হিরোশিমায় পরমাণু বোমার ৮০ বছর, শিক্ষা নিয়েছে বিশ্ব?
৬ আগস্ট ২০২৫
এর পর থেকে এই বোমার ভয়াবহতাকে তুলে ধরে পরমাণু বোমা নিষ্ক্রিয়করণের দাবি উঠে আসছে বিশ্বব্যাপী। তবে ৮০ বছর পরেও এখনও বিশ্ব বারবারই মুখোমুখি হয় আরেকটি পরমাণু যুদ্ধের।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, সকাল ৮:১৫ মিনিট। ঠিক ৮০ বছর আগে এই মুহূর্তেই আকাশ থেকে নেমে এসেছিল মৃত্যু। মার্কিন যুদ্ধবিমান 'এনোলা গে' থেকে নিক্ষিপ্ত "লিটল বয়" নামের পারমাণবিক বোমা মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল জাপানের একটি আস্ত শহর, লাখো মানুষের স্বপ্ন আর আশা।
৮০ বছর পর বুধবার সেই একই সময়ে হিরোশিমার মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল নীরব প্রার্থনায়—শুধু নিহতদের স্মরণে নয়, বরং একটি জরুরি সতর্কবার্তা দিতে।
আজকের পৃথিবীতে যখন পারমাণবিক অস্ত্র আবার রাজনীতির কেন্দ্রে, যখন মহাশক্তিগুলো নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন হিরোশিমার এই দিনটি কেবল ইতিহাসের একটি পাতা নয়—বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি জরুরি সতর্কতা৷
যে শহর হয়ে উঠেছিল বিশ্বের বিবেক
হিরোশিমার শান্তি স্মৃতি উদ্যানে ভোর থেকেই ভিড়৷ স্মৃতিস্তম্ভের সামনে শত শত সরকারি কর্মকর্তা, ছাত্রছাত্রী এবং বোমা বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
পটভূমিতে দেখা যাচ্ছিল গেনবাকু ডোমের ধ্বংসাবশেষ - বোমা বিস্ফোরণের এলাকায় একমাত্র যে স্থাপনাটি টিকে ছিল, তা আজও সেই ভয়াবহতার নির্মম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মানুষ কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে? আর সেই ধ্বংসের পথ থেকে কি আমরা ফিরে এসেছি?
হিরোশিমার মেয়র কাজুমি মাৎসুই-এর কণ্ঠে আজ যে উদ্বেগ, তা কেবল একজন স্থানীয় নেতার নয়। তিনি "বিশ্বজুড়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা"র বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, "এই ঘটনাগুলো ইতিহাসের ট্র্যাজেডি থেকে আন্তর্জাতিক সমাজের যে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল, তা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করছে।"
প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা বলেছেন, "পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেওয়া জাপানের মিশন।" কিন্তু এই দায়িত্ব কি কেবল জাপানের? নাকি প্রতিটি দেশের, প্রতিটি নেতার, প্রতিটি মানুষের?
সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট, "লিটল বয়" নামের বোমাটি হিরোশিমার ওপর বিস্ফোরিত হওয়ার মুহূর্তেই তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৩০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শহরের তিন ভাগের দুই ভাগ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা যান। দুই দিন পর জাপানের আরেক শহর নাগাসাকিতে আরেকটি পরমাণু বোমা ফেলা হয়। সেখানে মারা যান আরো ৭৪ হাজার মানুষ।
১৫ আগস্ট তৎকালীন জাপান সাম্রাজ্য আত্মসমর্পণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। জাপানে এই হামলাই যুদ্ধকালীন সময়ে এখন পর্যন্ত পারমাণবিক বোমার একমাত্র ব্যবহার।
কিন্তু বোমার পরবর্তী প্রভাব ছিল আরো ভয়ঙ্কর। তেজস্ক্রিয়তার কারণে দশকের পর দশক ধরে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, জন্ম নিয়েছে বিকলাঙ্গ শিশুরা। ক্যান্সার, লিউকেমিয়া—মৃত্যুর এই মিছিল আজও শেষ হয়নি।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক হিরোশিমার বার্তা?
বর্তমানে নয়টি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরাইল। আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের ভূমিকা দেখলেই বোঝা যায়, হিরোশিমার সেই শিক্ষা কতটা ভুলে গেছে মানুষ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুটিন বারবার পরমাণু বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। উত্তর কোরিয়া পরীক্ষা করছে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র। চীন বাড়াচ্ছে তার পারমাণবিক সক্ষমতা।
স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখন ১২ হাজারেরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর ৯০ শতাংশই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এই অস্ত্রগুলো এখন কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং আক্রমণে ব্যবহারের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
আশার আলো, নাকি অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাওয়া?
সিপ্রির গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, "আমরা এখন মানব ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক সময়ে আছি। অতল গহ্বরের দিকে এগিয়ে চলেছি।"
হিরোশিমার শান্তি উদ্যানে যে কয়েক ডজন সাদা ঘুঘু আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হলো, সেগুলো কি সত্যিই শান্তির বার্তা নিয়ে যাবে? নাকি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র?
যুক্তরাষ্ট্র আজও এই বোমা হামলার জন্য সরকারিভাবে ক্ষমা চায়নি। তবে প্রায় ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিও এই স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
প্রশ্নটা আজ কেবল হিরোশিমার নয়, পুরো বিশ্বের। যেদিন মানুষ প্রথম দেখেছিল পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা, সেই দিনের শিক্ষা কি আমরা ভুলে গেছি? নাকি আবারও সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চলেছি?
এসএসজি/এডিকে