স্যার আবেদের বিদায়বেলায় সব মতের মানুষ | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 22.12.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

স্যার আবেদের বিদায়বেলায় সব মতের মানুষ

দল-মত নির্বিশেষে মানুষের আকণ্ঠ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় বিদায় নিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ৷ রোববার দুপুরে স্ত্রী আয়শা হাসানের কবরে শায়িত হবার আগে সকালে আর্মি স্টেডিয়ামে সর্বস্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন৷

সকাল ঠিক সাড়ে ১০টায় কফিনবাহী গাড়িটি আর্মি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে৷ প্রথমেই রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাদের সামরিক সচিবরা ফুল দিয়ে স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন৷ ফুলেল শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা৷ এরপরই সর্বস্তরের মানুষকে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ করে দেওয়া হয়৷ তীব্র শীত উপেক্ষা করে তাঁকে বিদায় জানাতে আসেন কয়েক হাজার মানুষ৷

আওয়ামী লীগের পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মাহবুব উল আলম হানিফসহ কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন৷ আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘‘আবেদ ভাই যা সৃষ্টি করে গেছেন সেটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে৷ উনি দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সব সময় কাজ করে গেছেন৷ তাঁর মৃত্যু দেশের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি৷ গ্রামীণ উন্নয়নে, বিশেষ করে নারীদের উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন মানুষ তা মনে রাখবে৷''

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে ফজলে হাসান আবেদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান৷ তিনি বলেন, ‘‘‘স্যার ফজলে হাসান আবেদ ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন৷ যারা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেন৷ পৃথিবীজুড়ে যুগে যুগে মানুষের, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের অবস্থানকে যারা পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছেন নিঃসন্দেহে স্যার ফজলে হাসান আবেদের নাম সেখানে লেখা থাকবে৷ দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ও সামাজিক যে পরিবর্তন, মহিলাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষার ক্ষেত্রে তার অবদান অনন্য৷''

Gründer von BRAC Fazle Hasan Abed ist gestorben

শুক্রবার রাতে মারা যান ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফজলে হাসান আবেদ বিদেশে থেকে দেশের মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় কাজ করছিলেন৷ সে সময় লন্ডনে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় রাশেদ খান মেননের৷ সেই স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘তখন তিনি আমাকে একটি সোয়েটার দিয়েছিলেন৷ সেটা আজও আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি৷'' ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি মনে করেন, ‘‘ফজলে হাসান আবেদ গ্রামীণ উন্নয়নে, বিশেষ করে নারীদের উন্নয়ন, দারিদ্র্য মানুষের উন্নয়ন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখেছেন মানুষ তা মনে রাখবে৷''

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারও এসেছিল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘স্যার আবেদ যা সৃষ্টি করে গেছেন তা শুধু বাংলাদেশের মানুষ না, সারা বিশ্বের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন৷ আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কয়েকজন প্রেসিডেন্টের মুখেও তার নাম শুনেছি৷ কাজের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি৷''

রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এসেছিলেন স্যার আবেদকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে৷ অনেকে এ সময় কাঁন্নায় ভেঙে পড়েন৷

অসুস্থ শরীর নিয়েই এসেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘স্যার ফজলে হাসান আবেদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারিয়েছে৷ গত ৫০ বছর ধরে তিনি দরিদ্রদের সঙ্গে থেকেছেন, তাদের নিয়ে ভেবেছেন, তাদের নিয়ে কাজ করেছেন৷ তার কর্মে যে বিশেষত্ব ছিল এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সত্ত্বেও সবসময়ই তিনি বিশ্বাস করতেন, শিখতে হবে৷'' তাঁর মতে, ‘‘ বাংলাদেশে দারিদ্র নিরসনের ক্ষেত্রে অনেক মডেল রেখে গেছেন৷ এটা শুধু বাংলাদেশই না, সারা পৃথিবীর দরিদ্র মানুষের কাজে লাগছে৷''

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বলেন, ‘‘তাঁর বিদায়ে কতটা মর্মাহত হয়েছি, তা বলে শেষ হবে না৷ এ এক বিরাট শূন্যতা৷ তিনি প্রতিটি বিষয়ের গভীরে গেছেন এবং ব্যাপ্তি সৃষ্টি করেছেন৷ এটা করতে গিয়ে তাঁকে বহু প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে হয়েছে৷ তাঁর অবদান হলো, তিনি এসব প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছেন, এর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সিস্টেমটাও সৃষ্টি করেছেন৷''

১৯৭২ সালে সিলেট জেলায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প হিসেবে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠা করেন ফজলে হাসান আবেদ৷ তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৬ বছর৷ ফজলে হাসান আবেদের সেই সময়কার সংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন প্রিয় বন্ধু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান৷ কাঁপা কাঁপা কন্ঠে তিনি ডয়চে ভেলেকে বললেন, ‘‘আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় আমরা বন্ধুত্ব রেখে কাজ করেছি৷ ১৯৭২ সালে আবেদ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে৷ সেটাকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এনজিওতে পরিণত করা এটা অসাধারণ সাফল্য৷ এটা তার মেধা, শ্রম ও আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে৷ আজকে ব্র্যাক বাংলাদেশকে নানা জায়গায় পরিচিত করছে৷ ব্র্যাকের কার্যক্রম দেশে তো বটেই দেশের বাইরে ১০-১১টি দেশে ছড়িয়ে গেছে৷ শিক্ষা, স্বাস্থ ও দারিদ্র দূরীকরণে ব্র্যাকের সাফল্য প্রশ্নাতীত৷ আমি আশা করি আবেদ চলে যাবার পরও ব্র্যাকের কর্মীরা তার আদর্শ অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখবেন৷''

Fazle Hasan Abed

বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এসেছিলেন স্যার আবেদকে বিদায় জানাতে

তাঁকে বিদায় জানাতে আসেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামও৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘এমন একজন মানুষকে আমরা হারিয়েছি, যার প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান বিশ্বে এক নম্বরে আছে৷ তার যে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি সেখানে সবাই পড়তে চাই৷ সবাই চায় তার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে৷ স্যার সব সময় মাইক্রোলেভেলে যেতেন৷ প্রত্যেকটা জিনিস তিনি নিজে করতেন৷ আগে টেস্ট করতেন, তারপর বাস্তবায়নে যেতেন৷ উনার চলে যাওয়ায় দেশে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে৷''

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র বিমোচনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সফল হয়েছেন৷ দরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি কাজ করে গেছেন৷ তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য এক বিরাট ক্ষতি৷''

ফজলে হাসান আবেদ চলে গেলেও তার কীর্তি ঠিকই থেকে যাবে৷ তার সন্তানতুল্য প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক কাজ করে যাবে তাঁর দেখানো পথেই৷ প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, ‘‘শিক্ষার ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন৷ বলেছেন মানসম্মত শিক্ষা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন৷ সেটার জন্য নতুন স্কুল তৈরি করা, নতুন স্কুল মডেল তৈরি করার প্রতি গুরুত্ব দিতে বলেছেন৷ আমরা সেখানে কাজ করছি৷ পাশাপাশি কারিগরী শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছি৷ তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে আমরা আগামী দিনগুলোয় আরও বেশি কাজ করব৷'' তিনি আরও জানান, ‘‘আমরা দশ বছরের একটা কর্মকৌশল তৈরি করেছি৷ ব্র্যাক সারাবিশ্বে ২৫০ মিলিয়ন মানুষের কাছে ছড়িয়ে যাবে৷ সে কর্মকৌশল নিয়ে আমাদের গ্লোবাল বোর্ডের নির্দেশনায় আমরা এগিয়ে যাব৷''

স্যার ফজলে হাসান আবেদ শুক্রবার রাত ৮টা ২৮ মিনিটে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধী অবস্থায় মারা যান৷ মস্তিস্কে টিউমার আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন৷ ২৮ নভেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷

ভিডিও দেখুন 02:15

স্যার আবেদ এক অনুপ্রেরণার নাম

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন