1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

মুক্তিযোদ্ধা আসল নকল

হারুন উর রশীদ স্বপন ঢাকা
১১ ডিসেম্বর ২০১৭

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি৷ গেজেটভুক্ত ৪৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ উঠেছে৷ আর দেড়লাখ নতুন আবেদন আছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য৷ এর শেষ কোথায়?

https://p.dw.com/p/2p6x7
Abdus Subhan
ছবি: Getty Images/MUNIR UZ ZAMAN

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাসের অনিল চক্রবর্তী ছিলেন তরতাজা যুবক৷ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনিল চক্রবর্তী ভারতের শিলিগুড়িতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেন৷ এরপর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ ৭নং সেক্টরে কমান্ডার বাগ-বাগিচা,আরঘাটা হাট ও রংপুর রেল স্টেশন এলাকায় পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন৷ ছিনিয়ে আনেন স্বাধীনতা, লাল-সবুজের পতাকা৷ সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা অনিল চক্রবর্তীর বয়স এখন ৬৬ বছর৷ রিকশা চালিয়ে কোনোভাবে জীবন ধারণ করছেন৷ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার মধ্যম গাছবাড়িয়ার ৫-৬ জনের সংসার আর তিনি টানতে পরছেন না৷ তবুও জীবন যতদিন আছে রিকশার প্যাডেল তো আর থামাতে পারবেন না৷

মুক্তিযোদ্ধার মানবেতর জীবন লিখে সার্চ ইঞ্জিন গুগলে সার্চ দেয়ার পর এর ওপর ৭১ হাজার ৫০০ লিংক পাওয়া যায়৷ সেই সব লিংকে আছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযুদ্ধ, অবহেলা, অপমান আর বঞ্চনার কথা৷ শুরুতে বর্ণনা করা মুক্তিযোদ্ধা অনিল চক্রবর্তীর জীবন কাহিনি তারই একটি৷ কিন্তু অনেকের কথা সংবাদমাধ্যমে হয়ত প্রকাশ হয় না৷ অনেকের ঘটনা আসে না আলোচনায়৷ আর আসলেই বা কী করে? তাতে কি অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা বদলাবে? 

A K M Mozammel Haq for dwAlaap - MP3-Stereo

এর বিপরীতে এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধরা আলোচনায়৷ আছে মুক্তিযোদ্ধার জাল সার্টিফিকেট৷ ২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছায় ১৫৪ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা শনাক্ত হয়৷ এ রকম আরো অনেক জেলা উপজেলায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ছাপা হয়৷ এ সম্স্ত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধরা সরকারি ভাতা ও সুবিধাও নিচ্ছেন৷ বিষয়টি নিয়ে খোদ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বিপাকে আছে৷ অর্থমন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার ওপর জোর দিয়েছে৷ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) সারাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা না পাঠালে তাঁদেরও সম্মানী ভাতা বা উৎসব ভাতা দেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়েছে৷ প্রসঙ্গত, এই তালিকা পাঠানোর কথা ছিল গত মে মাসের মধ্যে৷

গত ১২ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি করতে একটি গেজেট প্রকাশ করে৷ সারা দেশের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ৪৮৮টি উপজেলা এবং ৮টি মহানগর কমিটি কাজ শুরু করে ২১ জানুয়ারি৷ তালিকাভুক্ত ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের মধ্যে কারা ভুয়া এবং কাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, তার জন্য সারা দেশে কমিটি করা হয়৷ কিন্তু তাদের কাজ নিয়েও অভিযোগ ওঠে৷ অভিযোগ ওঠে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা এবং তালিকা থেকে বাদ দেয়ার৷ শতাধিক কমিটির সদস্যদের অভিযোগ ওঠার পর ৩৫টি উপজেলার ৪৫টি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়৷

সাত সদস্যের কমিটিতে প্রধান করা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে৷ বেশকিছু উপজেলার কমিটিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে রাখা হয়নি৷ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার এই অনিয়মের অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে রিট করা হলে হাইকোর্ট যাচাই-বাছাই স্থগিতের নির্দেশ দেয়৷ তারই প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই স্থগিত করে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)৷ তবে ১২ এপ্রিল উচ্চ আদালত এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে আবার যাচাই বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়৷ এ পর্যন্ত ৪৭০টি উপজেলার মধ্যে ৩৬০টি উপজেলার তালিকা চূড়ান্ত করা হলেও তাতে রয়েছে অনেক অসঙ্গতি এবং ভুল৷ আইনি জটিলতায় ১১০টি উপজেলার তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি৷ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হতে ইচ্ছুক প্রায় দেড় লাখ ব্যক্তির আবেদন এবং গেজেটভুক্ত ৪৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ওঠা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে৷

Fawzia Sultana for dwAlaap - MP3-Stereo

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অনেকক্ষেত্রেই সাক্ষীদের বর্ণনা এবং প্লাটুন কমান্ডার ও গ্রুপ কমান্ডারদের সঙ্গে চূড়ান্ত ‘মন্তব্য'-এর মিল নেই৷ আবার সাক্ষীসহ অন্যরা যে ব্যক্তির কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন, সেই ব্যক্তিকেই চূড়ান্ত ফলাফলে ‘মুক্তিযোদ্ধা নন' বলা হয়েছে৷ অধিকাংশ উপজেলা থেকে পাঠানো অসংখ্য প্রতিবেদনে আবেদনকারী ব্যক্তির নাম ও ঠিকানায়ও রয়েছে অসংখ্য ভুলত্রুটি৷

গত ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত জামুকায় ২৯ হাজার ৮০৭টি আপিল জমা পড়েছে৷ প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে৷ এ সব আপিল নিষ্পত্তিতে শিগগির কমিটি গঠনেরও কোনো উদ্যোগ নাই৷

প্রতিবেদনে অসঙ্গতি ও ভুলত্রুটি চ্যালেঞ্জ করে ইতিমধ্যে হাইকোর্টে কয়েকটি রিটও করেছেন অনেকে৷ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ ধরনের ১১৩টি রিট এখন হাইকোর্টে বিচারাধীন৷

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০০২ অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার ক্ষমতা জামুকার৷ এর আগে হাইকোর্টের নির্দেশে দু'বছর বন্ধ থাকার পর গত ২১শে জানুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হলেও তা আরেক দফা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে৷ শেষ পর্যন্ত তা কাটিয়ে এখনো যাচাই-বাছাই শেষ হয়নি৷ কবে হবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না৷

এদিকে স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি৷ ২০১৫ সালের অক্টোবরে সরকার গেজেটের মাধ্যমে ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে৷ এর পরের বছর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় আরো ২৩ জন বীরাঙ্গনাকে৷ কিন্তু আরো অনেক বীরাঙ্গনা এখানো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি৷ যাঁরা এতবছর পর স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাঁরা সরকারি কিছু ভাতা পান৷ কিন্তু অন্যরা কোনো ভাতা বা সরকারি সহায়তা পান না

চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বাবদ সর্বমোট বরাদ্দ করা হয়েছে ৫৫৩ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা৷ সারাদেশে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে সম্মানি ভাতার জন্য এই বরাদ্দ৷ তবে এই বরাদ্দপত্রের চিঠিতেও বলা হয়েছে যাচাই-বাছাইয়ে কেউ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে টাকা ফেরত দিতে হবে৷মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি তালিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে৷ ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা, লাল মক্তিবার্তা তালিকা এবং প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত সনদ৷ এর বাইরে অন্য কোনো গেজেটেভুক্ত মুক্তিযোদ্ধারা এখনো যাচাই-বাছাই সাপেক্ষ৷

Mosarraf Hossain Mosu for dwAlaap - MP3-Stereo

সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোশাররফ সোসেন মশু ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘যাচাই বাছাইয়ের নামে জামুকার কিছু কর্মকর্তা এখন তাদের ইচ্ছেমত তালিকা তৈরি শুরু করেছে৷ এখন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, তাই সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে চাইছে৷ এ নিয়ে মামলার পর মামলা হচ্ছে৷ ১১৩ উপজেলার তালিকা নিয়ে মামলা চলছে৷ প্রতি উপজেলায় এক হাজারেরও বেশি অভিযোগ পরেছে৷ অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধরা তালিকার বাইরে থাকছে৷''

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা: ২০১০ সালের ২৫ মার্চ যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়৷ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের দণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ শোধ করেছে, মোচন করেছে ইতিহাসের কলঙ্ক৷ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ৷ আর ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আনতর্জাতিক মাতৃভাষা৷

কিন্তু স্বাধীনতা যাঁরা এনেছেন, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এখনো অবহেলিত৷ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিবর্তে এখন যেন ‘জাল মুক্তিযোদ্ধাদের' দাপট৷ সরকার মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং পোষ্যদের চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা রেখেছে৷ কিন্তু সেই কোটা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কতটা পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে৷ ১১ নম্বর সেক্টরের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরুল হুদার কন্যা ফৌজিয়া সুলতানা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অনেকেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছেন না৷ আবার অনেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না হয়েও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট ব্যবহার করে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে৷ অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তো লেখাপড়াই করতে পারেননি৷ তাঁরা কীভাবে চাকরির সুবিধা নেবেন?''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বিভিন্ন সময় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশলে, রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন৷ কিন্তু অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হননি৷ অনেকে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন৷ বীর প্রতীক কাঁকন বিবিকে সিএমএইচ-এ ভর্তি করা হয়েছে অনেক লেখা-লেখির পর৷''

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যাচাই-বাছাইয়ে অনেক ভুয়া মুক্তিযেদ্ধা পাওয়া যাচ্ছে৷ কিন্তু মামলার পর মামলা হওয়ায় আমরা যাচাই-বাছাই শেষ করতে পরছি না৷ ১৬৬টা মামলা চলছে৷ সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও সম্মন পেতে অনেকেই এখন মুক্তিযোদ্ধা হতে চায়৷ আমরা তাদের বাদ দিচ্ছি৷ তালিকা চূড়ান্ত হলে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকবে না৷''

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘সরকার মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তান বা পোষ্যদের আরো সুযোগ-সুবিধা বাড়াবে৷ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার পুরো দায়িত্ব নেবে সরকার৷''

আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷