পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাখাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও বিক্ষোভ-প্রতিবাদ
গত নয় বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক শিক্ষা-কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে। প্রতিবাদ হয়েছে। তদন্ত চলছে। আদালতে চলছে মামলা। সংবাদ শিরোনামে বেশি না এলেও এখনো চলছে শিক্ষাখাতকে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবিতে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ.....

২০১৬ সালে যা হয়েছিল
২০১৬ সালে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেয়া হয়। তারপর প্যানেল তৈরি করে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। অভিযোগ ওঠে, অনেক নিয়োগই বেআইনিভাবে হয়েছে, অযোগ্যরা বিপুল অর্থের বিনিময়ে চাকরি পেয়েছে। তারপর বিষয়টি নিয়ে মামলা হয়।
গ্রুপ ডি কর্মীর নিয়োগ নিয়েও কেলেঙ্কারি
২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশন(এসএসসি) সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে ১৩ হাজার গ্রুপ ডি কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়। প্যানেল তৈরি হয়। ২০১৯ সালে এই প্যানেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তারপরেও এই প্যানেল থেকে অন্তত ২৫ জনকে নিয়োগ করা হয়। আদালতে মামলা হয়। অভিযোগ করা হয়, ওই নিয়োগ বেআইনি।
সিবিআই তদন্তের নির্দেশ
২০২১ সালের নভেম্বরে কলকাতা হাইকোর্ট শিক্ষা কেলেঙ্কারি নিয়ে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকার তা ঠেকানোর জন্য আবেদন করে। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। ২০২২ থেকে শুরু হয় সিবিআই তদন্ত।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেপ্তার
২০২২ সালের ২৩ জুলাই সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করে সিবিআই। পার্থ চট্টোপাধ্যায় এখনো জেলে বন্দি। সম্প্রতি, তার শরীর খারাপ হয়েছে। আদালত তাকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করার নির্দেশ দিয়েছে।
গ্রেপ্তার অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়
পার্থর ঘনিষ্ঠ টলিউড অভিনেত্রী অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে ২১ কোটি টাকা উদ্ধার করে ইডি। এছাড়া এক কোটি ২০ লাখ টাকার গয়না উদ্ধার হয়। অর্পিতাকে গ্রেপ্তার করে ইডি। অর্পিতার আরেকটি বাড়ি থেকে ২৭ কোটি ৯০ লাখের ক্যাশ ও ছয় কেজি সোনা উদ্ধার হয়। অর্পিতা কিছুদিন আগে জামিন পেয়েছেন।
বিধায়ক, নেতা, প্রশাসক গ্রেপ্তার
২০২২ সালের অগাস্টে বিশেষ পরামর্শদাতা কমিটির আহ্বায়ক শান্তিপ্রসাদ সিনহাকে সিবিআই গ্রেপ্তার করে। এসএসসি-র সচিব অশোক সেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আরেক কর্মকর্তা কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়, সুবীরেশ ভট্টাচার্যকেকেও গ্রেপ্তার করা হয়। বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্যকে ইডি গ্রেপ্তার করে। সিবিআই আরেক বিধায়ক জীবন কৃষ্ণ সাহাকে গ্রেপ্তার করে। তাদের অনেকেই জামিন পেয়েছেন। উপরের ছবিটি মানিক ভট্টাচার্যের।
ওএমআর শিট কেলেঙ্কারি
নিয়োগ পরীক্ষা হয় ওএমআর(অপটিক্যাল মার্ক রিডার) শিটের মাধ্যমে। ফলে কম্পিউটার এই শিট পড়তে পারে এবং কোনোরকম কেলেঙ্কারি না হয়। কিন্তু ওএমআর শিটে কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়েও চাকরি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সিবিআই তদন্তে দেখা গেছে, ওমআর শিট পরে দল করা হয়েছে পরে আদালতে এসএসসি স্বীকার করে কিছু ক্ষেত্রে মার্কস মিলছে না।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগের জন্য টেট পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে অভিযোগ ওঠে, টেট পরীক্ষায় পাস না করলেও ৩১০ জনকে চাকরি দেয়া হয়েছিল। এর জন্য এজেন্ট, সাব এজেন্ট নিয়োগ করা হয়েছিল। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা চাকরি দিয়েছে বলে সিবিআইের অভিযোগ। ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত তারা সক্রিয় ছিল।
২৬ হাজার চাকরি বাতিলের রায়
২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয়, ২০১৬ সালে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদের চাকরি বাতিল করা হবে। কারণ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াতে জালিয়াতি হয়েছে।
মামলা সুপ্রিম কোর্টে
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানতে চেয়েছিল, এই ২৬ হাজারের মধ্যে থেকে যোগ্য ও অযোগ্য প্রার্থীদের আলাদা করা সম্ভব কিনা। এসএসসি জানিয়েছে, সম্ভব। সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেয়নি।
রাজ্যের তিন হাজারের বেশি স্কুলে পড়ুয়া নেই
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস (ইউডিআইএসই+)রিপোর্ট ফর দ্য অ্যাকাডেমিক ইয়ার ২০২৩-২০২৪ প্রকাশিত হয়েছে। সেই রিপোর্ট জানাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের তিন হাজার ২৫৪টি স্কুলে কোনো ছাত্রছাত্রী নেই। সেখানে শিক্ষক আছেন ১৪ হাজার ৬২৭ জন। ভারতে এরকম দুরবস্থা আর কোনও রাজ্যের নেই। আর একজন শিক্ষক আছে এমন স্কুলের সংখ্যা ৬৩৬৬।
বন্ধ হওয়ার মুখে
২০২১ সালে রাজ্যে ৬৪টি স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেছিলেন, ''বিভিন্ন স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সার্ভে করছি। কেন বন্ধ হচ্ছে, তা জানার চেষ্টা চলছে।'' ব্রাত্য বসু এই কথা বলার দুই বছর পর দেখা যাচ্ছে, রাজ্য়ে আরো কয়েক হাজার স্কুল বন্ধের মুখে।
ড্রপ আউটের সমস্যা
রাজ্য সরকারের দাবি, প্রাথমিক ও উত্ত প্রাথমিকে পশ্চিমবঙ্গে ড্রপ আউটের সংখ্যা শূন্য। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে ড্রপ আউটের হার ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
চাকরিপ্রার্থীদের প্রতিবাদ
মেয়ো রোডে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে এসএসসি চাকরিপ্রার্থীরা তিন বছরের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। এখনো সেই বিক্ষোভ চলছে। একসময় প্রচুর হবু শিক্ষককে সেই বিক্ষোভে দেখা যেত। এখন সংখ্যাটা কমলেও বিক্ষোভ জারি আছে।
অনেকগুলি মঞ্চে প্রতিবাদ
রানি রাসমণির মূর্তির কাছে দশটিরও বেশি প্রতিবাদমঞ্চ আছে। সেখানে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি, প্রাথমিক,. উচ্চপ্রাথমিকের চাকরিপ্রার্থীরা। এখানেও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ চলছে।
এসএফআইয়ের প্রতিবাদ
গত সোমবার বিধাননগরে শিক্ষা দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ দেখান বামপন্থি ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সদস্যরা। তারা শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর কাছে গিয়ে জানাতে চায়, শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে ব্রাত্য বসু শূন্য পেয়েছেন। কিন্তু পুলিশ তাদের উপর লাঠি চালায়। অন্তত ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাতে তাদের ছাড়া হয়।