1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

নীতিনির্ধারণে নারী, মুসলিম, প্রান্তিকরা কবে গুরুত্ব পাবেন?

২৭ মার্চ ২০২৬

ভোটারদের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও তাদের প্রতিনিধিত্ব বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে কম। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এটা সত্য।

https://p.dw.com/p/5BDis
জম্মুতে একটি সভায় মুসলিম নারীরা।
পশ্চিমবঙ্গে নারী, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিকদের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা কম, বলছে সাম্প্রতিক রিপোর্ট। ছবি: Umar Farooq/ZUMA/picture alliance

সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্যে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বিধানসভার গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে গুরুত্ব পান না। 

কী বলছে রিপোর্ট

সম্প্রতি 'সবর ইনস্টিটিউট' নামে একটি সংস্থা এই গবেষণামূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভার ওপরে তৈরি রিপোর্টের নাম 'ডাইভার্সিটি অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেশন অফ সেভেনটিন্থ ওয়েস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি'।

সাবির আহমেদ এবং অশীন চক্রবর্তীর তৈরি এই রিপোর্টে চলতি বিধানসভার ৪২টি কমিটির গঠন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২১ সালে এই বিধানসভা গঠিত হয়েছিল, যার মেয়াদ আগামী মে মাসে শেষ হতে চলেছে। 

তথ্য জানার অধিকার আইন-এর মাধ্যমে তৈরি এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব বিধানসভার বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী কমিটিতে বেশ কম।  

রিপোর্টে পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মুসলমান হলেও বিধানসভার কমিটিতে তাদের উপস্থিতি অনেকটাই কম। বিভিন্ন কমিটির মোট সদস্য ২৫৬ জন। এদের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন অর্থাৎ ১৪.৮ শতাংশ মুসলমান। 'সংখ্যালঘু বিষয়ক কমিটি' বাদ দিলে এই সংখ্যাটা আরো কম। বাকি ৪১টি কমিটিতে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ১৪.৩ শতাংশ।

এমন কমিটি আছে যেখানে কোনো মুসলমান সদস্য নেই। অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ এবং স্কুলশিক্ষার মতো দু'টি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটিতে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যালঘু বিধায়কের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অনুপাতে কম। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচন হয় ২০২১ সালে। সেবারের হিসেব অনুযায়ী মুসলমান বিধায়কের সংখ্যা ১৫ শতাংশের কম। এরই প্রতিফলন দেখা যায় বিধানসভার বিভিন্ন কমিটিতে।

রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। রিপোর্ট বলছে, বিভিন্ন কমিটিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৩.৩ শতাংশ। মাত্র ৩৪ জন নারী বিধায়ক বিভিন্ন কমিটিতে আছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে নারী প্রতিনিধিদের ঠাঁই হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য, অর্থ, ভূমি, শিক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি। চারটি কমিটির প্রধান নারীরা। সংখ্যালঘুদের মতো নারীরাও জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক কম সংখ্যায় নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় এসেছেন।

মুসলমান বা নারী প্রতিনিধিদের তুলনায় ভালো অবস্থা তফসিলি জাতির বিধায়কদের। প্রায় ২৪ শতাংশ তাদের প্রতিনিধিত্ব বিধানসভার কমিটিতে। তফসিলি উপজাতিদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা পাঁচ শতাংশের নিচে। এমন ১৬টি কমিটি রয়েছে যেখানে এদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন 

প্রতি নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু, পিছিয়ে পড়া শ্রেণি থেকে নারীদের জন্য পৃথক প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তাদের প্রার্থী তালিকায় এসব সমাজের প্রতিনিধিতে উপস্থিতি কম লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে তারা নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় আসার সুযোগই পান না, যার প্রতিফলন দেখা যায় বিভিন্ন কমিটিতে।

প্রতীচী ট্রাস্টের গবেষক এবং এই রিপোর্ট তৈরির অন্যতম কুশীলব সাবির আহমেদ ডিডাব্লিউকে বলেন, "ক্ষমতার উৎস সব সময় উচ্চবিত্ত মানুষেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এর ফলে বিধানসভার মতো নীতিনির্ধারণী পরিসরে নারী, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব থাকে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নারীদের জন্য আলাদা শাখা থাকলেও নীতিনির্ধারণী কমিটিতে তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য। সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক মানুষেরাও দলের ভিতরে বা বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে পারেন না।"

তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'বর্তমানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কয়জন নারী নেত্রী রয়েছেন যারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন? বাম আমলেও এই চিত্র খুব একটা আলাদা ছিল না।"

সাবির 'পলিটিক্স অফ প্রেজেন্স'-এর ওপরে গুরুত্ব দেন। তার মতে, "কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের, যেমন পুরুলিয়ার জন্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প তৈরির সময় সেই অঞ্চলের প্রতিনিধিরা যদি কমিটিতে না থাকেন, তবে সেখানকার প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যায়। বিভিন্ন স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ না থাকলে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অনেক খামতি থেকে যায়, যা প্রকল্পের সফল রূপায়ণে বাধা সৃষ্টি করে।"

পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন বাম শাসন থাকলেও রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের প্রাধান্য বরাবরই রয়ে গিয়েছে। 

সাবির বলেন, 'সমাজে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের যে আধিপত্য ছিল তা আজও বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে 'ভট্টাচার্য'-র পরে 'বন্দ্যোপাধ্যায়' এসেছেন, কিন্তু কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার মতো উদার পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।"

'রাজনীতিতে দাপাদাপি উচ্চবর্ণের'

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মইদুল ইসলাম ডিডাব্লিউকে বলেন, "স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বরাবর উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকদের দাপাদাপি ছিল। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ এবং বৈদ্যরা রাজনীতির নেতৃত্বে থাকে দলীয় এবং প্রশাসনিক স্তরে। এই পরিসংখ্যান আবার প্রমাণ করল যে বঙ্গীয় রাজনীতিতে নীতি নির্ধারকরা এখনো বাঙালি ভদ্রসমাজ।"

​অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার ডিডাব্লিউকে বলেন, "ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের মানুষদের প্রাধান্য রয়ে গিয়েছে। বিধানসভার নীতি নির্ধারণ কমিটিগুলোতে মহিলা, সংখ্যালঘু এবং এসসি, এসটি শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব কম থাকায় নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এবারের বিধানসভা নির্বাচনে আপাতত যে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে একজনও মুসলমান নেই। তারা যদি ক্ষমতা দখল করে, তাহলে রাজ্যের বিধানসভায় এই সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকবে না, কমিটি তো দূর অস্ত।

শুধু মুসলমান নয়, হিন্দুদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তুলনায় উচ্চবর্ণের প্রাধান্য রাজনীতিতে প্রশ্নাতীত। সেই কারণে আর্থিক প্রতিপত্তির সঙ্গে রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাব তৈরির সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।

অভিরূপ বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির একটি বড় সমস্যা, এখানে সাহা ও দত্তদের 'বণিক সম্প্রদায়' বা ঐতিহ্যবাহী 'বিজনেস ক্লাস' সমাজে থাকলেও তারা সামাজিক কাঠামোর একদম ওপরের সারিতে নেই। দক্ষিণ ভারতের তুলনায় আমাদের এখানে এই ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সামাজিক প্রতিপত্তি বা প্রভাব অনেক কম। দক্ষিণে ব্যবসায়ী শ্রেণির সামাজিক প্রতিপত্তি ও শক্তিশালী অবস্থানের কারণেই অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়েছে। স্বাধীনতার আগে আমাদের রাজ্যে যে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী ছিল, দেশভাগের ফলে তাদের শক্তি অনেকটা কমে গেছে, যা রাজ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলেছে।"

তার মতে, "পিছিয়ে পড়া শ্রেণি বা সংখ্যালঘুদের সংখ্যাধিক্যের কারণে কোনো দলই তাদের উপেক্ষা করতে পারে না। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে ভোটের প্রয়োজনে নীতি নির্ধারকদের এই অংশগুলোর কথা ভাবতেই হয়।"

'শিক্ষার অভাব বড় কারণ'

পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক বিষয়ে গ্রন্থের রচয়িতা, সাবেক পুলিশকর্তা নজরুল ইসলাম
মূলত ঐতিহাসিক কারণ এবং শিক্ষার অভাবকে বর্তমান অনগ্রসরতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, "আমাদের দেশে একমাত্র উচ্চবর্ণের লোকেদের শিক্ষার অধিকার ছিল, নিম্নবর্ণের পুরুষেরও ছিল না, আর মেয়েদের তো একদমই ছিল না। ফলে নিম্নবর্ণের পুরুষরা এবং উচ্চবর্ণের মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল ঐতিহাসিক কারণে। এখন অধিকার পাওয়ার পর কিছুটা এগোচ্ছে কিন্তু তাদের সঙ্গে সমান এখনো হতে পারছে না।"

তিনি বলেন, "একই কারণ যে সাধারণত দুই-একজন উচ্চবর্ণের লোক মুসলমান হয়েছে বটে, কিন্তু নিম্নবর্ণের লোকেরাই বেশি মুসলমান হয়েছে। তারা আগেও পিছিয়ে ছিল, পরেও পিছিয়ে আছে। রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ভোটের জন্য সংখ্যালঘু প্রান্তিক ও নারীদের প্রার্থী করে।  তার মানে তারা যে সুদূরপ্রসারী ও গভীর উদ্দেশ্য নিয়ে এটা করে এরকমটা নয়।"

ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি পায়েল সামন্ত৷
পায়েল সামন্ত ডয়চে ভেলের কলকাতা প্রতিনিধি৷