হুমায়ূন আহমেদের ‘কর্কট′ কাল | আলাপ | DW | 28.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

হুমায়ূন আহমেদের ‘কর্কট' কাল

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ক্যানসার যেদিন ধরা পড়লো, সেদিনটির কথা কিছুতেই ভুলতে পারেন না তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন৷ সেদিনের প্রতিটি ঘটনা এখনো তাঁর স্মৃতিতে অমলিন৷ জেনে নিন তাঁর জবানিতে...

১.

হুমায়ূন আহমেদের যখন কর্কট রোগ ধরা পড়ল, তখন প্রথম কয়েক মুহূর্ত আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না৷ ৫/৭ মিনিটের মধ্যে আমার পৃথিবীটা দুলে উঠল৷ মনে হলো, ভূমিকম্প চলছে৷ পায়ের তলা থেকে মাটিগুলো কোথায় যেন সরে যেতে লাগল৷ হুমায়ূন খুব বেশি রকমের স্বাভাবিক ছিলেন৷ সঙ্গে থাকা এক বন্ধুর সাথে হালকা রসিকতাও করলেন৷ আমি উঠে চলে এলাম রুমের বাইরে৷ ‘‘এত মানুষ কেন এখানে?'' এই কথাটিই মনে হলো প্রথমে৷ কারণ, আমি যে একটু একা থাকতে চাইছিলাম তখন!

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মেডিকেল স্যুটগুলো বিভিন্ন দেশের রোগীতে ঠাসা৷ প্রত্যেকেই হয়তো কোনো-না-কোনো শারীরিক-মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন৷ কিন্তু আমার আশেপাশের প্রতিটি মানুষকে অসহনীয় মনে হতে থাকল৷ একটু আড়ালের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলাম আমি৷ মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের স্যুটের ঠিক পাশেই একটা বাথরুম৷ রেনোভেশনের কাজ চলছিল হয়তো৷ তাই বাইরে থেকে ‘নো এন্ট্রি' সাইন ঝোলানো৷ আমি সাইন অমান্য করে বাথরুমটায় ঢুকে পড়লাম৷ ব্যস৷ এখন আমি একা৷ আমাকে এখন আর স্বাভাবিক থাকার ভান করতে হবে না৷ ভাবতে হবে না আমি ভেঙে পড়লে চলবে কী করে! নিজের শরীরের ভারটাও যেন আর বইতে পারছিলাম না৷ আমি মেঝেতে বসে পড়লাম৷ হাত পা ছড়িয়ে বিলাপ করে উঠলাম৷ বিশ্বাস করুন, সেই মুহূর্তে ঐ বিলাপটার খুব প্রয়োজন ছিল আমার৷

একটু আগে ডাক্তারের রুম থেকে শোনা শব্দগুলো তখনো কানে বাজছে আমার– ‘‘এক্ষুনি চিকিৎসা শুরু করলে এবং তোমার শরীর তা ঠিকঠাকমতো গ্রহণ করতে পারলে আরো ১/২ বছর বাঁচিয়ে রাখব তোমাকে৷'' কী স্পষ্ট, সহজ কথা তাঁর! জীবনটা কি তাহলে সিনেমার মতোই! ঐ যে বিভিন্ন সিনেমায় দেখতাম বেঁচে থাকার সময় বেঁধে দেয়া হচ্ছে!

নির্বাচিত প্রতিবেদন

আমি পাকা অ্যাকাউন্টেন্টের মতো হিসাব করে ফেললাম৷ আমার ছোট ছেলে নিনিত হুমায়ূনের বয়স তখন এক বছর এক দিন৷ ‘মা' ছাড়া আর কোনো শব্দ বলতে পারে না– বাবা ছাড়া দুনিয়ার কিছুই বুঝতে চায় না৷ বড়জন সবেমাত্র চার পেরিয়েছে৷ ২ বছর পর কী হবে? আমার ছোট্ট নিনিত কি কিছু মনে করতে পারবে! আমার বড় ব্যাটা নিষাদ কি এই কষ্ট ভুলতে পারবে! কতটুকুনই বা তারা দু'জন! আচ্ছা এমন কি হতে পারে না যে, হিসাবে একটু ভুল হয়ে গেছে? হয়তো দেখা যাবে রিপোর্টে একটু ভুল ছিল! কিংবা ক্যানসার হয়তোবা এখনো প্রথম স্তরেই আছে! চিকিৎসায় ভালো থাকার সম্ভাবনা কি তখন কিছুটা বেড়ে যেতে পারে না! আরও ১০ টা বছর! অন্তত ৫ টা বছর! 

আমি চোখ-মুখ মুছে হুমায়ূনের কাছে ফিরে গেলাম৷ হুমায়ূন আমাকে দেখে হাসলেন৷ তারপর তাঁর স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি নিয়ে বলে উঠলেন, ‘‘দেখো দেখি কুসুম! মানুষের কত ভালো ভালো জায়গায় ক্যানসার হয়, অথচ আমার হলো কিনা মলাশয়ে!''

আমি ফ্যাকাশে ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করলাম৷ ওদিকে ক্যানসারের স্টেজ জানার জন্য কোলনোস্কোপি করবার জন্য শিডিউল করা হচ্ছে৷ আমার আর হুমায়ূনের সাথে আছেন হুমায়ূনের আরেক আপনজন, সিঙ্গাপুর প্রবাসী লেখক শহিদ হোসেন খোকন৷ আরো ছিলেন ঐ হাসপাতালের একজন বাঙালি কর্মী হাসান৷ তাঁরা দুজনও কেমন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমরা কেউ কোনো কথা বলতে পারছিলাম না৷ এমনকি একজন অন্যজনের মুখের দিকে তাকাতেও পারছিলাম না৷

হুমায়ূন আস্তে করে একবার বললেন, ‘‘বাসায় একটা ফোন করে বাচ্চা দুইটার খবর নাও৷'' আমি তখনও চুপচাপ বসে আছি৷ একটু পরে হুমায়ূন আবার বললেন ‘‘তোমার মা'কে এখনই কিছু জানাবার দরকার নাই৷ বেচারা মাত্র দুইদিন আগে পায়ের প্রোসিডিওর করে আসছেন, হাঁটতেই পারেন না৷ এই অবস্থায় উনাকে স্ট্রেস দিও না৷'' আমি তখনো আরেকদিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছি৷ মাত্র কয়েক মিনিটের এই অপেক্ষার সময়টা কাটতেই চাচ্ছিল না; অনন্তকাল ধরে যেন আমরা সেখানে বসে আছি৷ একটু থেমে হুমায়ূন খোকন ভাইকে বললেন, ‘‘শাহিনকে (হুমায়ূনের সবচেয়ে ছোট ভাই) বলবো আম্মাকে খবরটা জানাতে৷ আমি আম্মাকে কিছু বলতেই পারব না৷''

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে হুমায়ূন গেলেন গাছের দোকানে৷ নুহাশপল্লীর জন্য কিছু গাছ কিনলেন৷ তখনো যথেষ্ট শক্ত ছিলেন তিনি৷ সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া করা ফ্ল্যাটটাতে ফিরে বিকালের নাস্তা করলেন৷ সারাটা সন্ধ্যা ইন্টারনেট ঘেঁটে ক্যানসার আর তার চিকিৎসার ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়লেন, সঙ্গে ছিলেন আমার বাবা আর মা৷ আমার বাবা হুমায়ূনের সামনে স্বাভাবিক থাকার বৃথা চেষ্টা করছেন৷ আমার মা দুই হাতে মুখ চেপে ধরে বোবা কান্না কাঁদছেন৷ রাতের খাবারের পর হুমায়ূন হুট করে আমার বাবার হাত দু'টো ধরে ফেললেন৷ ভেজা কণ্ঠে বাবাকে বললেন, ‘‘আপনাকে কোনোদিন কিছু বলে ডাকি নাই৷ আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমার বাচ্চাদুইটাকে আপনি মানুষ করতে পারবেন না, বাবা?''

সবার মিলিত সিদ্ধান্তে চিকিৎসা শুরুর সিদ্ধান্ত হলো অ্যামেরিকায়৷ বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা ক্যানসার হাসপাতালের তালিকায় থাকা প্রথম কয়েকটিই অ্যামেরিকায়৷ আমরা ততক্ষণে বেশ কয়েকটি হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখে ফেলেছি৷ অ্যাপয়েনমেন্ট নেয়ার জন্য কী করতে হবে সেগুলোও দেখছি৷ আমাদের সঙ্গে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আরো ছিল কবি ওয়াহিদ রেজা বাপ্পি৷ সে এসেছিল তার মায়ের কিডনি চিকিৎসার জন্য৷ কিন্তু হুমায়ূনের খবর শোনার পর থেকে আঠার মতো আমাদের সাথে লেগে ছিল৷ শহীদ হোসেন খোকন ভাইয়ের পরিবার দায়িত্ব নিয়েছেন এসব আলাপ-আলোচনা থেকে বাচ্চা দু'টোকে দূরে রাখার৷ ওদের তিনি বাড়িতে নিয়ে গেলেন সাথে করে৷ ঢাকা থেকে আপনজনদের ফোন আসছে একের পর এক৷ হুমায়ূন প্রতিটা ফোন ধরছেন আর রসিকতা করে বলছেন, ‘‘শুনেছো নিশ্চয়, আমি তো শেষ... আর মাত্র ৬ মাস আছি৷ তাড়াতাড়ি আমার সাথে কয়েকটা ছবি তুলে ফেলো, পরে তো আর পাবে না৷ আর আমার মৃত্যুর পর শোকসভায় কী বলবে তা-ও ঠিক করে ফেলো৷ হাতে বেশি সময় নাই৷''

আমার চোখের সামনে ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং হাসপাতালের ওয়েবসাইট৷ ওখানে লেখা, এই হাসপাতালটি ২০১১ সালের শ্রেষ্ঠ ক্যানসার হাসপাতালের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে৷ আমি হুমায়ূনকে সে কথা জানাতেই তিনি আগ্রহ নিয়ে পুরো ওয়েবসাইটটা ঘেঁটে দেখলেন৷ বাপ্পিও দেখলাম হাসপাতালটির রিভিউ দেখে খুবই উত্তেজিত৷ ঠিক করা হলো যদি অ্যাপয়েনমেন্ট পাওয়া যায় তবে আমরা এই হাসপাতালেই চিকিৎসা করাবো৷

Meher Afroz Shaon

মেহের আফরোজ শাওন, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী

বলে ফেললাম তো পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা নেবো৷ কিন্তু চাইলেই কি তা সম্ভব! শুরু হলো আমাদের আরেক যুদ্ধ৷ মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াই দেখলাম দুস্কর! কমপক্ষে ২/৩ মাস আগে থেকে চেষ্টা করতে হয়, তারপর রোগীর ফাইল দেখে প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সময়ে তাঁকে ডাকা হয়৷ সে এক লম্বা প্রক্রিয়া!

আমাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে এলেন মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে গবেষণার কাজে প্রায় ৯/১০ বছর কর্মরত থেকে অবসর নেয়া ফার্মাসিস্ট ডঃ পূরবী বসু৷ তাঁর চেষ্টায় ৭ দিনের মধ্যে পাওয়া গেল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট৷ এত সব প্রক্রিয়ার পর যখন হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন তাদের বিল পরিশোধের নিয়মাবলী শুনে মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের৷ সম্ভাব্য বিলের পুরোটাই অগ্রিম জমা নিয়ে নেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ৷ এই ব্যবস্থা আবার শুধুমাত্র বিদেশি রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ আসলে তৃতীয় বিশ্বের কিছু রোগী বিল পরিশোধ না করে পালিয়ে যাবার পর এই নিয়ম করতে বাধ্য হয়েছেন কর্তৃপক্ষ৷ নিয়ম অনুযায়ী টাকা অগ্রিম করে যদি চিকিৎসা নিতে হয় হুমায়ূনের, তবে প্রথম ধাক্কায়ই তাকে জমা দিতে হবে প্রায় ৫০ হাজার ইউএস ডলার!

কীভাবে সেসব কিছুর সমাধান হলো সে আরেক বিশাল উপাখ্যান! কর্কট রোগে আক্রান্ত পরিবারের যুদ্ধ শুধুমাত্র রোগটির সাথে যুদ্ধ নয়, প্রতি মুহূর্তে দ্বিগুণ হারে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার কোষগুলির সঙ্গেই নয়... এই যুদ্ধ পুরো পৃথিবীর সাথে– এ যুদ্ধ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার পরও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার যুদ্ধ... হোঁচট খেয়ে উঠে দাঁড়ানোর জন্য যুদ্ধ...৷

আহারে হুমায়ূন যদি তাঁর স্বপ্নের ক্যানসার হাসপাতালটি শুরু করে যেতে পারতেন! আমাদের আরো অনেকের যুদ্ধটা একটু হলেও সহজ হতো৷

 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন