সাধারণ মেয়েদের অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প | বিশ্ব | DW | 03.08.2021
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

ভারত

সাধারণ মেয়েদের অসাধারণ লড়াইয়ের গল্প

তারা প্রায় সকলেই অতি দরিদ্র পরিবারের সাধারণ মেয়ে। লড়াই করে, অসাধারণ খেলে তারাই ভারতকে হকির সেমিফাইনালে তুলেছেন। 

ভারতের মেয়ে হকি খেলোয়াড়রা অনেক লড়াই করে উঠে এসেছেন।

ভারতের মেয়ে হকি খেলোয়াড়রা অনেক লড়াই করে উঠে এসেছেন।

রানী রামপাল, সবিতা পুনিয়া, বন্দনা কাটারিয়া, গুরজিত কাউর, সুশীলা চানু, দীপ গ্রেস এক্কাদের নাম কিছুদিন আগেও খুব বেশি মানুষ জানতেন না। তাদের পরিচয়, তারা প্রায় সবাই ভারতের গরিব এলাকার অতি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তাদের মিল, তারা সকলেই হকিকে ভালোবেসেছেন। তাদের কাছে হকি খেলাটাও সহজ ছিল না। কিন্তু হকির মাঠ ছিল তাদের কাছে মুক্তির জায়গা, লড়াইয়ের ময়দান, যাবতীয় বাধা-অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাঠ। ভারতের এই লড়াকু মেয়েরাই অলিম্পিকে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে যখন সেমিফাইনালে উঠলেন, তখন তাদের দিকে প্রচারের আলো পড়ল। যে দেশে যাবতীয় প্রচারের আলো নিয়ে যায় ক্রিকেট, সেখানে এই মেয়েদের লড়াই নেপথ্যেই থেকে যেত, যদি না এই সাফল্য আসত। এখানে কয়েকজন সাধারণ মেয়ের অসধারণ লড়াইয়ের কাহিনির কথা থাকল। 

রানী রামপাল

মা গৃহকর্মী, বাবা ঠেলা চালান। রোজগার দিনে ৮০ টাকা। হরিয়ানার কুরুক্ষেত্রের প্রত্যন্ত গ্রাম শাহবাদ মারকান্ডায় তার বাড়ি। সম্প্রতি দ্য বেটার ইন্ডিয়াতে সাক্ষাৎকারে রানী বলেছেন, ''আমি এমন একটা জায়গায় বড় হয়ে উঠেছি, যেখানে মেয়েদের বাড়ির চার দেওয়ালের ঘেরাটোপের মধ্যেই থাকতে হয়। তাই যখন আমি হকি খেলার কথা বললাম, তখন আমার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন কেউ সমর্থন করেননি। আমার বাবা-মা শিক্ষিত নন। তারা ভাবতেই পারেননি, খেলা নিয়েও কেরিয়ার করা যায়। মেয়েরাও করতে পারে।''

বাড়ির কাছে একটি হকি অ্যাকাডেমি দেখে তার খেলার ইচ্ছে জাগে। হকি স্টিক কেনার পয়সা ছিল না। ভাঙা স্টিক জোড়াতালি দিয়ে খেলতেন। আর আত্মীয়রা বাবাকে বলতেন, ''ছোট স্কার্ট পরে মেয়ে হকি খেললে তোমারই বদনাম হবে।''

সব প্রতিকূলতা জয় করে রানী হকি খেলেন, সব চেয়ে কম বয়সে জাতীয় টিমে সুযোগ পান। এখন তিনি ভারতের মেয়ে হকি দলের অধিনায়ক।

Japan Tokio | Olympia 2020 - Hockey: Indien v Australien

অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে ভারতের মেয়েরা।

বন্দনা কাটারিয়া

উত্তরাখণ্ডের রোশনাবাদ গ্রামের মেয়ে। অল্প বয়স থেকেই হকির দিকে টান। গাছের ভাঙা ডাল ছিল তার স্টিক। গোপনে সেই ডাল দিয়ে তিনি প্র্যাকটিস করতেন। কারণ, গ্রামের বয়স্করা দেখলেই বিপদ। তারা খেলতে দেবেন না।

ঠাকুমা বলতেন, ঘরের কাজে মন দিতে। একমাত্র তার কুস্তিগির বাবা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। টোকিও অলিম্পিকের তিন মাস আগে বাবা মারা যান। বন্দনা প্রশিক্ষণ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে শেষ দেখার জন্য যেতে পারেননি। এই যন্ত্রণা, ক্ষোভ হকির মাঠে রূপান্তরিত হয় নাছোড় লড়াইয়ে। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী হকি খেলোয়াড়, যিনি অলিম্পিকে হ্যাটট্রিক করেছেন।

সবিতা পুনিয়া

হরিয়ানার সিরসায় একটি গ্রামে বাড়ি সবিতার। ভারতের নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক। সপ্তাহে ছয়দিন শুধু হকি প্র্যাকটিস করার জন্য তিনি ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন। কারণ, এলাকায় একটি স্কুলেই হকি খেলা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। তাকেও অনেকে খেলতে নিষেধ করেছে। কিন্তু তার পাশে সবসময় ছিলেন তার প্রয়াত দাদু রঞ্জিত পুনিয়া। সবিতাও লড়ে গিয়েছেন সমানে।

সালিমা টেটে

ঝাড়খণ্ডের সিমডেগা গ্রামের মেয়ে। বাবা গরিব কৃষক। তার জেলা হলো মাওবাদী সমস্যায় জর্জরিত। যখন ধান কেটে নেয়া হতো, তখন সেই মাঠে কাঠের স্টিক নিয়ে সালিমার খেলা চলত। হকি স্টিক কেনার ক্ষমতা তার বাবার ছিল না। ১৯ বছর বয়সি সালিমা লাইভমিন্টকে বলেছেন, ''আমাদের গ্রামে সবাই হকি খেলে। যদিও কোনো পরিকাঠামো নেই।'' খেলার মধ্যে দিয়েই দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করেন তারা।

দীপ গ্রেস এক্কা

ওড়িশার সুন্দরগড় গ্রামের মেয়ে দীপ গ্রেস এক্কার পরিবারের ছেলেরা প্রায় সকলেই হকি খেলেন। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে দীপই প্রথম। তিনি হকি স্টিক হাতে নেয়ার পর আত্মীয়, প্রতিবেশীদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মেয়ে হয়ে হকি খেলা তারা বরদাস্ত করতে পারেননি। দীপ সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাকে শুনতে হয়েছে, এ কেমন মেয়ে যে, বাড়ির কাজ করে না, খালি ছেলেদের খেলা খেলে। কিন্তু তিনি সে সবে কান দেননি। আর দেননি বলেই এখন দেশের হয়ে হকি খেলছেন, জিতছেন এবং সব সমালোচনার জবাব দিতে পারছেন।

লালরেমসিয়ামি

মিজোরামের মেয়ে। বাবা কৃষক। গরিব। তাও মেয়ের স্বপ্ন সফল করতে আপ্রাণ সাহায্য করেছেন। তার পথে অনেক বাধা এসেছে। যখন জাতীয় দলে সুযোগ পেলেন তখন ইংরাজি বা হিন্দি কিছুই বলতে পারতেন না। এখন অবশ্য এই দুইটি ভাষাতেই সড়গড়। তার কাছেও খেলার মাঠই তার স্বপ্নপূরণের জায়গা।

গুরজিত কাউর

অমৃতসর জেলায় গ্রামের মেয়ে। বোর্ডিং স্কুলে গিয়ে হকির সঙ্গে পরিচয়। তার আগে হকি কী জিনিস তাই জানতেন না। তারপর শুধু পরিশ্রম ও প্রশিক্ষণ। এই গ্রামের মেয়ে গুরতেজের গোলেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ভারত।

ভারতীয় হকি দলের বাকিদের কাহিনিও প্রায় এক। অধিকাংশই গ্রমের গরিব পরিবারের মেয়ে। হকি খেলার পথে অনেক বাধা প্রত্যেককে অতিক্রম করতে হয়েছে। হকির একটুকরো মাঠ কেবল তাদের স্বপ্নপূরণের ময়দান নয়, প্রতিবাদের জায়গা, সব বাধাকে অতিক্রম করার, চ্যালেঞ্জ জিতে নেয়ার স্থান। শাহরুখ খানের চাক দে ইন্ডিয়ার গল্পের থেকেও রোমাঞ্চকর এদের লড়াই।

অলিম্পিকের এই সাফল্য তাদের প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছে। না হলে ভারতে ক্রিকেটের আলোর নীচে বাকি সব খেলাই তো অন্ধকারে ঢাকা থাকে। অলিম্পিক শেষ হলে এই সাধারণ মেয়েদের অসাধারণ হয়ে ওঠাও হয়ত আবার প্রচারের বাইরে চলে যাবে। তা সত্ত্বেও এই মেয়েরা তাদের গ্রামে, জেলায়, রাজ্যে অন্য মেয়েদের ঠিকই প্রভাবিত করতে পারবেন, স্বপ্ন দেখাতে পারবেন। সেইটাই বড় কথা।