৩৩ লাখ মামলা মানে ৩৩ লাখ এটিএম মেশিন | আলাপ | DW | 28.06.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

৩৩ লাখ মামলা মানে ৩৩ লাখ এটিএম মেশিন

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে যে কোন কিছু লিখতে গেলে ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর’ মর্মবাণীটাই সবার আগে মনে আসে। এক আইনজীবী বন্ধুর কথাও মনে পড়ে, আদালত ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাধীন এবং মহান যতক্ষণ আপনাকে এর দ্বারস্থ হতে না হচ্ছে।

শেষ আশ্রয়স্থলের ক্ষেত্রে তার খেয়ালি ব্যাখ্যাও প্রতীকী, কেননা সেই বন্ধু মনে করেন সাধারণের জন্য আদালতই শেষ আশ্রয়স্থল কেননা এখানে ঘুরতে ঘুরতে কবরে গিয়ে ক্ষান্ত হতে হয়। ন্যায়বিচার প্রার্থীরা এখানে পদে পদে হয়রানি হচ্ছেন, ঘাটে ঘাটে টাকা দিচ্ছেন। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না।

বিচারের যেহেতু দুটি পক্ষ থাকে তাই ন্যায় বিচার বিষয়টি আপেক্ষিক। যে কোন বিচারপ্রার্থীই রায় তার বিপক্ষে গেলে ন্যায়বিচার পাননি বলে অভিযোগ করতে পারেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা করেনও। তাহলে যখন বলছি ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ তখন বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আর বিশ্বাসে চির ধরানোর চেষ্টা করছি কিনা সেই প্রশ্ন আসতেই পারে। এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, আমার প্রশ্ন বিচার নিয়ে যতটা বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে তার চেয়ে বেশি।

ব্যবস্থায় যখন ক্রুটি থাকে তখন নানান অনিয়ম বিশৃঙ্খলা ডালপালা মেলতে থাকে। উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা পর্যন্ত কোন আদালতে গেলে মেরিটে  রিলিভ পাওয়া যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট মাথা ঘামান। যার অর্থ বিকল্প ব্যবস্থাও এখন যথেষ্ট জোরদার হয়েছে। জামিনের মতো বিষয় আগে থেকেই ওপেন সিক্রেট ছিলো। এখন শোনা যা্চ্ছে মামলার রায় পক্ষে এনে দেয়ার জন্য কেউ কেউ এজেন্সি খুলে বসেছেন।

বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রথমেই জানতে চাই মানুষ বিচার চাইতে নির্ভয়ে যেতে পারছে কি? আমার সরাসরি উত্তর, না। সাধারণ মানুষ যার কারো মাধ্যমে চেনা কারো রেফারেন্স নেই এমন মানুষের জন্য বিচার চাইতে যাওয়া কঠিন। হোক সেটা থানায় বা আদালতে । থানা থেকেই যে বিচারের প্রথম ধাপটা শুরু হয় সেটা বিচার নিয়ে কোন আলোচনায় তেমন গুরুত্ব পায় না। স্বভাবতই এর পর চলে আসে তদন্ত। আপনি আসামি হোন আর বাদি পুলিশকে সন্তুষ্ট না করে এখানে এক পাও এগোনো যায় না।

দু'টি উদারহণ দিলে হয়তো বুঝতে সুবিধা হবে। গাজীপুরে একজন বৃদ্ধকে তার আ্ত্মীয়রা জমি সংক্রান্ত বিরোধে আঘাত করে। পরে হাসপাতালে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। বৃদ্ধ পিতার হত্যা মামলার চার্জশিটের জন্য দুই মেয়েকে টাকা গুনতে হয়েছে। অন্যদিকে মামলার আসমিরা গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেটাও টাকার বিনিময়েই। গ্রহিতা কিন্তু একজনই। অন্য ঘটনাটি ঢাকায়। একটি গ্রিলের দোকানে ফ্যান লাগাতে গিয়ে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে দোকানের কর্মী নিহত হন। নিহতের আ্ত্মীয় স্বজনেরা দোকানের মালিককে বললেন, দুর্ঘটনা হয়েছে করার কিছু নেই, গরিব মানুষ কিছু টাকা পয়সা যদি দিয়ে দেন। দোকানের মালিক সাধ্যমতো লাখ দুই টাকা দিলেন। সঙ্গে দাফন কাফন পরিবহন সব বহন করলেন। কিন্তু বাধ সাধলো পুলিশ। রাতভর দোকানের মালিককে থানায় বসিয়ে রাখা হলো। তার বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই, কেউ অভিযোগও করেনি। তিনি থানায় এসেছিলেন অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়ে একটি মামলা করার জন্য্ যেটা হাসপাতালে জমা দিলে পাওয়া যাবে ডেথ সার্টিফিকেট। পরদিন দুপুরে লাখ টাকায় ছাড়া পেলেন মালিক। রাতভর আটকে রাখার মানে বোঝা গেলো তখন। কে হায় ঝামেলা বাড়াতে চায়!

এ দুটি ঘটনা বিরল নয়। যার বিরুদ্ধে  অভিযোগ নেই তার নাম চার্জশিটে দিতে কিংবা হত্যার পর অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেয়ার ঘটনাও তো আমাদের চারপাশে দেদার হচ্ছে। এতোক্ষণতো বলছিলাম সাধারণ ঘটনা। সাংবাদিকতার গণিত, রসায়ন এবং সংবাদ মূল্যের তুল্যমূল্য বিচারে যা সংবাদ হয়ে ওঠে না।

এবার একটু বিগ পিকচারের দিকে দৃষ্টি দেই। ফেনির কন্যা সাহসিকা নুসরাত জাহান রাফির কথা তো এখনো বিস্মৃত হওয়ার সময় হয়নি আমাদের। তাকে পরিকল্পিতভাবে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কি আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি? নুসরাত যদি নিজে হত্যা প্রচেষ্টার কথা বলে যাওয়ার আগেই মারা যেতো, তাহলে হয়তো নিছক একটি আত্মহত্যা হিসেবে অপমৃত্যুর মামলা সোনাগাজী থানার আস্তুাকুড়েই নিক্ষিপ্ত হতো। সারা দেশে তোলপাড় হতো না। ওসি মোয়াজ্জেম পালিয়ে না গিয়ে সোনাগাজী থানায় বহাল তবিয়তে থাকতেন। মৃত্যু দুয়ারে দাঁড়িয়ে নুসরাত আমাদের বিচার ব্যবস্থার বিরাট একটা সত্য জানিয়ে গেলেন। কিন্তু এ হত্যায় সম্পৃক্ততা দূরের কথা, আলাতম নষ্ট বা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অভিযোগ্ও আনা হয়নি ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। 

যে কোন ফৌজদারি মামলা সারাদেশে তোলপাড় হওয়ার পর এ স্থান হয় চাঞ্চল্যকার মামলার তালিকায়। চেষ্টা করা হয় দ্রুত চার্জশিট, সাক্ষ্য বিচার শুরুর। তারপর আমরা নতুন কোন ঘটনায় আচ্ছন্ন হই। নুসরাতের মতো আড়ালে ডেকে নিয়ে না। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে এবং সম্প্রচার মাধ্যমে কল্যাণে সারাদেশের মানুষের সামনে হত্যা করা হলো বিশ্বজিৎকে। সাত বছর পর এখনো হয়তো দৃশ্যটি আপনার সামনে ফিকে হয়নি। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই বিচারের কি হলো? এক বছরের মধ্যে বিচার আদালত ছাত্রলীগের ৮ নেতার মৃত্যুদণ্ড আর ১৩ জনের যাবজ্জীবন দিয়েছে। হাইকোর্ট বহাল রেখেছে দুই জনের মৃত্যুদণ্ড। চারজনের দণ্ড কমে যাবজ্জীবন। বাকি দুইজন খালাস পেলেন। যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ১৩ জনের ১১ জনই পলাতক। যে দুইজন আপিল করেছিলেন তারা খালাস পেয়েছেন। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বজিৎ হত্যার অভিযুক্ত ২১ জনের মধ্যে চার জন খালাস পেয়েছেন, ১১ জন পালিয়ে আছেন। বিশ্বজিতের পরিবারের হিসেবে হয়তো এখন অভিযুক্ত দুই জনের ফাসি আর চার জনের যাবজ্জীবন। আপিল বিভাগে কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকে তার অপেক্ষায় পরিবারটি।

২৬ জুন সকালে বরগুনায় দিনের আলোতে কুপিয়ে মারা হলো রিফাতকে৷ হত্যাকারীদের বিচার চাইছি আমরা, কেউ কেউ চাইছি ‘ক্রসফায়ার'৷ এই ঘটনার সামনে পেছনের কারণ হিসেবে অনেক কিছু বলা হচ্ছে কিন্তু আমরা যদি বলি বিচারের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা নেই তবে কি খুব বেশি বলা হবে?

বিচার ব্যবস্থার যে দীর্ঘসূত্রতা তা যেনো অমোঘ হিসেবে আমারা মেনে নিয়েছি। কিন্তু সেটা কত দীর্ঘ? বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার পেতে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তা আমাদের সবারই মোটামুটি জানা৷ আরো একটি  মামলার উদারহণ দিলে বুঝতে সুবিধা হয়। ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমানকে গুলশানে তাদের নিজ বাড়িতে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো। ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যানের মেয়ে শাজনীনকে হত্যার ১৯ বছর পর অভিযুক্ত শাহীদুলের ফাঁসি কার্যকর হয়। মামলার বাকী পাঁচ অভিযুক্তকে নিম্ন আদালত ফাঁসি দিলেও উচ্চ আদালতে আপিলে তারা খালাস পান। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, প্রথম আলো ডেইলি স্টারের মতো শীর্ষ সংবাদ মাধ্যমের মালিককে দুই দশক অপেক্ষা করতে হয়। সাধারণ মানুষের অপেক্ষার গণনা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়। আরো একটি তথ্য দেয়া দরকার একজন বাবা হিসেবে লতিফুর রহমান এ মামলার বিচারের জন্য একনিষ্ঠভাবে লেগেও ছিলেন।

মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা বিচার ব্যবস্থার কেউ অবশ্য অস্বীকার করছেন না। মামলা জটের পেছনে মামলার সংখ্যাকেই দায়ী করা হচ্ছে। আইন মন্ত্রী আনিসুল হক এ বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদকে জানান,  দেশে মামলার সংখ্যা এখন ৩৩ লাখ। এর মধ্যে ২৮ লাখ নিম্ন আদালতে। আর পাঁচ লাখ উচ্চ আদালতে। এসব মামলার সবই যে পক্ষগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তা কিন্তু না। ঘুমন্ত, সুপ্ত, তদবিরহীন মামলাও অযথা প্রকৃত বিচারপ্রার্থীদের পথ রোধ করছে। কিন্তু সেগুলোকে বিচারিক দৃষ্টি দিয়ে দেখে জঞ্জাল দূর করার কোন উদ্যোগ নেই।

Zahid Hossain,

জাহিদ হোসেন, সাংবাদিক

  

এ বছর ফেব্রুয়ারিতে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম এবং বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ ১০ বছরের বেশিদিন ধরে ঝুলে থাকা ফৌজদারি মামলা ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। নরসিংদীর একটি বাস ডাকাতির ঘটনায় মামলার আসামি আদালতে এসে নালিশ জানালেন গত ১২ বছরে মামলার একজন সাক্ষিও সাক্ষ্য দিতে আসেনি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আদালতে এই নির্দেশ। ভালো করলে খুঁজলে এমন মামলার সংখ্যা নেহাত কম পাওয়া যাবে না।

একটু হোমরা চোমরা, প্রভাবশালী মানুষ অন্যকে শায়েস্তা করার জন্য, নয়তো জমিজমা আত্মসাৎ বা দখলের মোক্ষম ও অব্যর্থ ঔষধ হিসেবে মামলার প্রয়োগ করে থাকেন। তবে এসব মামলায় অভিযোগকারির তৎপরতা মামলা দায়ের এবং প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি পর্যন্তই বহাল থাকে। স্বার্থ উদ্ধার হওয়ার পর তারা নজর দেন নতুন কোন মামলায়। কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় এ ধরনের মামলাগুলোই তৈরি করছে জট। সুষ্ঠু তদারকি এবং ন্যায় বিচারের অভাবে মিথ্যা মামলা করে মামলাবাজরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। মামলা জট কমানোর কার্যকর কোন উদ্যাগ কখনোই দেখা যায় না।

কেননা আপনার আমার কাছে ৩৩ লাখ একটি সংখ্যা কিন্তু কারো কারো হিসাবে তা ৩৩ লাখ এটিম মেশিন।

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন