1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

‘এবার হলে গ্রামের অধিকাংশ মানুষই চলে যাবে’

সমীর কুমার দে ঢাকা
১৩ নভেম্বর ২০১৮

নির্বাচন এলেই আতঙ্কে দিন কাটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের৷ যশোরের বিশ্বজিৎ কুমার সরকার ডয়চে ভেলেকে জানালেন অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা৷ আরো জানালেন এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশঙ্কার কথা৷

https://p.dw.com/p/380rm
ছবি: DW

ডয়চে ভেলে: আপনি কী করেন?

বিশ্বজিৎ কুমার সরকার: আমি টেইলারের কাজ করি৷ 

কোথায় থাকেন আপনি?

আমি যশোরের অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ায় থাকি৷

এখানে কত বছর ধরে আছেন?

আমার বয়স ৫০ বছর৷ আমি আমার জন্ম থেকেই এখানে আছি৷ আমার বাপ-দাদারা অনেক আগে থেকে এখানে আছেন৷ একাত্তরের আগে থেকে আমরা এখানে বসবাস করি৷ 

সামনে তো নির্বাচন আসছেন? কী ভাবছেন? ভোট দেবেন? 

অবশ্যই৷ আমরা বাংলাদেশের নাগরিক৷ আমাদের ভোট দেয়া তো কর্তব্য৷ গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটেছিল, সে কারণে মানুষের মধ্যে কিন্তু আতঙ্ক রয়ে গেছে৷ 

‘আমাদের আগে থেকেই বলছিল, ভোট দিতে যাবা না’

ভোটের আগে, ভোটের সময় বা ভোটের পরে আপনাদের কোনো সমস্যা হয়?

ভোটের আগে একটু সমস্যা হয়৷ আমরা সংখ্যালঘু৷ আমাদের উপর আক্রমণ হয়েই থাকে৷ নির্বাচনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের আক্রমণ আমাদের উপর হয়৷

কখনো কি আপনাদের উপর আক্রমণ হয়েছে?

গত নির্বাচনের সময় আমাদের উপর আক্রমণ হয়েছিল৷ সেটা সারা বিশ্ববাসী জানে৷ এর আগে আমাদের এখানে কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেনি৷ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জামাত-শিবির ও বিএনপির ভোট বানচাল কমিটি তখন আমাদের ওপর হামলা করে৷

কী  ঘটেছিল তখন? 

আমাদের আগে থেকেই বলছিল, ভোট দিতে যাবা না৷ তখন আমরা তাদের বলেছিলাম, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, কেন ভোট দিতে যাব না? ভোট দেয়া তো আমাদের অধিকার৷ আমরা কি সেই অধিকার দেখাতে পারব না?

কী ধরনের হামলা হয়েছিল আপনাদের উপর?

আমি আমার পাড়ার সবাইকে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছিলাম৷ প্রথমে ১৫/১৬ জন আমাদের পথের মধ্যে আটকায়৷ এবং আমার উপর আক্রমণ চালায়৷ তখন আমার সাথে থাকা আমার গ্রামের লোকজন তাদের প্রতিহত করে৷ এরপর বেলা ২টার দিকে তারা আবার আমাদের গ্রামের দুই দিক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে৷ তখনও আমাদের গ্রামের লোকজন তাদের প্রতিহত করে৷ ঠিক সন্ধ্যার একটু আগে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার' বলতে বলতে নসিমন ভরে ভরে বিপুল সংখ্যক লোক হাতে লাঠি-সোঁটা, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আমাদের পাড়ায় প্রবেশ করে৷ তাদের হাতে বোমা এবং ককটেলও ছিল৷ এটা অনেকেই দেখেছে৷ তখন আমাদের পাড়ার লোকজন সব বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আমাদের পাশেই ভৈরব নদী, সেই শীতের রাতেই ভৈরব নদী সাঁতরে পার হয়ে ওপারে গিয়ে আশ্রয় নেয়৷ এই দৃশ্য বর্ণনা করতে গেলে চোখে জল এসে যায়৷

কারা হামলা করে আপনাদের ওপর? 

আমাদের উপর (যারা) হামলা করেছিল (তাদের মধ্যে) জামাতের লোক ছিল বেশি৷ তখন আমাদের গ্রামের পাশেই জামাতের লোকজন পিকেটিং করছিল৷ তখন তো ওদের অনির্দিষ্টকালের হরতাল চলছিল৷ ওই হরতাল নিয়ে তারা পিকেটিং করছিল৷ জামাতের লোকজন তখন নসিমন ভরে ভরে আমাদের বাড়ি-ঘরে ঢুকে জ্বালিয়ে দেয় পুরো গ্রাম৷ মাছ ধরার জালগুলো পর্যন্ত পুড়িয়ে দেয়৷ ভাতের হাড়ি পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলে৷ স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের সার্টিফিকেট পর্যন্ত পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়৷ তখন তারা আশপাশের গ্রামেও গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, আমরা তাদের দু'জন লোককে মেরে ফেলেছি৷ এই খবর শুনে আশপাশের প্রচুর মানুষ এখানে চলে আসে এবং আমাদের উপর হামলা চালায়৷ 

আপনার বাড়িতে হামলা হয়েছে?

আমার বাড়িতে ওই দিনই হামলা হয়েছিল৷ আমার বৃদ্ধ বাবা ও মা বাড়িতে ছিলেন৷ তাঁদেরও মারধর করেছে৷ আমার বাবা তাদের পা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করেছিলেন৷ তারা আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে আমার টিভিটা নষ্ট করে দেয়৷ শুধু টিভি না, ঘরের সবকিছু নষ্ট করে দেয়৷ অনেক কিছুই নিয়ে যায়৷

তাদের কি কেউ বাধা দেয়নি? 

আমরা যেখানে বসবাস করি, সেখানে কিন্তু জামাত-বিএনপির লোকই বেশি৷ তাদের প্রভাবও বেশি৷ এখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি৷ আমরা শুধুমাত্র ১১০/১৫ ঘর হিন্দু মানুষ বসবাস করি৷ তখন তাদের ঠেকাতে কেউ আসেনি৷ আশপাশে অনেক মুরুব্বি আছেন৷ মেম্বার আছেন, চেয়ারম্যান আছেন, কিন্তু তাঁরা কেউ আমাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেননি৷ কেউ তাদের বাধা দেয়নি৷ কেউ বলেনি যে, তোমরা হামলা করো না৷ হয়তো মুরুব্বিরা কেউ এগিয়ে এসে তাদের বাধা দিলে এত বড় হামলার হতো না৷ 

পুলিশের ভূমিকা তখন কী ছিল?

আমি ওসি সাহেবকে ২২ বার ফোন করেছিলাম৷ তখন অভয়নগর থানার ওসি ছিলেন এমদাদ সাহেব৷ তাকে ২২ বার ফোন দেয়ার পরেও তিনি ফোনটাই ধরেননি৷ আমি চেয়ারম্যানকে অনেকবার ফোন দিয়েছি, তিনিও আমার কোনো ফোনই ধরেননি৷

ঘটনার পর কি আপনারা কোনো মামলা করেছেন?

হামলার পরপরই মামলা হয়েছিল৷ তখন আমি হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম৷ আমার গলা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল৷ আমি প্রচুর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলাম৷ আমি একেবারে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বেঁচে আছি৷ 

যে মামলা হয়েছিল সেই মামলায় কি কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে বা কোনো হামলাকারীর শাস্তি হয়েছে? 

মামলাগুলো এখনো চলছে৷ পুলিশ তখন কয়েকজনকে ধরেছিল, তাদের কেউ কেউ জামিনে ছাড়া পেয়েছে৷ তারা এখনো ঘোরাফেরা করছে৷

সামনে নির্বাচন নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

আমি যে গ্রামে বসবাস করি, এই গ্রামের সবাই এবার একমত যে, যদি পরিবেশ ভালো থাকে, তাহলে ভোট দিতে যাবো৷ আর যদি পরিবেশ খারাপ থাকে, তাহলে কেউ ভোট দিতে যাবো না৷ আবার ভোট দিতে গেলে যদি একই ধরনের হয়? মা-বোনদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু করে? সেটা তো আর মানা যাবে না৷ 

আপনাদের গ্রামে কতঘর সংখ্যালঘু পরিবার আছে?

আমাদের যে গ্রাম, সেটা হলো মালোপাড়া৷ আমরা সবাই জেলে৷ আমাদের এখানে ১১৫টি পরিবার আছে

আগে কতগুলো পরিবার ছিল?

আগে একটু কম ছিল৷ ৬০-৭০ ঘর ছিল, এখন পরিবার বেড়েছে৷ বেড়ে গেছে মানে, একই পরিবার থেকে ঘর ভেঙে অন্য পরিবার হয়েছে৷ আবার বাইরের কিছু লোকজন এখানে এসে আমাদের গ্রামে জায়গা কিনে ঘর করেছে৷ তারাও সবাই আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষ৷

এখান থেকে কি কেউ দেশ ছেড়েছে? 

হ্যাঁ৷ দেশ ছেড়েছে৷

তাঁরা কোথায় গেছেন?  

ভারতে গেছে৷ 

কেন গেছেন তাঁরা?

কী বলে আপনাকে বোঝাবো? যারা গেছে, তারা হয়ত ভেবেছে যে, এদেশে বসবাস করার মতন অবস্থা নাই, এখানে আমরা সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবো না৷ কিছু পরিবার আগে থেকেই চলে গেছে৷ কিছু পরিবার থাকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু থাকতে পারেনি৷ অনেকেই তো এখনো যাচ্ছে৷ প্রতিদিনই কিন্তু শত শত মানুষ চলে যাচ্ছে ভারতে৷ কেন যাচ্ছে? বিগত দিনগুলো আসলে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, নির্বাচন সামনে, নির্বাচন হলে তো আমরা আঘাতপ্রাপ্ত হই৷ 

বাংলাদেশ – উগ্র ইসলামপন্থার উত্থান

এবার কি নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কায় কেউ দেশ ছেড়েছে?

আমাদের এখান থেকে এখনো কেউ যায়নি৷ শুধু একটা পরিবার গেছে৷ তারা এখনো জায়গা জমি বিক্রি করেনি৷ তাদের যে বসত-ভিটা ছিল সে বাড়ি ফেলে রেখেই তারা চলে গেছেন৷ তারা কিন্তু এবারের এই নির্বাচনকে নিয়েই আতঙ্কে চলে গেছেন৷ কারণ, তারা নির্বাচন নিয়ে আতঙ্কে পড়েছিলেন৷ কারণ আবার নির্বাচন এসেছে, কী হবে কেউ জানে না৷

এখন যারা আছে, তাদের মধ্যে আতঙ্কটা কী ধরনের? 

একটা ভালো প্রশ্ন করেছেন৷ এবার যদি নির্বাচনে আবার সহিংসতা হয়, আমার পাড়ার অধিকাংশ লোক ভারতে চলে যাবে৷ কেউ ঠেকাতে পারবে না৷ বিগত নির্বাচনের সময় যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেটা একটা ন্যক্কারজনক ঘটনা৷ এমন ঘটনা ১৯৭১ সালেও ঘটেনি৷ পুরো গ্রামটাকেই নদী পার করে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়৷ এইটা কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে৷ সেই নির্বাচন আবার সামনে৷ এই নির্বাচনে যদি ওরকম ঘটনা ঘটে, তাহলে আমার পাড়ার বারো আনা মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাবে৷ 

সরকার বা দায়িত্বশীলদের কাছে আপনার চাওয়া কী? 

প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই চাওয়া, সেটা হলো একটা অসাম্প্রদায়িক দেশ৷ আমরা এখানে সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই৷ আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলব, এবার নির্বাচনে উনি যাঁদের মনোনয়ন দেবেন, তাঁরা যেন নির্যাতিত, নিপীড়িত সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ান, তাঁদের দেখভাল করেন৷ অন্তত এই বিষয়টা যেন প্রধানমন্ত্রী দেখেন৷

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷