‘সিজার ভাই যদি জঙ্গি হয়, আমিও জঙ্গি′ | বিশ্ব | DW | 15.11.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগওয়াচ

‘সিজার ভাই যদি জঙ্গি হয়, আমিও জঙ্গি'

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোবাশ্বার হাসান সিজার এখনো নিখোঁজ৷ সাতদিন পরও কোনো খোঁজ নেই৷ ফেসবুকে তাঁদের ছোট্ট মেয়েটির কথা লিখেছেন সিজারের প্রাক্তন স্ত্রী৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনা চলছে সেই লেখা নিয়েও৷

কেবল সিজারের স্ত্রী-ই নন, তাঁর স্বজন, বন্ধু বান্ধব, সহকর্মীরা এখনও তাঁকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সোচ্চার৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারা প্রতিদিনই সিজারকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন৷

গতকাল সিজারের বোন তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীর ফেসবুক পোস্টটি শেয়ার করেন৷ সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘৭ই নভেম্বরের পর থেকে মোবাশ্বারের জন্যে অনেক লেখালেখি হচ্ছে, মানববন্ধন হচ্ছে৷ ওর বন্ধুরা ওকে ফেরত চায়, ওকে যারা গুম করেছে, তাদের বিচার চায়৷ আমি শাস্তি বা বিচার চাই না৷ আমি শুধু চাই আমার ছোট্ট মেয়েটার বাবা মেয়ের কাছে ফিরে আসুক৷ ও শুধু একবার ফিরে আসুক, আমি কথা দিচ্ছি ও আর জীবনেও কোনো কিছু লিখবে না, ওর ফেইসবুক প্রোফাইল থাকবে না, ব্লগ থাকবে না৷ প্লিজ, বিশ্বাস করেন৷''

সিজারের মেয়েকে যে এখনো মিথ্যে প্রবোধ দিয়ে শান্ত রাখা হয়েছে, সে কথা জানিয়েছেন তিনি এভাবে, ‘‘আমাদের একটা মেয়ে আছে৷ ডিভোর্সের পর আমাদের কখনো দেখা বা কথা হয়নি৷ মেয়ের বাবা-মা হিসাবে আমরা ‘সিনক্রোনাইজড' ছিলাম৷ মেয়েটাকে আমি বলেছি, তার বাবা বাইরে গেছে ৭ তারিখে, পড়াশুনা করতে৷ ওর বাবা যেহেতু প্রায়ই বাইরে যায়, তাই সে বেশি প্রশ্ন করেনি৷ কিন্তু প্রচণ্ড অভিমান করেছে৷ কারণ এমন কখনো হয়নি যে, ওর বাবা ওকে না জানিয়ে কোথাও গেছে৷ ও খুব অবাক হয়ে বলেছে ‘কই, বাবা তো আমাকে বলে গেলো না!' আমার মেয়ে জানে যে, তার বাবা শুক্রবার তাকে খেলনা কিনতে নিয়ে যাবে, কিন্তু বাবা তাকে না জানিয়ে বিদেশ যাবে, এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না৷ ফুপুর সঙ্গেও তার বেশ ভালো খাতির৷ বাবার উপর অভিমান করে সে ফুপুর সঙ্গেও কথা বলে না এখন৷''

নির্বাচিত প্রতিবেদন

‘‘মেয়েটা জানে তার বাবা বাইরে থেকে খেলনা নিয়ে আসবে অনেক৷ নভেম্বরেই তার জন্মদিন৷ প্রতি বছর তার বাবা তার জন্যে একটা বার্থডে পার্টি করে আর আমি একটা করি৷ এবারও সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘আচ্ছা এবারও তো আমার দুইটা পার্টি হবে, তাই না?' বাবার সঙ্গে খেলতে যাওয়া, মুভি দেখতে যাওয়ার খুব পাগল সে৷ আপনারা আবেগ কতটুকু বোঝেন আমি জানি না, কিন্তু আমার মেয়ে বোঝে! এই মেয়েটাকে এভাবে মিথ্যা বলে আর কতদিন বুঝ দিয়ে রাখব আমি?''

বাবা-মেয়ের কিছু স্মৃতি তর্পণ করে শেষে সিজারের সাবেক স্ত্রী লিখেছেন, ‘‘আমার মেয়ের পছন্দের খেলনা ‘মাই লিটল পোনি'৷ মোবাশ্বার যখনই বাইরে গেছে, খুঁজে খুঁজে ব্যাগ ভর্তি করে এই খেলনা নিয়ে এসেছে৷ আমার গোটা রুম এই খেলনা দিয়ে ভর্তি৷ আপনাদেরও নিশ্চয়ই বাচ্চা আছে, আপনাদের বাচ্চার কোন খেলনা পছন্দ? আপনারা দূরে গেলে সেই বাচ্চার কি অবস্থা হয়? কার কি যায় আসে, আমি জানি না৷ কিন্তু মোবাশ্বারের বাবার গোটা দুনিয়া জুড়ে ছিল শুধু উনার ছেলে৷ উনাকে আমি যতটুকু চিনি, ছেলের অভাবে বেশিদিন সুস্থির থাকতে পারবেন না৷ ওর মেয়ে আর বাবার দিকে তাকিয়ে হলেও ওকে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেন প্লিজ৷ দরকার হলে ও সারাজীবন বাসায় বসে থাকবে ওর বাবার কাছে৷ দরকার হলে ও চাকরি করবে না৷ তবুও ওর বাবা আর মেয়ের কাছে ওকে ফেরত দিন, একটিবার৷''

বহুল আলোচিত এই ফেসবুক পোস্ট সম্পর্কে শরিফুল হাসান লিখেছেন, ‘‘আমার জানামতে আমি কখনো কোনো অন্যায় করিনি৷ দেশবিরোধী কাজ করিনি৷ তারপরেও আমি সন্ত্রাসী হতে চাই যদি লিমন হয় সন্ত্রাসী৷ আমি তাই লিমনের মুক্তি চেয়েছিলাম৷ প্রবীর শিকদার যদি অন্যায়কারী হয় আমিও অন্যায়কারী৷ কারণ আমি তাঁর মুক্তি চেয়েছিলাম৷ সিজার ভাই যদি জঙ্গি হয়, আমিও জঙ্গি৷ কারণ, আমি তাঁর মুক্তির লড়াইয়ে আছি৷ হে রাষ্ট্র, আমি সাহসী গলায় বলছি, তুমি যদি আমাকে শাস্তি দিতে চাও, আমাকে গুম করতে চাও করতে পারো৷''

জসিম উদ্দীন জানতে চেয়েছেন, দেশ থেকে সুবোধ কি সত্যিই চলে গেছে? তিনি লিখেছেন, ‘‘৬ নারীকে ধর্ষণ করা ছাত্রলীগ নেতার ছবি ভাইরাল হয়নি! দেখাও যায়নি তাকে আইনের আওতাভুক্ত করে শাস্তি প্রদানের দাবি!  ভাইরাল হয়নি নিখোঁজ হওয়া মোবাশ্বর সিজারের খবর৷ আমি এখন সুশীল খুঁজি, মানবাধিকার কর্মীদের খুঁজি৷ বার বার খুঁজে পাই নিখোঁজদের পিতামাতার কান্না, বাবা হারানো সন্তানের কান্না, খুঁজে পাই স্বামী হারানো স্ত্রীর কান্না৷ আমার ঠিক মনে নেই, কিছু দিন আগে কোনো এক নিউজে দেখলাম, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়া লেখা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরতে চায় না৷ কেন ফিরবে, ভাই? ফিরলেই যে গুম হবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে?''

সিজার কেমন মানুষ ছিলেন সে সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা দিয়েছেন আসিফ এন্তাজ রবি৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘সিজারকে দেখে আমি খুব অবাক হতাম৷ একটা মানুষ কীভাবে এতগুলো মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখে৷ হেভিওয়েট সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন, প্রশাসনের হোমড়া-চোমড়া, কাকে সিজার চিনতো না! সিজার কোনো কারণ ছাড়াই হো হো করে হাসত জানতো৷ সিজারের ঘনিষ্ট হোমড়া- চোমড়াদের কয়েকজনকে আমি চিনি৷ তারা এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন৷ আমি তাদের দু-একজনকে ফোন দিলাম৷ তারা খুবই স্বাভাবিক গলায় বললেন, শোনো, ঝামেলা তো একটা আছেই, নইলে কী আর ওকে ধরে?''

সিজারের বোন তামান্না তাসমিন তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা লিখেছেন৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘আমরা দুই ভাই-বোনই জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলাতে বাবা-মায়ের ভেটো থাকলে সে পথে হাঁটিনি কখনো৷ আমরা বাসার বাইরে গেলে অন্তত চার পাঁচবার তো আব্বু কল দিবেই৷ আমাদের সব বন্ধুরা জানতো যে, যত বড়ই হই না কেন আমরা, বাসার বাইরে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব না৷ আব্বু এত বেশি টেনশন করেন সবকিছু নিয়ে৷ আব্বুর সেই টেনশনই কিভাবে যেন সত্যি হয়ে গেল৷ শুধু মাত্র একটা রাতের ব্যবধানে আমাদের এই সহজ সরল, কারো সাতে-পাঁচে না থাকা পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেল৷''

তিনি আরো লিখেছেন, ‘‘আমি সবসময় গর্ব করে বলতাম যে আমি এমন দু'জন সরকারি কর্মকর্তার সন্তান, যারা একটা পয়সাও ঘুস নেন নাই কখনো৷ আমার বাবার দাদা, মাওলানা আব্দুল ওহাব, বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন, শুনেছি৷ উনারা একসাথে রাশিয়া ভ্রমণেও গিয়েছিলেন৷ সেই পরিবারের সন্তান আজ নিখোঁজ৷ আমার ষাটোর্ধ বাবা মায়ের চেহারা গত ৬ দিনে হঠাৎ করেই যেন আরো বেশি বুড়িয়ে গেছে৷ আমি আর উনাদের চেহারার দিকে তাকাতে পারি না৷''

এদিকে মোবাশ্বার হাসানের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল৷ ১৩ নভেম্বর এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এই আহ্বান জানায়৷

সংকলন: অমৃতা পারভেজ

সম্পাদনা: আশীষ চক্রবর্ত্তী

নির্বাচিত প্রতিবেদন

ইন্টারনেট লিংক

বিজ্ঞাপন