিন এটা ন্যাটো সেনাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে৷

‘ফোগেলসাং' মানে পাখির গান৷ এই দুর্গটি সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয় ২০০৬ সালে৷ বেলজিয়ামের সৈন্যরা নাৎসি প্রতীক ও ভাস্কর্যের কারণে এক ধরনের মানসিক চাপে ভুগছিল, আর তাই তারা জায়গাটি থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়৷ কেবল দেয়ালে নয়, মেঝেতেও স্বস্তিকা চিহ্নের ছড়াছড়ি৷ ইতিহাসবিদরা বলছেন, এখানে ঢুকলে মানুষ একটা বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন৷ কট্টরপন্থা এবং জাতীয়তাবাদ একসাথে কীভাবে গড়ে উঠেছিল৷ ফোগেলসাং নিয়ে গবেষণা করছেন গাব্রিয়েলে হার্জহাইম৷ তিনি বললেন, ‘‘প্রদর্শনীতে এসে পর্যটকরা জানতে চান, এই প্রদর্শনী আসলে আমাকে কী শেখাচ্ছে?''

ফোগেলসাং দূর্গ

জার্মানির ফোগেলসাং দূর্গ

ফোগেলসাং যখন নাৎসি বিদ্যালয় ছিল

৪ সেপ্টেম্বর প্রদর্শনীটি শুরু হয়, যেটি আয়োজন করতে সময় লেগেছে সাড়ে চার বছর৷ আর এতে খরচ হয়েছে ৫ কোটি মার্কিন ডলার৷ হিটলার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৩৩ সালে এই কলেজটি প্রশাসনের কর্মী ও দলের শীর্ষ নেতাদের তৈরি করতে কাজ শুরু করে৷ এমন আরও দু'টি কলেজ ছিল৷ মূলত এখানকার শিক্ষার্থীদের দেয়া হতো শারীরিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা৷ ২০০০ পুরুষ শিক্ষার্থী সেখানে প্রশিক্ষণ নিত৷ এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নাৎসি দলে ভালো পদ পেত৷ চার বছরের কার্যক্রম শেষ করে তারা দলের যোগ্য হতো৷ তবে এর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচ্য ছিল না৷ শিক্ষার্থীদের বয়স হতে হতো ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে৷ বিবাহিতদের অগ্রাধিকার দেয়া হতো৷ নাৎসি কর্মকর্তা রবার্ট লে এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা৷ ফোগেলসাং স্কুলের মূল কাজ ছিল সেখানকার শিক্ষার্থীদের অভিজাত ভাবতে শেখানো৷ তাদের বিশেষ পোশাক পরতে হতো, চার বছরের কার্যক্রম শেষে যখন তাদের পুরো জার্মানি সফরে পাঠানো হতো, তখন ভবিষ্যত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হতো তাদের৷

প্রদর্শনীতে যা দেখানো হচ্ছে

প্রদর্শনীতে মূলত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, কীভাবে নাৎসি আচরণ গণহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে৷ স্কুলের সেইসব প্রশিক্ষণার্থীর ছবি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে, যাদের চেহারা নিষ্পাপ, যাদের পরনে বিশেষ ইউনিফর্ম, তারা কাজ করছে, খেলছে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানকার প্রশিক্ষণার্থীরা সাধারণ সৈন্য হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেয়৷ এদের মধ্যে ৭০ ভাগই যুদ্ধে প্রাণ হারায়৷ অনেককে নৃশংস কিছু অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠানো হয়েছিল৷

সেখানে তারা ইহুদিদের জোর করে কষ্টকর কাজে বাধ্য করত৷ চালাতো ভয়াবহ নির্যাতন৷ এদের মধ্যে একজন প্রশিক্ষণার্থী ফ্রান্স ম্যুরের লিথুয়ানিয়ায় কয়েক হাজার ইহুদি হত্যার জন্য দায়ী৷ তাকে বলা হতো ‘ফিলনিয়াসের কসাই'৷

দর্শণার্থীদের প্রতিক্রিয়া

২০০৬ সালে ফোগেলসাং যখন সাধারণের জন্য খুলে দেয়া হলো, তখন অনেক মানুষ এটাকে সংরক্ষণের সমালোচনা করেছিল৷ গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্রমণ ও পর্যটন বিভাগের পরিচালক জন লেনন বলেছেন, যখন কয়েক দশক ধরে কোনো স্থান বন্ধ রাখা হয় এবং পরে তা খুলে দেয়া হয়, তখন এটির ইতিহাস বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়৷ ইহুদিরাও বলছেন, এ ধরনের স্থানগুলো খুলে দেয়ার চেয়ে যেসব স্থানে ইহুদিদের নির্যাতন করা হয়েছে, সেসব নির্যাতন কেন্দ্রগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার৷

নাৎসি এলাকাগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ

নাৎসি এলাকা হিসেবে ফোগেলসাং এর মতো এলাকাগুলোতে গত দুই দশক ধরে বিনিয়োগ বাড়ছে৷ প্রতি বছর সেখানে দর্শনার্থী বাড়ছে৷ জার্মানদের মধ্যে এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা হলো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তারা এ ধরনের এলাকাগুলো সংরক্ষণ করতে চাচ্ছে৷ কেননা এর আগ পর্যন্ত কনসেন্ট্রেশন বা নির্যাতন ক্যাম্পগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে বেশি নজর ছিল প্রশাসনের৷ সে সময় জার্মানির লক্ষ্য ছিল নাৎসিদের কাহিনি ইতিহাস থেকে সমূলে উৎপাটন করা৷ যেন সেই ভয়াবহ অতীত সবাই ভুলে যায়৷

প্রদর্শনীর প্রধান আয়োজক আক্সেল ড্রেকোল জানালেন, নতুন প্রজন্মের অনেকের মনে আগ্রহ জন্মেছে – কেন তাদের পিতামহ বা প্রতিপিতামহ হিটলারকে সমর্থন করেছিল৷ প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই মারা গেছেন, যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরাও আর বেশিদিন থাকবেন না৷ তাই জানা যাবে না আসলে কী ঘটেছিল৷ এই ছবিগুলো সেই গল্প বলবে৷

বাভেরিয়ার সরকার ওবারসালসব্যর্গ ডকুমেন্টেশন সেন্টারটিতে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে৷ তখন সারা বছরে ৩০ হাজার দর্শক হয়েছিল৷ অথচ গত বছর সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজারে৷ এ কারণে প্রশাসন প্রদর্শনীর স্থান দ্বিগুণ বড় করতে ১ কোটি ৭০ লাখ ইউরো খরচ করছে৷

নাৎসি নীপিড়ন যেন মানুষকে আকৃষ্ট করছে! বার্লিনে ২০১০ সালে টেরর মিউজিয়াম খুলে দেয়ার পর বর্তমানে সেটি শহরের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে৷ প্রতি বছর ১০ লাখ পর্যটক সেটি দেখতে আসেন৷ ন্যুরেমব্যুর্গে নাৎসি পার্টির যেসব ভবনের সামনে হিটলার ৫ লাখ মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই স্থানটি সংরক্ষণের জন্য এখন ৭ কোটি ৫০ লাখ ইউরো খরচ করা হচ্ছে৷ শহরটির মেয়র জানালেন, এটা কোনো পুনর্গঠন বা মেরামত নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম আসল ইতিহাস জানতে পারে৷

এটা কি ডার্ক টুরিজম?

নাৎসি এলাকাগুলো পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়টি সম্পর্কে প্রশাসন পুরোপুরি সচেতন বলে দাবি করা হয়েছৈ৷ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা জানেন যে এটা ডার্ক টুরিজমের দিকে যেতে পারে, অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম এতে আকৃষ্ট হতে পারে৷ তা জেনেই তারা সব স্থান ও ছবিকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন৷ তাই ফোগেলসাং-এ এসে কোনো নব্য নাৎসির সুখানুভূতি হবে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন