১২ বছরের পদোন্নতি পেতে লেগেছে ৩৬ বছর | আলাপ | DW | 23.04.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

১২ বছরের পদোন্নতি পেতে লেগেছে ৩৬ বছর

বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কেমন আছেন? কী সংকট তাঁদের? ডয়চে ভেলের মুখোমুখি ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আব্দুল মান্নান৷

ডয়চে ভেলে: ফায়ার সার্ভিসে বর্তমানে লোকবল কত?

আব্দুল মান্নান: বর্তমানে লোকবল আছে ৭ হাজারের কিছু বেশি৷ বর্তমান সরকার, বিশেষ করে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই জনবল ২৫ হাজারে উন্নীত করার নির্দেশ দিয়েছেন৷ সেই হিসেবে নিয়োগ চলছে৷ এখনো বেশ কিছু সদস্য প্রশিক্ষণে আছেন৷ আরো কয়েকটি নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে৷

দেশে সবগুলো উপজেলাতে কি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন আছে?

আমাদের ১৫৬টি প্রকল্পে কাজ চলছে৷ এই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের সবগুলো উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন হবে৷ আগেও অনেক উপজেলায় ছিল৷ নতুন প্রকল্পে কোনো উপজেলা বাদ যাবে না৷ এখন দু'টি উপজেলা বাকি আছে৷ জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এগুলো এখনো হয়নি৷ তবে প্রকল্প শেষের আগে সবগুলো উপজেলাতেই ফায়ার সার্ভিস স্টেশন হয়ে যাবে৷

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের পদোন্নতি হয় কীভাবে? সঠিক সময়ে পদোন্নতি হচ্ছে কি?

এখানে স্বল্প সময়ে পদোন্নতির সুযোগ নেই৷ এখানে স্টেশন অফিসার হিসেবে রিক্রুট হয়৷ সেখান থেকে পদোন্নতি পেতে পেতে পরিচালক পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব৷ প্রতি ধাপে দুই বছর-তিন বছর করে সময় দেওয়া আছে৷ এই ধাপগুলো পার হয়ে আসতে সময় ততটা থাকে না৷ আমার দৃষ্টান্ত দিয়েই বলি, ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি স্টেশন অফিসার হিসেবে যোগদান করি৷ স্টেশন অফিসার থেকে ওয়্যার হাউজ অফিসার হতে আমার ১৫ বছর সময় লেগেছে৷ আমার অধিকাংশ সময়, বা যদি বলি, সরকারকে কাজ দেওয়ার যে সময়, সেটা স্টেশন অফিসার হিসেবেই কেটে গেছে৷ এই এক বছর আগে আমি ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছি৷ আর ছয় মাস আমার চাকরি আছে৷ উপরের পদে এসে যখন অভিজ্ঞ হলাম, তখন আমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে৷ সঠিক সময়ে যদি আমি পদোন্নতি পেতাম, তাহলে ১২ বছরেই আমার উপ-পরিচালক হওয়ার কথা৷ সেখানে আমার সময় লেগেছে ৩৬ বছর৷

বিভাগীয় পদোন্নতি পেয়ে কোন পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব?

আমরা উপ-পরিচালক পর্যন্ত আসতে পারি৷ আমাদের সহকারী পরিচালক হলো ফার্স্ট ক্লাস৷ সহকারী পরিচালক হলে পরবর্তী ১০ বছর লাগে পরের স্কেল পেতে৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সহকারী পরিচালক হতে যে সময় লাগে, তারপর আর ১০ বছর চাকরির বয়সই থাকে না৷ তার আগেই আমাদের অবসরে চলে যেতে হচ্ছে৷ ফলে কেউ পদোন্নতি পেলেও তিনি আর স্কেল পাচ্ছেন না৷ বিদায়ের আগে শুধু সম্মানটুকু নিয়ে চলে যেতে হচ্ছে৷ আর্থিক কোনো সুবিধা মিলছে না৷

ফায়ার সার্ভিসের বাৎসরিক বাজেট কত? সেটা কি পর্যাপ্ত?

বাজেটটা আসলে অধিদপ্তর থেকে দেখে৷ যতটা বাজেট থাকে তা দিয়েই আমরা সরঞ্জাম কিনি৷ বাজেট যত বাড়বে জিনিসপত্র কেনার তত সুযোগ থাকবে৷ বাজেট আরো বাড়ানোর জন্য আমি অনুরোধ করব৷

অডিও শুনুন 14:13

‘অনুরোধ করব, সরকার যেন ফায়ার সার্ভিসের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়’

আগুন নিয়ন্ত্রণে যেসব যন্ত্রপাতি আছে, সেগুলো কি পর্যাপ্ত?

এই সরকারের সময় কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে৷ কিছু গাড়ি কেনা হয়েছে৷ যেমন ধরেন, ১৮ তলার যে মই সেগুলো কেনা হয়েছে৷ এখন ঢাকায় দু'টি আর চট্টগ্রামে একটি এমন মই আছে৷ এছাড়াও বেশ কিছু নতুন যন্ত্রপাতি পেয়েছি৷ এভাবে সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি আমাদের হয়ে যাবে

খুবই প্রয়োজন, কিন্তু চেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন যন্ত্রপাতি কি আছে?

যেমন ধরেন ১৮ তলা ল্যাডার-এর দু'টি আছে ঢাকা আর চট্টগ্রামে৷ কিন্তু এর বাইরে রাজশাহী, খুলনাসহ বড় শহরগুলোতেও উচু ভবন রয়েছে৷ ওই সব জায়গায় আগুন লাগলে তো নেভানো মুশকিল৷ সেখানে আমাদের ছ'তলা পর্যন্ত মই আছে৷ সেই মই দিয়ে তো আর উঁচু ভবনের আগুন নেভানো যাবে না৷

ঢাকায় এগুলো কতটা আছে?

বড় আছে দু'টি আর ছোট আছে কয়েকটা৷

তাহলে ঢাকা শহরে একই সময়ে একাধিক ভবনে যদি আগুন লাগে তাহলে তো নেভানো মুশকিল হয়ে যাবে, তাই না?

আসলেই কঠিন হয়ে যাবে৷ এ কারণেই সরকার সদয় হয়েছে৷ আমাদের লোকবল বাড়ানো হচ্ছে৷ নতুন নতুন যন্ত্রপাতিও কেনা হচ্ছে৷

আপনাদের বেতন কাঠামোতে কি কর্মীরা সন্তুষ্ট?

আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না৷ মাস দু'য়েক আগেও পুলিশের সৈনিকদের চেয়ে আমাদের সৈনিকদের বেতন বেসিক ২০০ টাকা কম ছিল৷ অথচ এক সময় আমাদের সৈনিকদের বেতন পুলিশের সৈনিকদের চেয়ে বেশি ছিল৷ তাঁরা সময়ের সাথে সাথে কর্মীদের বেতন বাড়াতে পারলেও আমাদের এখানে হয়নি৷ তবে দু'মাস আগে এটা সমান করা হয়েছে৷

ঝুঁকি ভাতা কেমন আছে?

ঝুঁকি ভাতা বিশেষ পদ পর্যন্ত পাই৷ সৈনিক থেকে সহকারী পরিচালক পর্যন্ত পাই৷ চাকরির বয়স অনুযায়ী এটা ভাগ করা আছে৷

মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তাদেরও তো আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে নামতে হয়?

আগুন যখন লাগে, তখন অফিসার বা সৈনিক বলে কোনো কথা নেই৷ তখন সবাই ফায়ার ফাইটার৷ এটা কেরানিও হতে পারে, উচ্চ শ্রেণির কর্মকর্তাও হতে পারেন৷

অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে মেলালে আপনাদের প্রতিষ্ঠানে বেতন ঘাটতি কেমন?

সরকার সুদৃষ্টি দিলে এই ঘাটতি থাকবে না৷ আমি অনুরোধ করব, সরকার যেন ফায়ার সার্ভিসের প্রতি সুদৃষ্টি দেয়৷

আপনাদের কর্মীদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ আছে?

আগে এতটা ছিল না, এখন বেড়েছে৷ আগামীকালও একটি টিম প্রশিক্ষণ নিতে চীন যাচ্ছে৷ গতকাল আরেকটা টিম প্রশিক্ষণ নিতে ইংল্যান্ড গেছে৷

অনেক সময়ই অভিযোগ ওঠে, ফায়ার সার্ভিস গাফিলতি করেছে, যে কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হয়েছে৷ কেন এমন অভিযোগ ওঠে?

এই অভিযোগটা আমি ওভাবে মেনে নেবো না৷ বিষয়টা এমন – কোথাও আগুন লাগলে সবাই চায় জীবন বাঁচাতে এবং সম্পদ বাঁচাতে৷ যেমন ধরুন, এক্স-কে বলল ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিতে৷ সে কি ফোন দিলো, না নিজেই জীবন বাঁচাতে ছুটছে? কেউ ফোন না দিলে তো আমরা জানতে পারি না৷ মেসেজ পাওয়ার পর আমরা ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বের হয়ে যাই৷ কিন্তু রাস্তার কথা তো আপনাকে বলতে হবে না৷ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা কাজ শুরু করলাম৷ কিন্তু আমরা দুই হাজার বা পাঁচ হাজার লিটার পানি নিয়ে যাচ্ছি, যা ২ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়৷ সেখানে কিন্তু আমরা পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছি না৷ আবার ধরেন বস্তিতে আগুন, কেউ দখল করতে আগুন দিয়েছে, তারা চাচ্ছে আমরা যেন সেখানে না পৌঁছাতে পারি, আবার যারা ক্ষতিগ্রস্থ তারা চাচ্ছে আমরা যাতে দ্রুত আগুন নেভাই৷ আরেকপক্ষ সেল্ফি তুলতে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে৷

সার্বিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের মূল সমস্যা কোথায়?

আমাদের আসলে তেমন বড় কোনো সমস্যা নেই৷ জনবল বাড়ানো হলে, যন্ত্রপাতি দেওয়া হলে, আমরা আরো ভালো কাজ করতে পারব৷

ফায়ার কর্মীদের কেউ দায়িত্ব পালনের সময় মারা গেলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কেমন?

সরকারি আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাই৷ আমাদের একটা কল্যাণ ট্রাস্ট আছে৷ চার বছর আগে এটা হয়েছে৷ সেখানে প্রধানমন্ত্রী ২০ কোটি টাকা দিয়েছেন৷ একটা কল্যাণ তহবিলও আছে৷ রাজশাহীতে কিছুদিন আগে যিনি মারা গেলেন, তাঁকে আমাদের ট্রাস্ট থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে৷

নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচান – এটা কি কেবলি চাকরি, না মানবিক দায়বদ্ধতা?

শেষ প্রশ্নটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন করেছেন৷ মানবিক দায়বদ্ধতা আমি বলতে পারি না৷ আমার যদি এখানে চাকরির সুযোগ না হতো, তাহলে আমি এই চিন্তা করতাম না৷ আসলে আমার চাকরি তো আছে, যে বেতন দিয়ে আমার পরিবারের ভরণপোষণ হচ্ছে৷ তারপরও আমার জন্য একটা বিশেষ সুযোগ, যেটা অন্য চাকরিতে নেই৷ মানুষের সেবা করার৷ সেটা অভ্যাসবশতই বলেন, আর মন থেকেই বলেন, এই সেবাটা কিন্তু আমরা করে যাচ্ছি৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন