পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন কবে হবে?
৬ মার্চ ২০২৬
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে অনেক বিতর্কের পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এখন পাঁচশ জন বিচারক নথি পরীক্ষা করছেন।
নথির নিষ্পত্তি কবে
বিচারকরা বিচারাধীন ভোটারদের নথি যাচাই করছেন। বিভিন্ন জেলার জেলাশাসকের দপ্তরে লম্বা লাইন পড়ছে ভোটারদের। নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, মনোনয়ন পর্বেও অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা যাবে। কিন্তু যে গতিতে বিচারকরা নথি যাচাই করতে পারছেন, সেই অনুযায়ী সব ভোটারের ক্ষেত্রে মীমাংসা হতে অনেক সময় লেগে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কমিশনের হিসেবে মোট বিবেচনাধীন ভোটার ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৬ লক্ষের কিছু বেশি ভোটারের স্ক্রুটিনি শেষ হয়েছে। ৫৪ লক্ষের মতো বিরোধের নিষ্পত্তি বাকি।
পাঁচশ জনের মতো বিচারক এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। এক জন বিচারক বহু ভোটারের নথি দেখেছেন। যদি কোনো জুডিশিয়াল অফিসার সপ্তাহে রোজই কাজ করেন, তা হলে বাকি ৫৪ লক্ষ ভোটারের নথি যাচাইয়ে সময় লাগবে তিন মাসেরও বেশি। কাজে গতি আনার জন্য কলকাতা হাইকোর্ট বিচারকদের ছুটি আপাতত বাতিল করেছে।
পুরো প্রক্রিয়ায় চলছে আদালতের নজরদারিতে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের সঙ্গে কমিশনের আধিকারিকদের বৈঠক হয়। এই বৈঠকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ভার্চুয়ালি যুক্ত করা হয়েছিল।
যাদের নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাদের সকলের নাম তালিকায় থাকবে এমনটা নয়। ছয় লক্ষের বেশি নথির নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও তার মধ্যে কতজনের নাম ভোটার তালিকায় থাকবে, সেটাও স্পষ্ট নয়।
যাদের নাম বিচারাধীন রয়েছে, তাদের নামের সঙ্গে 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' শব্দটি পোর্টালে দেখাচ্ছে। যাদের নথি নিষ্পত্তি হওয়ার পরে বিচারকরা সবুজ সঙ্কেত দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি সরে যাওয়ার কথা। এই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য শনিবার প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা থেকে মোট ২০০ বিচারককে আনা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী।
এই বিচারকদের এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় লাগানো হবে। বাড়তি লোকবলে কি সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশের কাজ দ্রুত শেষ করা যাবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আসছে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ
পশ্চিমবঙ্গে আসতে চলেছে ফুল বেঞ্চ। ৮ মার্চ রবিবার রাতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে ফুল বেঞ্চ রাজ্যে আসছে। সোম, মঙ্গলবার তারা পশ্চিমবঙ্গে থাকবেন। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন।
এরই মধ্যে রাজ্যে ২৪০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী চলে এসেছে। কলকাতা ও তার আশপাশের এলাকায় তারা টহল দিতে শুরু করেছে। ভোট ঘোষণার পরে ধাপে ধাপে আরো বাহিনী আসবে।
ধরনায় মমতা
কলকাতারধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে এসআইআর তালিকার বিরুদ্ধে শুক্রবার থেকে ধরনায় বসছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই বিষয়ে তৃণমূল বুধবার দুটি প্রচার ভিডিও সামনে এনেছিল। এই মেট্রো চ্যানেলে সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে অনশন কর্মসূচি করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী।
তালিকার জেরে মৃত্যু?
বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চলাকালীন অনেক বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলওর মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ ভোটার যারা কমিশনের নোটিসের মুখে পড়েছেন, তাদেরও অনেকে মারা যান। এই মৃত্যু এসআইআরের জন্য হয়েছে বলে তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছিল। একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে তালিকা প্রকাশের পরেও।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে বুধবার পর্যন্ত এমন আট জনের মৃত্যু হয়েছে যাদের নাম হয় বাদ পড়েছে বা বিচারাধীনের তালিকায় আছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আত্মঘাতী হচ্ছেন।
মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট পশ্চিমের বাসিন্দা, রফিক আলি গাজির গলায় ফাঁস লাগানো দেহ উদ্ধার হয়। তার নাম বিচারাধীন তালিকায় ছিল। রফিকের দেহ উস্তি মোড়ে রেখে পথ অবরোধ করা হয়। এ নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
একই সময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার কৃষ্ণ পাল। তার নাম ছিল ডিলিটেড তালিকায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙরে মৃত্যু হয়েছে প্রিয়াঙ্কা চট্টোপাধ্যায়ের। তার নামও বাদ পড়েছিল তালিকা থেকে। তৃণমূলের দাবি, এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী এসআইআর।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, তালিকা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আর শুধু কমিশনের উপরে নির্ভর করছে না। আদালতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, "নির্বাচন এখন আদালতের পর্যবেক্ষণে চলে গেছে, একে আর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে বলা যাচ্ছে না। সংবিধান অনুযায়ী ভোটার তালিকা তৈরির একক দায়িত্ব কমিশনের। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে জরুরি কাজটিতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।"
তার বক্তব্য, "গতবারের তুলনায় আমরা নির্বাচনের সময়সূচির থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছি। জনসংখ্যার তুলনায় ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় তালিকা রিভিশন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জটিলতায় ১৫ এপ্রিলের মধ্যে কাজ শুরু না হলে ৭ মে-র মধ্যে ভোট গণনা শেষ করা অসম্ভব। পরিস্থিতির যা অবস্থা, তাতে নির্বাচন আংশিক বা পুরোপুরি পিছিয়ে যেতে পারে।"
সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "রাজ্যের ৬১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিয়ে কোনোভাবেই নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ভোটার তালিকা থেকে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেয়া মানে মানচিত্র থেকে কাতার বা কুয়েতের মতো একটি গোটা দেশকে মুছে ফেলার সমান। তাই এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে নির্বাচন করা উচিত হবে না।"
তার বক্তব্য, "নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত ভোটার তালিকা আপডেট করা যাবে। এই প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বাইরে থেকে ৫০০ জন আধিকারিক নিয়োগ করা হচ্ছে। আশা করা যায়, আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে এবং তারপরেই ভোটের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।"
তিনি বলেন, "তালিকা সংশোধনের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে ভোট করানো যাবে না। কমিশন চাইলে এর মধ্যেই নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু ভোটার তালিকা পুরোপুরি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ভোট গ্রহণ শুরু করা ঠিক হবে না।"
আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য ডিডাব্লিউকে বলেন, "নির্বাচন করতে হলে একটি পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা তৈরি করা অপরিহার্য, কারণ ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন করে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। যাদের নাম ভোটার তালিকায় আছে, তাদের সকলকে নিয়েই ভোট করতে হবে। বিশাল সংখ্যক ভোটারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা গণতন্ত্রের প্রতি চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা।"
তার মতে, "নির্বাচন কমিশন একটি সঠিক ভোটার তালিকা পর্যন্ত তৈরি করতে পারছে না, যা বর্তমান সময়ে তাদের ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। পরিকল্পনাহীন ভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য তারা সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে।"