সিরিয়ায় অপহৃত জার্মান সাংবাদিক মুখ খুললেন | সমাজ সংস্কৃতি | DW | 11.04.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সিরিয়া

সিরিয়ায় অপহৃত জার্মান সাংবাদিক মুখ খুললেন

জার্মান সাংবাদিক ইয়ানিনা ফিন্ডআইসেন ২০১৫ সালে সিরিয়ায় যাওয়ার সময় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন৷ সেখানে তিনি অপহৃত হন এবং প্রায় একবছর জিম্মিদশায় ছিলেন৷ সেই অবস্থাতেই তাঁর ছেলের জন্ম হয়৷

২০১৫ সালে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সিরিয়া যান জার্মান সাংবাদিক ইয়ানিনা ফিন্ডআইসেন

২০১৫ সালে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সিরিয়া যান জার্মান সাংবাদিক ইয়ানিনা ফিন্ডআইসেন

একসময়ের সহপাঠী লাওরার সাক্ষাৎ পেতে ২০১৫ সালের শরৎকালে সিরিয়া গিয়েছিলেন সাংবাদিক ইয়ানিনা ফিন্ডআইসেন৷ তারও দশবছর আগে লাওরা জিহাদি যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিতে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন৷ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে লড়াইরত জিহাদিদের একান্ত ফুটেজ পাওয়ার আশায় লাওরার সহায়তা চেয়েছিলেন ফিন্ডআইসেন৷

লাওরার মাকে সঙ্গে নিয়ে তাই বিমানে করে জার্মানি থেকে তুরস্কের আন্টাকিয়ায় পৌঁছান তাঁরা৷ সেখানে তাঁদের সঙ্গে কয়েকজন মানবপাচারকারীর দেখা হয় যাঁরা তাঁদের তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত পার করে দেয়ার কথা বলেন৷ সীমান্তে তখন বেশ বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল৷ সীমান্তরক্ষীরা একদিকে শরণার্থীদের মারছিলেন, অন্যদিকে সীমান্তের কাছেই বোমা ফুটছিল৷ সেই অবস্থা দেখে লাওরার মা নিজের মত পরিবর্তন করে জার্মানিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন৷ তবে, ফিন্ডআইসেন ভ্রমণ সতর্কতাকে অগ্রাহ্য করে সিরিয়ায় প্রবেশ করেন৷

ফিন্ডআইসেন জানান, লাওরা তাঁকে ইমেলে সিরিয়ায় তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন৷ কিন্তু শুধু সেই প্রতিশ্রুতি যে দেশটি ভ্রমণের জন্য যথেষ্ট ছিল না, তা বুঝতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি৷

ভ্রমণ যখন বিপজ্জনক দিকে মোড় নেয়

মানবপাচারকারীদের সহায়তায় অক্ষত অবস্থায় সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে প্রবেশের পর লাওরার দেখা পান তিনি৷ প্রথম আটদিন সেখানে তুলনামূলকভাবে ভালোই কেটেছিল৷ ফিন্ডআইসেন বলেন, ‘‘সে তখনও আমার বন্ধু ছিল, আমরা অতীতের স্মৃতিচারণ করেছি৷ তবে এটাও ঠিক যে আমরা স্কুলত্যাগ করার পর অনেক কিছু ঘটেছে৷ ফলে আমাদের মধ্যে অনেককিছু ভিন্ন ছিল৷'' তা সত্ত্বেও তাঁরা একে অপরকে বিশ্বাস করেছিলেন৷ ফিন্ডআইসেন সেসময় লাওরা এবং নুসরা ফ্রন্ট নামের সন্ত্রাসী সংগঠনের এক কমান্ডারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন৷ লাওরা সেই ফ্রন্টের একজন সদস্য ছিলেন৷

ফিন্ডআইসেন এবং লাওরা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ঘুরেও বেড়িয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা উত্তর সিরিয়ার মধ্যে গাড়ি নিয়ে ঘুরেছি, ইডলিবের মধ্যে গিয়েছি এবং গাড়ি থেকে ভিডিও করেছি৷'' তিনি তখন বিভিন্ন চেকপয়েন্ট এবং বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত শহরতলী দেখেছেন৷ এভাবে পর্যাপ্ত ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহের পর তিনি লাওরার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটি ট্যাক্সিতে করে তুরস্কের সীমান্তের দিকে রওয়ানা দেন৷ ট্যাক্সিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন নুসরা ফ্রন্টের এক যোদ্ধা৷

Syrien Anschlag in Idlib

প্রতিবেদনের কাজে উত্তর সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত ইডলিবেও গিয়েছিলেন ফিল্ডআইসেন

কিন্তু সীমান্তে পৌঁছানোর অল্প কিছুক্ষণ আগে তাঁর ট্যাক্সি থেমে যায়৷ ফিন্ডআইসেন বলেন, ‘‘ট্যাক্সিতে ওঠার পর থেকেই আমি মন্দ কিছুর ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম৷ ট্যাক্সি চালক কখনো খুব জোরে, কখনো খুব আস্তে চালাচ্ছিল৷ একপর্যায়ে হঠাৎ করে কালাশনিকভ হাতে একদল মুখোশধারী পুরুষ আমাদের গাড়িটি আটকে দেয়৷''

মুখোশধারীরা ট্যাক্সির চালক এবং নুসরা ফ্রন্টের যোদ্ধাকে ট্যাক্সি থেকে বের করে দেয়৷ তাদের একজন তখন ফিন্ডআইসেনের পাশে বসে৷ সেসময় মৃত্যুর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত থাকলে চুপচাপ বসেছিলেন তিনি৷ কেননা তিনি জানতেন সেই মুহূর্তে আসলে তাঁর কিছু করার ছিল না৷

জিম্মিদশায় সন্তান প্রসব

অপহরণকারীরা ফিন্ডআইসেনের চোখ বেঁধে ফেলে এবং ট্যাক্সিটি চালিয়ে এক অজানা গন্তব্যে নিয়ে যায়৷ এরপর কয়েকমাস পরপর তাঁকে রাখার স্থান বদল করা হয়৷ তাঁকে সবসময় চোখ বেঁধে এক স্থান থেকে অন্যত্র নেয়া হতো এবং তাঁকে কোথায় রাখা হচ্ছে তা জানাতো না জিম্মিকারীরা

ফিন্ডআইসেন অবশ্য তাঁর জিম্মিকারীদের সব নির্দেশনা মেনে চলতেন৷ তিনি শান্ত থাকতেন, কখনো চিৎকার বা পালানোর চেষ্টা করতেন না৷ জিম্মিকারীরা তাঁকে খাবার এবং পোশাক এনে দিত৷ তবে, তাঁর রুম থেকে বের হতে নিষেধাজ্ঞা ছিল৷ একপর্যায়ে তাঁকে একটি টেলিভিশন দেয়া হয়েছিল৷ বিদ্যুৎ থাকলে তিনি সেই চ্যানেলে ডয়চে ভেলে দেখতেন - তাঁর কাছে বহির্বিশ্বে কী হচ্ছে, সেটা জানার ওটাই একমাত্র মাধ্যম ছিল৷

একসময় ফিন্ডআইসেনের সন্তান প্রসবের সময় হয়৷ তিনি আশা করেছিলেন যে  তাঁর জিম্মিকারীরা তাঁকে কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাবেন৷ কিন্তু তারা সেটা করেনি৷ সেসময়কার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘‘তারা আমাকে দেখভালের জন্য উত্তর সিরিয়া থেকে এক স্ত্রীরোগ চিকিৎসক নিয়ে আসেন৷ আমাকে দেখভালে বাধ্য করার জন্য তারা তাঁর স্বামীকে জিম্মি করেছিল৷'' সেই স্ত্রীরোগ চিকিৎসক ফিন্ডআইসেনকে জানান যে তাঁর বা তাঁর সন্তানের কিছু হলে জিম্মিকারীরা চিকিৎসকের স্বামীকে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দিয়েছিল৷

ফিন্ডআইসেন জানতেন তাঁকে যে-কোনো সময় ক্যামেরার সামনে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হতে পারে৷ তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে শান্ত রাখতে ডয়চে ভেলে দেখতেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সব ভালো ঘটনা মনে করতাম, আমার ছেলেবেলা, আমার যৌবনকাল এবং অতীতে আমি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ যে জীবন কাটিয়েছিলাম সেই জীবনের কথা৷'' প্রতিদিন ডয়চে ভেলে টেলিভিশন দেখে এবং এসব ভেবেই তিনি শান্ত থাকার চেষ্টা করতেন৷

অবশেষে মুক্তি

এগারো মাস পর একদিন হঠাৎ করে একদল মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁকে যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে মুক্ত করেন৷ তাঁরা তাঁর নাম ধরে ডাকেন এবং তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান৷ সেই মুহূর্তে অবশ্য ঠিক কী হচ্ছে তা তিনি বুঝতে পারেননি৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করেছিলাম অন্য একটি জিহাদি গোষ্ঠী আমাকে নিয়ে যাচ্ছে৷'' আরেক অপহরণকারী দলের কাছে যাচ্ছেন ভেবে তিনি শঙ্কিত বোধ করছিলেন

ফিন্ডআইসেনের উদ্ধারকারীরা তাঁর চোখ খুলে দেন এবং তাঁকে ও তাঁর সন্তানকে তুরস্ক সীমান্তে নিয়ে যান, যেখানে জার্মান সিকিউরিটি এজেন্টরা তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন৷ এভাবেই আবার মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন এই জার্মান সাংবাদিক৷

ফিন্ডআইসেন অবশ্য পরবর্তীতে শুনেছিলেন যে নুসরা ফ্রন্টের অন্য একটি উপদল, যারা বছরখানেক আগে তাঁর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন, দৃশ্যত তাঁকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করেছিলেন৷

এখন অবশ্য ফিন্ডআইসেন স্বীকার করেন যে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর যুদ্ধাঞ্চলে যাওয়া একেবারেই উচিত হয়নি৷ তিনি তাঁর সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বইও লিখেছেন৷ ‘‘বই লেখাটা আমাকে সেই ঘটনার কারণে সৃষ্ট মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করেছে,'' বলেন তিনি৷

সোনিলা সান্ড/এআই

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন