1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান
রাজনীতিআফ্রিকা

আফ্রিকায় অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

প্রায় প্রতিটি আফ্রিকান দেশে ভাষা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে চীন৷ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মহাদেশজুড়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশলের অংশ এটি৷

https://p.dw.com/p/51CFr
তানজানিয়া দার এস সালাম, ২০২৫ | শাওলিন প্রশিক্ষক সাইদি এমফাউমের কুংফু স্কুল
তানজানিয়ায় এই মার্শাল আর্ট স্কুলের মতো নানা সাংস্কৃতিক ও ভাষা স্কুলের মাধ্যমে আফ্রিকা জুড়ে প্রভাব বিস্তার করছে চীনছবি: Emmanuel Herman/Xinhua/picture alliance

মিরাদি চেকপোর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন সত্যি হয়েছে৷ তিনি তার নিজ দেশ বেনিনে একটি চীনা ট্রেডিং কোম্পানিতে দোভাষীর চাকরি পেয়েছেন৷

ডিডাব্লিউকে চেকপো বলেন, ‘‘মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমি চীনা টিভি চ্যানেল দেখতাম এবং চীন ভ্রমণ করে সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার স্বপ্ন দেখতাম৷ তাই আমি চীনা ভাষা অধ্যয়ন করি ... এবং চীনা ভাষায় পেশাদার যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিন বছর ধরে কোর্সে অংশগ্রহণ করি৷''

স্কুল শেষ করার পর চেকপো বেনিনের আবোমি-ক্যালাভি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচারের জন্য সরকার পরিচালিত কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন৷ তার আশা, একদিন এটি তার বড় স্বপ্নের সূচনা হয়ে দাঁড়াবে৷

চেকপো বলেন, ‘‘বেনিন থেকে চীনে গ্রীষ্মমন্ডলীয় পণ্য এবং চীন থেকে বেনিনে পণ্য এনে আমি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাই৷''

‘মেড ইন চায়না', সফট পাওয়ার

আফ্রিকাজুড়ে উপস্থিতি সম্প্রসারণ করা চীনা সরকারের একটি লক্ষ্য৷ ২০০৪ সালে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেইজিং বিশ্বব্যাপী তার সংস্কৃতির সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিতে বেশ বড় বিনিয়োগ করে আসছে৷

আফ্রিকায় ৪৯টি দেশে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট কোর্স চালু করেছে৷

সাউথ আফ্রিকার সোল প্লাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী এবং প্রভাষক সিম্বারাশে গুকুরুমে বলেন, ‘‘আফ্রিকা মহাদেশে চীন তার সফট পাওয়ার সম্প্রসারণের অন্যতম উপায় হিসাবে কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও বিশেষ করে চীনা ভাষা শিক্ষার প্রসারকে মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে৷''

খুব কম প্রকৃত ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা

চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটে ম্যান্ডারিন শেখার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতাও রয়েছে৷ গুকুরুমে বলেন, বেইজিং আফ্রিকান শিক্ষার্থীদের অনেক বৃত্তি প্রদান করলেও চীনে তাদের জন্য চাকরি পাওয়ার সুযোগ একেবারেই কম৷

তিনি বলেন, ‘‘চীন সাধারণত প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে ভাষার ব্যবধান পূরণ করার জন্যই কেবল স্থানীয় ভাষাভাষীদের নিয়োগ করে৷ চীনা কোম্পানি এবং সরকারি সংস্থাগুলো মহাদেশজুড়ে বেশিরভাগ অবকাঠামো প্রকল্প- যেমন বন্দর, রাস্তা এবং বিমানবন্দর নির্মাণে চীনা কর্মীই নিয়োগ করে৷

গুকুরুমে বলেন, স্নাতক শেষ হওয়ার পর অনেক সাবেক শিক্ষার্থীকেই শেষ পর্যন্ত ম্যান্ডারিনের শিক্ষকের চাকরিই জোটে৷

তার মতে, ‘‘জিম্বাবুয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের প্রায় পুরো অনুষদ এবং কর্মীরা স্থানীয় শিক্ষাবিদদের নিয়েই গঠিত৷ তারা ম্যান্ডারিন পড়ান এবং চীনে তাদের পড়াশোনার জন্য কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন৷''

২০১৩ সালের প্রতিবেদন- আফ্রিকার মিডিয়া খাতে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন

মাও, হু এবং শি'র সাথে ভাষা শ্রেণীর মিশ্রণ

গুকুরুমে বলেন, এই ক্ষমতার পার্থক্যের আরও ভয়াবহ দিক রয়েছে৷ তিনি বলেন, ‘‘চীন এর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হয়, কারণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম সরকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এবং কখনও কখনও আফ্রিকান সম্পদে চীনের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে৷''

চীনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং আফ্রিকায় এর লিথিয়াম এবং কোবাল্ট খনির কাজ শেষ পর্যন্ত একই মুদ্রার দুটি দিক, বলেন গুকুরুমে৷

এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে অভিজাতদের মধ্যে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ প্রভাব নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে৷

সমাজবিজ্ঞানী গুকুরুমের মতে, ‘‘তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একাডেমিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে এবং শিক্ষার্থীদের চীনা রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা দেয় যা কর্তৃত্ববাদী বা অগণতান্ত্রিক হিসেবে দেখা যেতে পারে৷ এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে পরিচিত তরুণরা অগণতান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করবে৷''

গুকুরুমে বলেন, ‘‘ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা চীনের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক মূল্যবোধের আন্তঃসংযোগের উপর ভিত্তি করে তৈরি এজেন্ডার বড় একটি প্রমাণ৷''

পাকিস্তানে চীনা ভাষা শেখার আগ্রহ বাড়ছে কেন?

আফ্রিকায় চীনের প্রভাব দ্রুতগতিতে বাড়ছে

আফ্রিকায় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ১০টি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাউথ আফ্রিকা এখন আফ্রিকায় চীনের সফট পাওয়ারের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে৷

সাউথ আফ্রিকার বেসরকারি ভাষা স্কুলগুলোতে আগে দক্ষিণ অ্যামেরিকান এবং এশীয়দের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ইংরেজি ক্লাসের সুযোগ দিয়ে আকৃষ্ট করতো৷ এখন সেই জায়গা ধীরে ধীরে দখলে নিচ্ছে ম্যান্ডারিন৷

অনেক বেসরকারি স্কুল, এমনকি সাউথ আফ্রিকার কিছু সরকারি স্কুলও এখন বিদেশি ভাষা শিক্ষার কোর্সে ম্যান্ডারিন শেখার সুযোগ করে দেয়৷

এমনকি চার পাশে সাউথ আফ্রিকা পরিবেষ্টিত ২৪ লাখেরও কম জনসংখ্যার পার্বত্য দেশ লেসোথোতেও দুটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট রয়েছে৷

আফ্রিকার থিয়েটার, জাদুঘর, প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র শিল্প এবং নানা গণমাধ্যম এবং অনেক দেশের লাইব্রেরিতেও আরও বেশি বিনিয়োগ করছে চীন৷

আরো পড়ুন: আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী তুরস্ক

'প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি'

‘আফ্রিকায় চীনের প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি' শীর্ষক ২০২৩ সালের এক গবেষণায় গবেষক এভ্রিল জোফে চীনের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ধারণা তুলে ধরেন৷

জোহানেসবার্গের উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উইটস স্কুল অফ আর্টসের সাংস্কৃতিক নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান জোফে ডিডব্লিউকে জানান, তার গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকায় চীনের স্বার্থ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ের বাইরেও বিস্তৃত৷ তিনি বলেছেন, ‘‘আফ্রিকায় চীনের সফট পাওয়ার সম্প্রসারণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং বিষয়বস্তুকে দূরে ঠেলে দিতে পারে৷''

তার মতে, ‘‘এই প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমাতে, বিশেষ করে সুশীল সমাজ, শিল্পী, সৃজনশীল, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সঙ্গীতজ্ঞ এবং সরকারগুলোর কাছে আরও নানা লক্ষ্য সুপারিশ করা প্রয়োজন৷''

এ বিষয়ে তিনি চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া আফ্রিকান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন৷ ২০০৩ সালে এই সংখ্যা ছিল দুই হাজারেরও কম৷ ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ৮১ হাজারেরও বেশিতে দাঁড়িয়েছে৷

জোফে বলেন, আফ্রিকায় চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনও নিয়মকানুন নেই৷ তবে তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, ‘‘চীনের গণতন্ত্রবিরোধী আদর্শ এই সমস্ত বিনিয়োগের মধ্যে প্রভাব ফেলছে কিনা সে সম্পর্কে আমাদের এখনও স্পষ্টতা নেই৷''

‘‘এটি যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন,'' বলেন তিনি৷ তার মতে, চীনের একচেটিয়া অধিকার হ্রাস করার জন্য আফ্রিকান দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জাতীয় তহবিল এবং সাংস্কৃতিক বৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে৷

জোফে বলেন, আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো প্রাসঙ্গিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘একটি ঐক্যবদ্ধ নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা প্রতিটি আফ্রিকান দেশকে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা শক্তিশালী করতে এবং চীনের বিনিয়োগের ইতিবাচক প্রভাব বাড়াতে' সহায়তা করবে৷

মার্টিনা শিকোভস্কি/এডিকে/আরআর