হাসপাতাল গড়তে সরকারি সাহায্য পাননি, ক্ষোভ সুবাসিনীর | বিশ্ব | DW | 07.02.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

হাসপাতাল গড়তে সরকারি সাহায্য পাননি, ক্ষোভ সুবাসিনীর

বিনা চিকিৎসায় স্বামী সাধন মিস্ত্রির মারা যাওয়ার যন্ত্রণা থেকে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, তার পূর্ণতা এক হাসপাতাল তৈরিতে৷ কলকাতার হাঁসপুকুরের হিউম্যানিটি হাসপাতালের রূপকার পদ্মশ্রী সুবাসিনী মিস্ত্রির মুখোমুখি ডয়চে ভেলে৷

বিভিন্ন স্থানে সম্মাননা বা পুরস্কার নেওয়া এখন তাঁর রোজকার রুটিনে পড়ে৷ সেখানে সহজভাবে বলেও দেন, ‘‘আমি গাড়ির নাম্বার জানি নে, ঘড়ি দেখতেও জানি নে, এমনকি ক-খ-ও জানি নে৷'' আপাত নিরীহ, শান্ত মানুষটির চোখে দুরন্ত স্বপ্ন৷ তাই বয়সের ভার তাঁকে টলাতে পারেনি৷ সুবাসিনীর (সুহাসিনী বা সুভাষিণী নয়) জীবন যেন রূপকথা কিংবা রুপোলি পর্দার গল্প৷ 

আঁচল পেতে ভিক্ষে করে, মাটি কেটে, সবজি বিক্রি করে পয়সা জমিয়ে তিনি আজ একটা আস্ত হাসপাতালের নির্মাতা৷ কত কষ্টে সংসার টেনেছেন৷ সুবাসিনীর ভাষায়, ‘‘ছেলে-মেয়েদের খেতে দিতে পারিনি৷ ছোট ছেলে বাড়িতে বাড়িতে ভৃত্যের কাজ করেছে৷ ছোট মেয়ের একটাই জামা ছিল৷ সেটা কেচে গায়েই শুকোতে হতো৷ অনাথ আশ্রমে দিয়ে দিয়েছি ওদের৷''

আজও সেই অতীত তাড়া করে বেড়ায় তাঁকে৷ ছোটবেলায় অপুষ্টিতে ভোগা বড় ছেলে মারা গেছেন এক বছর আগে৷ এত  প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করেছেন৷ এই লড়াই নিয়ে তাঁর স্বপ্নের নামই হিউম্যানিটি হাসপাতাল৷

অডিও শুনুন 04:37
এখন লাইভ
04:37 মিনিট

‘একটা সময় ছিল যখন ছেলে-মেয়েদের খেতে দিতেও পারিনি’

সেই হাসপাতালে প্রতিদিন নিয়ম করে তাঁর হাজিরা দেওয়া চাই-ই৷ সকাল শুরু হতে না হতেই হাসপাতালে চলে আসেন৷ দিনভর ডুবে থাকেন কাজে৷

নিছকই কি একটা হাসপাতাল, এটা যেন তাঁরই পরিবার৷ নিজেই রোগীদের পথ্য জোটাতে বাজারের থলে হাতে বেরিয়ে পড়েন৷ অসুস্থ শুগারের রোগীটি কী খাবেন, সেটাও ভেবেচিন্তে কিনে আনেন৷ কিংবা ব্যথায় কাতর অসুস্থ রোগীর মাথায় হাত বুলিয়ে তাঁকে শুশ্রূষা করাটাই তাঁর কাজের তালিকায় পড়ে৷ এহেন সুবাসিনীর কাজে যে উদ্যম, তাঁর কথাতেও সে উদ্যম পাওয়া গেল৷ ডয়চে ভেলেকে শোনালেন হাসপাতাল তৈরির নেপথ্যের গল্প৷ ১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল কে ভি রঘুনাথ রেড্ডি পাঁচ শয্যার ও হাজার বর্গফুটের যে হাসপাতালের উদ্বোধন করেছিলেন, তার অতীতটা কিন্তু অন্যরকম৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সুবাসিনী সবজি বিক্রি করতেন, একটি জমিতে চাষও করতেন৷ সেই চাষের জমিটা মালিক বিক্রি করে দেবেন শুনে এক লাখ টাকা দিয়ে কিনে নেন৷ নিজের তিল তিল করে জমানো টাকা ছিল৷ ছেলে অজয় দিয়েছিলেন তাঁর টিউশনির রোজগার৷ এই সম্বল নিয়ে ১৯৯৩ সালে অন্যের দান করা টালি, বাঁশ, দরমা দিয়ে একচালার অস্থায়ী ছাউনিতে গড়ে উঠল চিকিৎসা কেন্দ্র৷ দরমার সেই ঘরের ভেতরে চলত স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ৷ বারান্দায় চলত বাকি বিভাগগুলো৷ তখন চোখ, ত্বক, মেডিসিন-সহ ছয়টি বিভাগে পরিষেবা দেওয়া হত এটুকু পরিকাঠামো নিয়ে৷ আজ সেই হাসপাতালে চলছে ১৮টি বিভাগ৷ সুবাসিনী বললেন, ২ টাকা থেকে ১০ টাকা এখন ৫০ টাকা হয়েছে টিকিটের দাম৷ তবুও কলকাতার অনেক হাসপাতাসের থেকে কম খরচে চিকিৎসা দেওয়া হয়৷

সুবাসিনীর স্বপ্ন ডানা মেলে উড়তে শুরু করেছে ২০১৪ থেকে৷ ২০০৯ সালের আয়লা বিধ্বস্ত সুন্দরবনের বাসিন্দা চিরঞ্জীব মণ্ডল এবং করুণা মণ্ডল হিউম্যানিটি হাসপাতালকে জমি দান করেন৷ সেখানেই গড়ে ওঠে হাঁসপুকুর হিউম্যানিটি হাসপাতালের দ্বিতীয় শাখাটি৷ কথা হচ্ছিল সুবাসিনী মিস্ত্রির মেজ ছেলে, চিকিৎসক অজয় মিস্ত্রির সঙ্গে৷ কৃতী মায়ের সন্তান বা তাঁর পরিবারও কিছু কম যায় না৷ হিউম্যানিটি হাসপাতালের জেনারেল মেডিসিন বিভাগ ও প্রশাসনিক দয়িত্বে থাকা অজয় মিস্ত্রি লড়াকু মায়ের ছেলে৷ পয়সার অভাবে চাঁদা তুলে বই কিনে পড়ে তিনি ডাক্তার হয়েছেন৷ মায়ের স্বপ্ন রূপায়ণে তিনি ৫-৬ হাজার ইঁট ভেঙেছেন, মশলা মাখিয়েছেন, দুরমুশ করছেন, মাটি কেটেছেন৷ ৪৫ শয্যার আজকের হাসপাতালকে রূপ দিতে এমন ঘরামির কাজের পাশাপাশি তিনি রোগীও দেখেছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি জানালেন, ‘‘পুরো হাসপাতাল চালাতে এখন মাসে ১৮ লাখ টাকা লাগবে৷ এখনও হাসপাতালে নিরাপত্তারক্ষী নেই, সব বিভাগে নেই যথেষ্ট ডাক্তারও৷ প্রতি ঘণ্টায় ৪০০ টাকা দিয়ে তিনটে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে আরএমও ডাক্তার রাখারও সামর্থ্য নেই হিউম্যানিটি হাসপাতালের৷ তারওপর আর্থিক সাহায্য নেই সরকারি তরফ থেকেও, নেই কোনো ব্যক্তিগত উদ্যোগ৷''

হিউম্যানিটি হাসপাতাল

এই সেই হিউম্যানিটি হাসপাতাল...

 শুধু সুবাসিনী বা অজয় নন, এই লড়াইয়ের অনেক সৈনিক৷ খোকন মিস্ত্রি, রবীন মণ্ডল, অরুণ দেবনাথরা হাসপাতালে স্বেচ্ছাশ্রম দেন৷ হিউম্যানিটিতে রোগীদের পরিশ্রুত জল পানের দায়িত্ব নিয়েছেন অরুণ৷ তাঁরই চেষ্টায় বসেছে ১২টি উন্নত প্রযুক্তির জল শোধনের৷ এর খরচ তিনি নিজেই জুগিয়েছেন৷ অরুণ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মাকে দেখে উৎসাহিত হয়েছি৷ বিভিন্ন কাজে হিউম্যানিটির পাশে থাকার চেষ্টা করি৷ তবে আরও ডাক্তার দরকার৷ অনেক মানুষকে পরিষেবা দিতে যন্ত্র নয়, ডাক্তার দরকার৷''

পদ্মশ্রীর সম্মান সর্বোচ্চ বটে, তবে প্রথম নয়৷ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন সুবাসিনী৷ স্বামীর মৃত্যুর পর চার আনা, দু'আনা জমিয়ে, কোলে এক বছরের শিশুকে নিয়ে তাঁর লড়াই এখন পদ্মশ্রীর সুবাদে সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিচ্ছে৷ মঞ্চ ভরে উঠছে প্রশংসায়৷ কিন্তু হাসপাতালকে আরও বড় করে তোলার মতো সাহায্য পাচ্ছেন কোথায়! সরকারি স্তরেও সাহায্য পাননি সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণা৷ ক্ষোভ গোপন না করেই ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি দু-তিনবার আমি গেছি সাহায্যের আর্জি জানাতে৷ নিজে হাতে ওঁকে কাগজপত্র দিয়ে এসেছি৷ আমাকে অনুষ্ঠানে ডেকে ফুলদানি আর চাদর দিয়েছে শুধু৷ কিন্তু রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সাহায্য পাইনি৷''

পদ্মশ্রী প্রাপ্তির পর অবস্থার পরিবর্তন হবে, আশায় রয়েছেন সুবাসিনী৷ সব মঞ্চে গিয়ে তিনি একই অনুরোধ রাখছেন, হাসপাতালের উন্নতিতে সকলে এগিয়ে আসুন৷ প্রতি বছর আমাদের রাজ্যে যাঁরা ডাক্তারি পাশ করছেন, তাঁরা কি শুনতে পাচ্ছেন সুবাসিনীর এই আহ্বান?

এই বিষয়ে অডিও এবং ভিডিও

বিজ্ঞাপন