সীতাকুণ্ডের নির্যাতিত তিন সংখ্যালঘু নারী এখনো আতঙ্কে | বাংলাদেশ | DW | 10.06.2022

ডয়চে ভেলের নতুন ওয়েবসাইট ভিজিট করুন

dw.com এর বেটা সংস্করণ ভিজিট করুন৷ আমাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি! আপনার মতামত সাইটটিকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারে৷

  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

বাংলাদেশ

সীতাকুণ্ডের নির্যাতিত তিন সংখ্যালঘু নারী এখনো আতঙ্কে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের দাসপাড়ায় তিন সংখ্যালঘু নারীকে লাঠি-রড দিয়ে পেটানো হয়৷ সেই দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে৷ মূল আসামিরা এখন পলাতক৷

আপাতত নিরাপত্তা পেলেও যে কোনো দিন আবার হামলার আশঙ্কা করছেন নির্যাতিত তিন নারী৷

পরিবারটির পুরুষ সদস্যরা প্রবাসে থাকেন৷ বাড়িতে থাকেন শুধু চারজন নারী৷ আর এই সুযোগেই প্রতিবেশী আমিন সওদাগরের ছেলেরা হিন্দু পরিবারটির জমি দখলের চেষ্টা করছেন৷ ওই নারীদের অভিযোগ, তারা নিজেদের পুকুরে নামতে গেলে বাধা দেয়া হয়৷ তাদের গাছের ফল জোর করে পেড়ে নিয়ে যায়৷ এমন চলছিল দীর্ঘদিন ধরে৷ সর্বশেষ গত ৪ জুন তাদের একটি গাছের জাম পেড়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন আমিন সওদাগরের দুই ছেলে তৌহিদুল ইসলাম ও আলমগীর হোসেন৷ তাদের বাধা দেওয়ায় তিন নারীকে লাঠি, রড দিয়ে পেটান ওই দুই ভাই৷

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. শাহাব উদ্দিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমিন সওদাগরের ছেলেরা দস্যু প্রকৃতির৷ তারা কোনো সালিশ মানে না৷ মাত্র ১২ বছর আগে আমিন সওদাগর এখানে বাড়ি করেছে৷ আর ওই হিন্দু পরিবারটি যুগ যুগ ধরে এখানে বসবাস করে৷ আমরা কয়েক দফা সালিশের মাধ্যমে সামাধানের চেষ্টা করেছি৷ কিন্তু ওরা সালিশ ডাকলেই আওয়ামী লীগের ৫০-৬০ জনকে ডেকে নিয়ে আসে৷ ফলে কোনো সমাধান হয় না৷ ওই হিন্দু পরিবারটির বাড়ি যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছেন আমিন সওদাগর৷ আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে কয়েকবার সমাধানের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি৷’’

সালিশ ডাকলেই ওরা আওয়ামী লীগের ৫০-৬০ জনকে ডেকে নিয়ে আসে: ইউপি সদস্য মো. শাহাব উদ্দিন

মারধরের শিকার নারীরা হলেন, যোগেন্দ্র চন্দ্র দাসের স্ত্রী শ্রীমতি রানী দাস (৩০), মিলন চন্দ্র দাসের স্ত্রী অঞ্জনা রানী দাস (৩২) ও কৃষ্ণ চন্দ্র দাসের স্ত্রী রীমা রানী দাস (২৭)৷ এই ঘটনায় রীমা রানী দাস বাদি হয়ে তৌহিদুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন ও তাদের বাবা আমিন সওদাগরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন৷ ওইদিনই পুলিশ আমিন সওদাগরকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়৷ বয়স্ক হওয়ায় আদালত আমিন সওদাগরকে জামিন দিয়েছেন৷ তবে তার দুই ছেলে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন৷

সীতাকুণ্ড থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কালাম আজাদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ঘটনার পরপরই আমরা আমিন সওদারকে গ্রেপ্তার করি৷ তার দুই ছেলে পলাতক রয়েছেন৷ আসলে বিএম কন্টেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এই মামলার দিকে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া যায়নি৷ শিগগিরই দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হবে৷ পাশাপাশি ওই পরিবারটির নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি৷’’

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সালিশে দুই পরিবার এই পুকুর ব্যবহার করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে৷

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সালিশে দুই পরিবার এই পুকুর ব্যবহার করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে৷

ঘটনার সূত্রপাত কিভাবে জানতে চাইলে রীমা রানী দাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমাদের বাড়ির সঙ্গে একটি পুকুর আছে৷ এই পুকুরের কিছু জমি আমাদের, আর কিছু জমি ওদের৷ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সালিশ করে বলেছেন, দুই পরিবারই এই পুকুরটি ব্যবহার করবে৷ মাছও ভাগ করে নেবে৷ কিন্তু ওরা আমাদের পুকুরের কাছেও যেতে দেয় না৷ পুকুরের কাছে কিছু জমি আছে, সেগুলো পুরোটাই আমাদের৷ কত শতাংশ সেটা আমি বলতে পারবো না৷ কিন্তু ওই জমিটা ওরা দখল করে রেখেছে৷ চাষাবাদ করে ওরাই খায়৷ এ নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে৷ আমাদের বাড়ির সঙ্গে কিছু গাছ আছে৷ এর সবগুলোই আমাদের৷ সেদিন আমাদের গাছ থেকে ওরা দুই ভাই জাম পেড়ে নিয়ে যাচ্ছিল৷ আমরা প্রতিবাদ করায় মারধর করে৷ এর আগেও তারা আমাদের মারতে উদ্যত হয়েছে৷ আমাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা যেহেতু দেশের বাইরে থাকেন, তাই আমরা ঝামেলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি৷ বয়স্ক শাশুড়ি আর আমরা তিন জা৷ আর এই সুযোগেই ওরা আমাদের উপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালিয়ে আসছে৷’’

পুলিশ এসে আশ্বাস দিয়ে গেছে: রীমা রানী দাস

ঘটনার পর নতুন করে আর হুমকি দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে রীমা রানী দাস বলেন, ‘‘পুলিশ এসে আমাদের আশ্বাস দিয়ে গেছে৷ ওরা দুই ভাই দিনের বেলায় বাড়িতে থাকে না৷ রাতে আসে৷ এই মুহুর্তে কোনো হুমকি নেই৷ কিন্তু যে কোনো সময় তো ওরা আবারও ঝামেলা করতে পারে৷’’

আমিন সওদাগরের সঙ্গেও কথা বলেছে ডয়চে ভেলে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরাই বরং বহুবার সালিশের চেষ্টা করেছি, ওরাই মানতে চায় না৷ ওই বাড়ির নারীরা দস্যু টাইপের৷ ওইদিন তো ওরাই আমার ছেলেদের উপর হামলা চালিয়েছে৷ পুরো পুকুরটি আমাদের, তারপরও আমরা ওদের ব্যবহার করতে দেই৷’’

যে জাম গাছ থেকে জাম পাড়া নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত সেই গাছের মালিকানা সম্পর্কে জানতে চাইলে আমিন সওদাগর বলেন, ‘‘ওই জমি নিয়েই তো ওরা ঝামেলা করছে৷ জমি তো আমাদের৷ কিন্তু ওরা দাবি করে ওদের৷ এ নিয়ে মামলা চলছে৷ আমরা তো ওদের চলাচলের রাস্তাও দিয়েছি৷ আমরা জমি না দিলে ওরা বাড়ি থেকে বের হতেই পারবে না৷ মানবিক কারণে আমরা আমাদের জমি দিয়ে ওদের চলতে দেই৷ এখন ওরা টাকার জোরে আমাদের উপরই নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে৷’’

বিদেশ থেকে টেলিফোনে যোগেন চন্দ্র দাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি আগেরবার দেশে গিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছি৷ ছাড় দিয়েও চেষ্টা করেছি৷ তা-ও ওরা মানে না৷ পুরোটাই ওরা দখল করতে চায়৷ চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজন চেষ্টা করেও ওদের বোঝাতে পারেনি৷ আমরা দেশের বাইরে থাকি, নারীরা বাড়িতে থাকেন, ফলে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় থাকি৷ এই পরিস্থিতি অব্যহত থাকলে তো দেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না৷’’

রীমা রানী দাসের দাবি, পুকুরের উপরে থাকা জমি তাদের৷ কিন্তু প্রতিবেশীরা তা দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ তার৷

রীমা রানী দাসের দাবি, পুকুরের উপরে থাকা জমি তাদের৷ কিন্তু প্রতিবেশীরা তা দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ তার৷

ঘটনার পরপর পূজা উৎযাপন পরিষদের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে৷ ঢাকা মহানগর পূজা উৎযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি বিষয়টির সমন্বয় করছেন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করেছি৷ পাশাপাশি পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেছি৷ প্রশাসন আমাদের আশ্বস্ত করেছে৷ ওই দুই ভাই গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত পরিবারটির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে, এ কথাও আমরা প্রশাসনকে বলেছি৷’’

আইনের শাসন না থাকার কারণে যেখানে যার জোর আছে, সেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘এই ঘটনাটি প্রমান করে দেশে দুর্বল মানুষ কতটা ঝুঁকিতে আছেন৷ শুধু সংখ্যালঘুরা নয়, মুসলমানদের মধ্যে যারা দুর্বল তাদের ঝুঁকিও কম নয়৷ গণতান্ত্রিক একটা পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হবে না৷’’

সংশ্লিষ্ট বিষয়