সাম্প্রদায়িক এ কোন ভারত দেখছি! | বিশ্ব | DW | 29.04.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

সাম্প্রদায়িক এ কোন ভারত দেখছি!

এতটা বাড়াবাড়ি হবে, এমন ভাবে প্রকাশ্যে একজন জনপ্রতিনিধি এই কথা বলবেন, বিশ্বাস করুন, ভাবতে পারিনি।

অতীতের যাবতীয় অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক ইসলামোফোবিয়া সত্ত্বেও ভাবতে পারিনি। কারণ, এখনও তো সংবিধানের প্রস্তাবনায় জ্বল জ্বল করছে কথাগুলো, ভারত হলো সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। যেখানে চিন্তা, বিশ্বাস ও প্রার্থনার স্বাধীনতা আছে, সমানাধিকার আছে। ভারতের সেই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার ওপরে কী এই ভাবে আঘাত হানা যায়? উত্তর প্রদেশের বিজেপি-র বিধায়ক সুরেশ তিওয়ারি যা বলেছেন, তারপর বোঝা যাচ্ছে, কতটা অনায়াসে এই আঘাত করা সম্ভব।

কোনও রকম রাখঢাক না করে বিধায়কমশাই প্রকাশ্যে আবেদন জানিয়েছেন, মুসলিম সবজি বিক্রেতাদের কাছ থেকে কেউ যেন জিনিস না কেনেন। এরকম ভয়ঙ্কর উক্তি তিনি কেন করলেন? বিজেপি বিধায়কের ব্যাখ্যা, ''গত ১৭ ও ১৮ এপ্রিল আমি লোকের মধ্যে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিলি করছিলাম। আমি যখন পুরসভার সীমায় পৌঁছই, তখন ১৭-১৮ জন লোক আমার কাছে এসে অভিযোগ জানাতে থাকেন যে, তাবলিগ জামাতের সদস্যরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং করোনা ছড়াচ্ছে। তারা সবজিতে থুথু ছিটিয়ে তা দূষিত করে দিচ্ছে। আমি তাঁদের বলি, ওদের সঙ্গে লড়াই করার দরকার নেই। আইন নিজের হাতে নেবেন না। শুধু ওদের কাছ থেকে সবজি কেনা বন্ধ করে দিন। এখানে প্রচুর মুসলিম সবজি বিক্রেতা আছে। করোনার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁদের কাছ থেকে সবজি কিনতে মানা করেছি।''

তার মানে, বিধায়কের কাছে লোকেরা এসে যে কোনও অভিযোগ করবেন, তার ভিত্তিতে তিনি যে কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ফরমান জারি করে দেবেন। দেশের আইনের তোয়াক্কা না করে, যে সংবিধান অনুসারে তিনি শপথ নিয়েছেন, তা ভঙ্গ করে, দেশের মৌলিক চরিত্রকে ধুলিসাৎ করে, লোকের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে বিবৃতি দেবেন। আর পদাধিকারবলে তাঁর মূল কাজ হলো রাজ্যের জন্য আইন তৈরি করা। এই মানসিকতা নিয়ে কেমন আইন তিনি বানাবেন?

তাবলিগের জমায়েত থেকে করোনা ছড়ানোর পরে গত ৬ এপ্রিল মোট ২৫ হাজার লোককে কোয়ারান্টিন ও আইসোলেশনে পাঠানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও ১৫টি রাজ্যের প্রশাসন মিলে খুব কম সময়ে তাবলিগের জমায়েতে থাকা সব সদস্যকে খুঁজে বের করে এই কাজটা করে ফেলেছিলেন। তারপর ২৪ দিন কেটে গিয়েছে। করোনায় আক্রান্ত তাবলিগের প্রচারকারীরা হয় রোগমুক্ত হয়েছেন অথবা অসুস্থ থাকলে হাসপাতালে বা আইসোলেশনে আছেন, নয়তো করোনায় মৃত্যু হয়েছে। এই তিনটি বিকল্পের বাইরে তো আর কিছু থাকতে পারে না। তা হলে করোনায় আক্রান্ত তাবলিগের লোকেরা কী করে থুথু ফেলবেন সবজির ওপরে? এই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছবি ছাপা দিয়ে অনেক প্রচার হয়েছিল। আদতে দেখা গিয়েছে, সবই ভুয়া খবর বা ফেক নিউজ। এরপরেও যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে, তাবলিগের কেউ কেউ সবার অলক্ষে এই কাজটা করেছে, তা হলে তো বলতে হয় উত্তর প্রদেশের পুলিশ ও প্রশাসনের মতো এত ঢিলেঢালা ও অপদার্থ প্রশাসন নেই। কারণ, তাঁদের নজর এড়িয়ে তাবলিগের করোনায় আক্রান্ত রোগীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে ও সবজি দূষিত করছে। কিন্তু বাস্তবে তো দেখা যায়, যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ ও প্রশাসন খুবই কড়া হাতে সব পরিস্থিতির মোকাবিলা করে।  তা হলে?

এ বার অন্য একটি ঘটনার কথায় আসা যাক। দিল্লির লাগোয়া ফরিদাবাদের ঘটনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজনের অভিজ্ঞতা। তিনি যে মহল্লায় থাকেন, সেখানে রাতে পাহারা শুরু হয়েছে। রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় লোকেরা। করোনার বাজারে এ হেন উদ্যোগ কেন? কারণ একটা রটনা বা গুজব। করোনায় আক্রান্ত মুসলিমরা না কি রাতের বেলায় পার্কের বেঞ্চে বসে। গাড়ির হাতলে বা বাড়ির দরজায় হাত ঘষে করোনার জীবাণু ছড়িয়ে দেয়। তাই দল বেঁধে রাতভর পাহারা দেওয়া। গুজবের চরিত্রটা কীরকম ভাবে মিলে যাচ্ছে। কোথাও সবজি, কোথাও গাড়ি বা বাড়ির দরজায় জীবাণু ছেড়ে দেওয়ার প্রয়াস। এ বার পাহারা শুরু করে দেওয়া মানে লোকের মনে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া। কারণ, খুব সাধারণ বিশ্বাস হলো, যা রটে, তা কিছুটা হলেও তো বটে। ফলে গুজব পল্লবিত হতে থাকে। তা বাড়তে থাকে। দুর্জনেরা বলেন, যত বেশি লোকেগুজবে বিশ্বাস করবে, তার ফল ভোটের সময় তত স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে। তাই ধর্মনিরপেক্ষ ভারত অস্তমিত হলেই বা কী, ক্ষমতায় থাকার চাবিকাঠি তো পাওয়া যাবে অনায়াসে।

আরও চিন্তার কথা হলো, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এই ধরনের কথা বলে অনায়াসে পার পেয়ে যাওয়া যায়। উত্তর প্রদেশের বিধায়কের ক্ষেত্রে কী হয়েছে? বিজেপি সভাপতি জে পি নাড্ডা বলে দিয়েছেন, এটা বিজেপির মতাদর্শ নয়। সুরেশ তিওয়ারি দয়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি করেছেন। রাজ্য বিজেপির নেতাদের ওপর তিনি বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করেছেন, কেন বিধায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এত দেরি হচ্ছে? ব্যস, এইটুকুই। প্রশ্ন হলো, কেন ওই বিধায়কের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেউ অপমানকর উক্তি করলে সঙ্গে সঙ্গে জেলে যেতে হয়। তখন প্রবল তৎপরতায় আইন প্রয়োগ করা হয়। কোনও সন্দেহ নেই, মুখ্যমন্ত্রী সহ কারও বিরুদ্ধেই অপমানকর মন্তব্য করা উচিত নয়। আইন ভাঙলে শাস্তি পেতে হয়। তা হলে আইনভঙ্গকারী বিধায়কের বিরুদ্ধেই বা কেন প্রশাসনিক স্তরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? এখানে দলীয় স্তরে ব্যবস্থা তো যথেষ্ট নয়।

Goutam Hore

গৌতম হোড়, ডয়চে ভেলে

তাছাড়া অতীতে দেখা গিয়েছে, গো-রক্ষা বাহিনীর হাতে মার খেয়ে মরতে হয়েছে সংখ্যালঘুদের। বিভিন্ন মহল থেকে কড়া সমালোচনার অনেক দিন পরে প্রধানমন্ত্রী নিন্দা করে বলেছিলেন, এই ধরনের আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। দিল্লিতে বিধানসভা ভোটের সময় নেতা-মন্ত্রীরা চরম সাম্প্রদায়িক উক্তি করেছিলেন। কিন্তু দলের তরফ থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন শুধু তাঁদের আর প্রচার করতে দেয়নি। এমনকী গান্ধীজির হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে সমর্থন করার পরেও দলের সাংসদ সাধ্বী প্রজ্ঞার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার মানে এই উক্তি থেকে দলকে আলাদা করে নেওয়া বা খুব বেশি হলে দলীয় স্তরে সামান্য শাস্তি হতে পারে মাত্র। তার বেশি কিছু নয়। ভারতে সামাজিক মাধ্যমে আমরা সমানে এই বিষের উদ্গীরণ দেখছি। সেখানে একজনের বিরুদ্ধেও কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সম্ভবত হয়নি। হিন্দু ভাবাবেগে কেই বা আর আঘাত করবে?

তা হলে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ভারতে এই গর্জনই শোনা যাবে? তাতে কারও শাস্তি হবে না, মুষ্টিমেয়র প্রতিবাদ ধামাচাপা পড়ে যাবে সেই কলরবে। বরং এই কলরব বাড়তে বাড়তে বধির করে দেবে শুভবুদ্ধিকে। দ্রুত অথচ নিশ্চিতভাবে দেশের চরিত্রগত পরিবর্তন হয়ে যাবে। বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া সেই লাইনটাই আবার বলতে হচ্ছে, 'সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ।'

 

বিজ্ঞাপন