সূর্যের চেয়ে বালির গরম বেশি | বিশ্ব | DW | 11.03.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ব্লগ

সূর্যের চেয়ে বালির গরম বেশি

বাংলাদেশে সব প্রভাবশালীই ভিআইপি৷ সেই প্রভাব অবৈধভাবে, মানুষকে ঠকিয়ে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে তৈরি হয়েছে কি হয়নি, তা বিবেচ্য নয়৷ এ এক অসুস্থ সংস্কৃতি৷ 

ঘটনা একঃ এবারের বইমেলার ঘটনা৷ পরিচিত এক লেখকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে বাংলা একাডেমিতে গেলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান৷ তিনি হেঁটেই বইমেলায় প্রবেশ করেন৷ কিন্তু তাঁর গাড়ির চালক ক্ষমতা দেখিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়েন৷ পরে অবশ্য ঐ গাড়ির চালককে অব্যাহতি দেন প্রতিমন্ত্রী৷

ঘটনা দুইঃ ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবরঃ ‘‘ঢাকা মেট্রো ঘ-১১-২৮২৭ নম্বরের পাজেরো গাড়িটি ব্যবহারের এখতিয়ার যুগ্ম সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের৷ অথচ ১০ বছর ধরে এটি ব্যবহার করছিলেন তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী৷ সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, চালকের বেতনসহ সব খরচ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানই৷ এক বছর আগে অবসরে যাওয়ার পরও গাড়িটি ছিল তাঁর দখলে৷''

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, রক্ষণাবেক্ষণসহ সব মিলিয়ে পিডিবি'র অবসরপ্রাপ্ত স্টেনো টাইপিস্ট আলাউদ্দিন মিয়া অবৈধভাবে গাড়ির জন্য সরকারের ব্যয় করেছেন কোটি টাকারও বেশি৷ এ ঘটনার পর অগ্রণী ব্যাংক, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিবিএ নেতাদের দখলে থাকা সরকারি খরচে ব্যবহার করা গাড়িগুলো দুদকের অভিযানে একের পর এক বের হতে থাকে৷

ঘটনা তিনঃ দৈনিক আমাদের সময়ের ১৮ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন ‘আদালতের তালিকা : ধলেশ্বরী নদী দখলে ৩৭ ব্যক্তি'-এ দেখা যায়, ‘‘মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা মৌজার ধলেশ্বরী নদীর ১১ দশমিক ৩০ একর জমি অবৈধভাবে দখল করেছে মানিকগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশনস লিমিটেড (ঢাকা নর্দান পাওয়ার জেনারেশনস লি.)৷ এই কোম্পানিসহ ওই মৌজার মোট ৩৭টি অবৈধ দখলদারের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করেছেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক৷'' এছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও একরের পর এক নদীর জমি দখল করে আছেন অনেক ব্যক্তি৷

ঘটনা চারঃ দৈনিক ইত্তেফাকের ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন- ‘এলেঙ্গা হাইওয়েতে পুলিশের ব্যাপক চাঁদাবাজি'-তে দেখা যায়, ‘‘টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা হাইওয়েতে পুলিশ টোকেনের মাধ্যমে মহাসড়কে প্রকাশ্যে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷ বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে গাড়ির মালিক ও চালকরা৷ ভুক্তভোগীরা বলছেন, মামলার ভয় দেখিয়ে ও কাগজপত্র দেখার নামে হাইওয়ে পুলিশ নিয়মিত মাসোহারা ও প্রতিদিন চাঁদা নিচ্ছে৷ এ ঘটনায় যানবাহনের মালিক ও চালকরা অসহায়ত্বের কথা বললেও চাঁদার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাসুদেব সিনহা৷''

ঘটনা পাঁচঃ যুগান্তরের ১৯ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন, ‘মাতৃভাষা দিবস পালন করতে চাঁদাবাজি, যুবলীগ নেতা বহিষ্কার'-এ দেখা যায়, রংপুরে ‘‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক যুবলীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে৷ আব্দুল বাতেন মিয়া নামে ওই যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ এছাড়াও ওই যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে মারপিট ও অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ রয়েছে৷ মঙ্গলবার উপজেলা যুবলীগের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আব্দুল বাতেনকে বহিষ্কার করা হয়৷''

ওপরের যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হলো সবগুলোতেই একটা বিষয় সাধারণ৷ তা হলো, এখানে আলোচিত ব্যক্তিরা বা প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ক্ষমতার অপব্যবহার' করেছেন৷ প্রতিটি ঘটনাই একেবারে সাম্প্রতিক৷ বছর জুড়ে দেখা হলে এমন ঘটনার সংখ্যা হাজারে নয়, লাখে হিসেব করতে হবে৷ উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনাতেই কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বশীল পক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে বা এমন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছে৷ কিন্তু এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যেখানে সবাই সবকিছু জানেন, কিন্তু ব্যবস্থা নেয়া হয় না৷ 

এই ঘটনাগুলো থেকে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার৷ তা হলো, মূল ক্ষমতা যার হাতে, তার চেয়ে অপব্যবহার বেশি হচ্ছে যারা অধঃস্তনে কাজ করছেন তাদের দ্বারা৷ কথায় আছে, সূর্যের চেয়ে বালি গরম হয় বেশি৷ তবে তা মূল ক্ষমতার জ্ঞাতে না অজ্ঞাতে তা আরেকটি বিতর্কের বিষয়৷ কিন্তু এটা সত্য যে, এই ব্যক্তিরা নানা কারণে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন৷ যেমন, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে, জাতীয় রাজনীতির তকমা থাকার কারণে, কিংবা রাষ্ট্রীয় বা দলীয় দায়িত্বকে ক্ষমতা ভাবার কারণে৷ এই সবকিছুর পেছনে অবৈধভাবে অর্থ ও প্রতিপত্তি গড়ার মানসিকতা রয়েছে৷

তাত্ত্বিকভাবে, দায়িত্ব ও ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারা এবং দুর্নীতিযুক্ত একটা সমাজে বেড়ে ওঠাই এই মানসিকতা তৈরির কারণ৷ যে শিক্ষায় সবাই শিক্ষিত হচ্ছেন, তাতে ‘প্রথাগত' শিক্ষার চাপে চাপা পড়ে যায় মূল্যবোধের শিক্ষা৷ তাই একটি রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানকারী অফিসে গিয়ে সেবা পেতে গিয়ে প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতে হয় সাধারণ মানুষকে৷ এই যে অসাধু কর্মচারী বা কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকা কামিয়ে যাচ্ছেন বা লুট করছেন, তা সবই আসে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনগণের পকেট থেকে৷ যেই সিবিএ নেতারা প্রতিমাসে সরকারের লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করছেন গাড়ির তেল খরচে আর ড্রাইভারের বেতনে, তা আসলে জনগণের করের টাকা৷ এছাড়া ছোটবেলা থেকেই তো শুনে আসছি, ওমুক সরকারি কর্মকর্তার ঢাকায় পাঁচটি বাড়ি, তমুকের এত জমি, এসব আসে কোত্থেকে?

আমাদের দেশের মানুষের বিবেকবোধ অনেক আগেই এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, এসব নিয়ে কথা বললেই যেন চমকে ওঠেন সবাই৷ কারণ, নিয়ম হয়ে গেছে এসব৷ এখন ক্ষমতার অপব্যবহার যিনি করতে পারেন তিনিই ‘ভিআইপি'৷ কারণ তিনিই প্রভাবশালী৷

ক্ষমতার অপব্যবহার করেই কি ভিআইপি হওয়া যায়? লিখুন নীচের ঘরে৷ 

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন