1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

বাংলাদেশের অদম্য নারীদের অগ্রযাত্রার আখ্যান

৮ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের নারীদের গল্প যেন একেকটি সংগ্রামের আখ্যান৷ তাদের কেউ পর্বত জয় করেছেন৷ কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে হয়েছেন সফল৷ কেউ টেনে তুলেছেন বিপর্যস্ত পরিবারকে৷ কেউ ঝুঁকি জেনেও বিনিয়োগ করে পেয়েছেন সাফল্য৷

https://p.dw.com/p/5A1IE
হিমালয় চূড়ায় পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার৷
বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার৷ছবি: Private

আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদ সচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন বাংলাদেশের নারীরা৷ সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীতেও সমানতালে অবদান রাখছেন তারা৷ বেসরকারি কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছেন অনেক নারী৷ আছে প্রতিকূলতা, আছে সামাজিক বাধা, কিন্তু সব ছাপিয়ে নিজ গুণে ভাস্বর হয়ে এগিয়ে চলেছেন নারী৷ পাহাড় থেকে সমতল সবখানেই নারীর অগ্রযাত্রা এখন চোখে পড়ার মতো৷

নিশাতের কাছে বাধার আইকন পাহাড়

বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করে নিজেকে চিনিয়েছেন নিশাত মজুমদার৷ এই পর্বতারোহীর কাছে পর্বত জয় করার অর্থ শুধু আক্ষরিক কিছু নয়৷ বরং তিনি এটিকে দেখছেন নারীর অগ্রযাত্রার একটি প্রতীকী রূপ হিসেবে৷

নিশাত বলেন, ‘‘আমরা নারীরা বাধা পেরিয়ে যেতে চাই, যাচ্ছি৷ আমার পাহাড় জয় আসলে পাহাড় জয় করা নয়, এটা বাধা জয় করা৷ পাহাড় আমার কাছে একটা সবচেয়ে বড় বাধার আইকন৷ আমি ওই বাধা পেরিয়ে যেতে চেয়েছি৷ আমার মনে হয়, বিধাতা আমার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে৷''

এই নারী পর্বতারোহী এখন স্বপ্ন দেখছেন, নারীরা যেন পাহাড়সম বাধা ডিঙিয়ে নিজ লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন৷

নিশাত মজুমদার
নিশাত বলেন, পাহাড় আমার কাছে একটা সবচেয়ে বড় বাধার আইকন৷ আমি ওই বাধা পেরিয়ে যেতে চেয়েছি৷ ছবি: Private

হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতক ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী নিশাত মজুমদার মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন ২০১২ সালে৷ কিন্তু পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানো বা পাহাড় আরোহণ করার নেশাটা শুরু হয়েছিল আরো আগেই৷ ২০০৩ সালের কথা৷ তখন তার দুরন্ত কৈশোরের সময়৷ পাহাড়ের প্রতি অনুভব করলেন তীব্র টান৷ সেই টান তাকে পর্বতারোহী বানিয়ে ছাড়ল৷ আর তখন থেকেই স্বপ্ন দেখছিলেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া জয়ের৷

তিনি বলেন, ‘‘আমরা পাঁচ জন মেয়ে একসঙ্গে হিমালয়ে গিয়েছিলাম৷ তখন কথা উঠেছিলো, শুধু নারীদের একটা দল কীভাবে হিমালয়ে যাবে৷ এটা কীভাবে সম্ভব! কিন্তু সবার কথা আর উদ্বেগকে উপেক্ষা করে আমি সফল হয়েছি৷''

নিশাত আরো বললেন, ‘‘আর হিমালয় জয়ের পর আমি মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমাকে স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করেছে৷ আরো অনেক নারীকে নিয়ে কাজ করতে সাহস জুগিয়েছে৷''

পাহাড়রের প্রতি ভালোবাসাটা আরো তীব্র হয়েছে নিশাতের৷ যেসব নারীরা পর্বত বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছেন, তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি৷ ২৫ জন তরুণীর একটি দল নিয়ে এখন কাজ করছেন তিনি৷

তিনি বলেন, ‘‘এই কাজে অর্থ একটি বড় বাধা৷ এর জন্য যেমন আছে খরচ, তেমনি নানা ধরনের সামাজিক বাধাও আছে৷''

তবুও এসব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি৷ অর্থের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন স্পন্সরের ওপর নির্ভর করতে হয় বলে জানালেন তিনি৷

নারীদের ভয়টা ভেঙে ফেলতে চান নিশাত৷ বলেন, ‘‘বাধা পেরোনোর জন্য সাহসী করতে চাই৷ আমি চাই, তারা পাহাড় সম বাধা যেন ডিঙাতে পারে৷''

পারিবারিক সহযোগিতার গুরুত্বটিও তুলে ধরলেন এই নারী পর্বতারোহী৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি সৌভাগ্যবান যে আমি এই কাজে আমার পরিবারকে সব সময় পাশে পেয়েছি৷ বিয়ের পর আমি আমার স্বামীর সহায়তা পাচ্ছি৷ আমার এখন তিন সন্তান৷ সব কিছুর পরও আমার কাজে কোনো সমস্যাই হচ্ছে না৷ কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এরকম হয় না৷ কিন্তু তারপরও তারা এগিয়ে যাচ্ছেন৷''

ইউটিউবে রান্নার ভিডিও বানিয়ে স্বাবলম্বী সোবানা সালভাকুমার

আরো বহুদূর যেতে চান নোপালী

একজন আদিবাসী নারী নোপালী চাম্বুগং৷ শৈশবেই পোলিও আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি৷ তাতেই অচল হয়ে পড়ে তার দু'টি পা৷ পড়াশোনাটা খুব একটা এগোয়নি৷ কোনোরকম প্রাথমিক পর্যন্ত শেষ করতে পেরেছেন৷

শৈশব থেকে জীবন সংগ্রাম শুরু হয় নোপালীর৷ তবে সময় এখন বদলছে৷ ময়মনসিংহ শহরেই আছেন৷ এখন তিনি আদিবাসীদের নানা ধরনের পোশাক, হাতের কাজের বিভিন্ন কিছু, শতরঞ্জি ও শৈল্পিক জিনিসপত্র তৈরি করেন৷ কাজ শিখতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণও দিচ্ছেন৷ তার তৈরি করা পণ্য এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে৷

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষা, কিংবা সমাজ—কোনো কিছুই তার জন্য বাধার দেয়াল তৈরি করতে পারেনি৷ নিজ যোগ্যতায় নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন নোপালী৷ পরিবারকেও সহায়তা করে চলেছেন৷

নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরে তার বাড়ি৷ শৈশবের দিনগুলো খুব একটা সুখকর ছিল না তার জন্য৷ চলৎ শক্তি হারালে, তাকে নিয়ে বিপাকে পড়েন তার পরিবারও৷

নোপালী বলেন, ‘‘গ্রামের লোক তখন আমাকে নিয়ে নানা কথা বলত৷ আমার ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়েও তারা নেতিবাচক কথা বলত৷ বলতে গেলে, আমার পরিবার আমাকে নিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে৷ তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি নিজের পায়ে দাঁড়াব৷ সেই থেকে আমার শুরু৷''

কাজ করছেন নোপালী চাম্বুগং
আদিবাসীদের নানা ধরনের পোশাক, শতরঞ্জি ও শৈল্পিক জিনিসপত্র তৈরি করেন নোপালী চাম্বুগং৷ তার তৈরি করা পণ্য এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে৷ছবি: Private

গ্রামের এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় তিনি ময়মনসিংহ শহরে চলে আসেন ২০০৪ সালে, একা৷ তখন তার বয়স ১৩-১৪ বছর৷ ‘প্রতিবন্ধী আত্ম উন্নয়ন সংস্থা' নামের একটি এনজিও থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন৷ তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি নোপালীকে৷ তার সঙ্গে আরো ২৫ জন নারী এখন কাজ করেন সরাসরি৷ এর বাইরে আরো ২৫০ জন নারীকে নানা ভাবে সহায়তা করছেন তিনি৷

বাড়ি ছেড়ে আসার সেই স্মৃতি আজো মনের কোণে দাগ কাটে তার৷ নোপালী চাম্বুগং আবেগি কণ্ঠে বলেন, ‘‘আমার পরিবার আমাকে ছাড়তে চাচ্ছিল না৷ কিন্তু আমি কী করব! আমার তো আর কোনো পথ ছিল না৷ মা-বাবা, বোনদের ছেড়ে আসতে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল৷ আমার ভবিষ্যৎ কী হবে তাও জানতাম না৷ শুধু জানতাম আমাকে বাঁচতে হলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে৷''

তিনি এখনও এনজিওর সহায়তা নিয়েই কাজ করেন৷ তার তৈরি পণ্যগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ দিয়ে কিনে নেয় এনজিও৷ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নোপালীর কাজের পরিধিও বাড়ছে৷

তিনি বলেন, ‘‘আমার এখন আর কোনো দুঃখ নেই৷ আমি নিজে কাজ করছি৷ অন্যদের কাজ দিচ্ছি৷ তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি৷ এতে আমার অনেক আনন্দ৷ আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি৷''

তার বাবা-মা এখন আর বেঁচে নেই৷ দুই বোনকে তিনিই পড়াশুনা করিয়েছেন৷ তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়৷ বড় বোনকে বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটিও নিজের কাঁধেই নিয়েছিলেন নোপালী৷

ছোট বোনকে পড়ালেখা করার সুযোগ করে দিয়েছেন, করেছেন উচ্চ শিক্ষিত৷ নোপালী বলেন, ‘‘আমি নিজে পড়াশুনার তেমন সুযোগ পাইনি৷ কিন্তু আমার ছোট বোনকে মাস্টার্স পাস করিয়েছি৷ এতে আমার গর্ব হয়৷''

৩৮ বছরের এই নারী এখনও বিয়ের পিঁড়িতে বসেননি৷ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘যাদের নিয়ে আমি কাজ করি তারাই আমার পরিবার৷ আমি তাদের নিয়ে আরো বহুদূর যেতে চাই৷''

ক্যামেরায় সাধারণ নারীদের অসাধারণ রূপ

হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে সফল অনুজা

পাবনার মেয়ে অনুজা সাহা এ্যানির গল্পটা অন্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন৷ শিক্ষক পরিবারের সন্তান অনুজা৷ আর বিয়ে হয়েছিল একটি ব্যবসায়ী পরিবারে৷ ভালোবেসেই জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছিলেন তিনি৷ সবকিছু ভালোই চলছিল৷ কিন্তু ব্যবসায়িক কাজে প্রতারণার শিকার হন তার স্বামী৷ ব্যবসা গুটিয়ে গেলে পুরো পরিবার পড়ে বিপর্যয়ের মুখে৷

কিন্তু ভেঙে না পড়ে, ঘুরে দাঁড়ানোর যুদ্ধটা শুরু করেন অনুজা৷ শুনে অবাক লাগলেও মাত্র এক হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন এই নারী৷ শুরুতে পিঠা বানিয়ে বিক্রি করতেন তিনি৷ সেখান থেকেই আজকের সফল উদ্যোক্তা৷ এখন তার রয়েছে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, বুটিক হাউজ৷ আছে ফুড সাপ্লাইয়ের ব্যবসা৷ পুরো পাবনায় ছড়িয়ে পড়েছে এই নারী উদ্যোক্তা ও তার পণ্যের সুনাম৷

অনুজা বলেন, ‘‘২০১৪ সালেই আমার স্বামীর ব্যবসা  শেষ হয়ে যায়৷ তখন যে আমি চাকরি খুঁজব সেই উপায়ও ছিল না৷ কারণ চাকরির আবেদন করতে ব্যাংক ড্রাফট-এর জন্য যে টাকা লাগে সেটা খরচ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থও আমার কাছে ছিল না৷ চারদিকে অন্ধকার দেখছিলাম৷ আর প্রেম করে বিয়ে করার কারণে বাবার পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন ছিলাম৷ তাদের কাছ থেকেও তাই সহায়তা চাইনি৷''

নিজ ঘরে অনুজা সাহা এ্যানি৷
মাত্র এক হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করা অনুজা আজ সফল নারী উদ্যোক্তা৷ছবি: Private

রান্নার হাত তার বরাবরই ভালো ছিল৷ সেলাইয়ের কাজটিও ছিল জানা৷ অবশেষে নিজের এক হাজার টাকা নিয়ে বাসায় বসেই একটি বিশেষ পিঠা তৈরি করেন৷ প্রতিবেশী একটি পরিবার অবশ্য তাকে এই কাজে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন৷ তারাই তাকে ওই পিঠা বিক্রিতে সহায়তাও করেছেন৷ প্রথম দিনেই দুধ, চিনি, নারকেল আর ময়দা দিয়ে বানানো নকশি পিঠা বেশ প্রশংসিত হয়৷ আর প্রথম মাসেই তার আয় হয় ১৭ হাজার টাকা৷

অনুজা বলেন, ‘‘এরপর পণ্যে বৈচিত্র্য আনি৷ নানা ধরনের পিঠা ছাড়াও আরো অনেক ফুড আইটেম বানাতে শুরু করি৷ অর্ডারও আসতে থাকে প্রচুর৷ নিজের সরবরাহ সিস্টেম গড়ে তুলি৷ ২০২১ সালে শহরে ‘মায়ের পরশ' নামে একটি খাদ্যপণ্যের দোকান খুলে ফেলি৷ এরমধ্যে বুটিকের কাজও শুরু করি৷ চালু করি বুটিক হাউজ ‘মন ময়ূরী'৷ আর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ডেলিভারি সার্ভিস অর্ণব অ্যান্ড কো৷''

শুরুতে পরিবারের কেইউ এই কাজে সহায়তা করেনি অনুজাকে৷ এমনকি, এমন ব্যবসার কারণে তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল তার মা৷

এই নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে এখন তার স্বামীও যুক্ত হয়েছেন৷ পূর্ণ সহযোগিতা দিচ্ছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও৷ তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন অন্তত ২৫ জন৷

তিনি বলেন, ‘‘আমি কম দামে বিরিয়ানি খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি৷ মাত্র ১০০ টাকায় আমি উন্নত মানের চিকেন বিরিয়ানি দিই৷ এর চাহিদা প্রচুর৷ আমার সব ধরনের পণ্যের সুখ্যাতি আছে৷ দেশের অন্য জেলায়ও আমি আমার ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি৷ আমি মানের সাথে আপস করি না৷ পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া তদারকি করি৷''

এই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে তিনি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, নিচ্ছেন ধারাবাহিকভাবে৷ আর কর্মচারীদের তিনি নিজেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন৷

ইসমতের সাফল্যে হাসনাহেনার মৌতাত

ঢাকার অদূরে পূবাইলে একটি রিসোর্ট ও শুটিং এবং পিকনিক স্পট পরিচালনা করছেন ইসমত আরা চৌধুরী৷ প্রতিষ্ঠানটির নাম দিয়েছেন হাসনাহেনা পিকনিক স্পট৷ পুরো প্রকল্পটি তিলে তিলে দাঁড় করিয়েছেন ইসমত৷

পরিবারের অন্য কোনো সদস্য এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন৷ তার সন্তানেরাও যে যার মতো ব্যস্ত৷ স্বামী অবসর জীবন-যাপন করছেন৷ কিন্তু ইসমত আরা চৌধুরীর কোনো অবসর নেই৷ সারাদিন তিনি তার রিসোর্ট নিয়েই ব্যস্ত থাকেন৷

শুরুটা কীভাবে হলো, সেই গল্পটা জানিয়েছেন ইসমত৷ তিনি বলেন, ‘‘আসলে আমার শ্বশুরের পূবাইলে অনেক আগে কেনা জমি ছিলো৷ সেখান থেকে ১৫ বিঘা জমি পান আমার স্বামী৷ কিন্তু ওই জমি বেদখল হয়ে গিয়েছিল৷ অন্যরা দখল করে নেয়৷ আর ওই জমি উদ্ধারের কোনো চেষ্টাও ছিলো না৷ ২০০৪ সালে আমি একরকম জোর করেই স্বামীকে ওই জমিতে নিয়ে যাই৷''

সেই থেকে শুরু হয় ইসমত আরা চৌধুরীর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প৷ নিজেই জমির কাগজপত্র জোগাড় করেন৷ স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন৷ জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নিয়েছেন৷ তারপর জমির দখল ফিরে পান৷

ইসমত বলেন, ‘‘আমি জমির দখল ধরে রাখতে স্থানীয়দের পরামর্শে ওই জমিতে দেয়াল দিয়ে একটি ছোট ঘর তৈরি করি৷ আমার খালু হলেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ৷ তিনি বললেন, তুই যদি আমাদের এখানে বড় একটি থাকার ঘর করে দিতে পারিস তাহলে এখানে আমরা নাটক করতে পাারি৷ সেই থেকে আমার শুরু৷''

হাসনাহেনা রিসোর্ট৷
ঢাকার পূূবাইলে ইসমত আরা চৌধুরীর তৈরি করা রিসোর্ট হাসনাহেনা৷ছবি: Private

২০০৮ সালে ব্যাংক থেকে নারী উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে রিসোর্ট পরিচালনা শুরু করেন তিনি৷ এরপর আরো বহুবার ঋণ নিয়েছেন৷ আগামীতেও আরো ঋণ নেওয়ার আগ্রহের কথাও জানালেন অকপটে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি ঠিক সময়ে ঋণ শোধ করে দিই৷ ফলে আমার ঋণ পেতে কোনো সমস্যা হয় না৷ আমাকে ব্যাংক ঋণ দেয়ার জন্য সব সময়ই প্রস্তুত থাকে৷''

রিসোর্টটিতে পাঁচতারা মানের সুইমিংপুল, বাংলো, খেলার মাঠ সবই আছে৷ সার্বক্ষণিক ১০ জন কর্মী কাজ করেন৷ আর কোনো ইভেন্ট, পিকনিক বা শুটিং ইউনিট-এর জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলসহ সব কিছুর ব্যবস্থা করেন তিনি৷ ফলে তার এই রিসোর্টকে কেন্দ্র করে আরো অনেকের কর্মসংস্থান সুযোগ তৈরি হয়েছে৷

অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ১৫ বছর শিক্ষকতার পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি এই রিসোর্ট ব্যবসা শুরু করেন৷ একজন সমাজসেবী হিসেবেও পরিচিতি আছে তার৷ তার রিসোর্টেই তিনি আয়োজন করেন চিকিৎসাসহ নানা ধরনের সেবামূলক কাজের৷ ফলে স্থানীয়দের সঙ্গে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে৷

ইসমত আরা চৌধুরী বলেন, ‘‘আমার পরিবারের কেউ আমার সঙ্গে এই ব্যবসায় না থাকলেও আমার বন্ধু-বান্ধব এবং স্থানীয়রা আমাকে অনেক সহায়তা করেন৷ নয়তো প্রতিদিন ঢাকা থেকে গিয়ে এই রিসোর্ট দাঁড় করানো সম্ভব ছিল না৷''

অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফের পুত্রবধূ ইসমত আরা চৌধুরী বলেন, ‘‘আমার শ্বশুরের সঙ্গে পাশাপাশি বাসায় আমি ১৫ বছর ছিলাম৷ তিনিই আমাকে দিয়েছেন নতুন জীবনবোধ আর সাহস৷ এটা আমার যে শুধু ব্যবসা তা নয়, মানুষের জন্য কাজ করারও একটি জায়গা৷ আমার বিনোদন৷''

পল্লী নারীর জীবিকা এখন ক্যামেরার লেন্সে

স্কিপ নেক্সট সেকশন এই বিষয়ে আরো তথ্য

এই বিষয়ে আরো তথ্য

আরো সংবাদ দেখান