সাংবাদিকতা এখন আপোশকৃত চতুর্থ স্তম্ভ! | আলাপ | DW | 08.11.2019
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

সাংবাদিকতা এখন আপোশকৃত চতুর্থ স্তম্ভ!

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের যে বিস্ফোরণ শুরু হয়েছে তার পরিধি বাড়ছে৷ ৬৭৮টি সরকারি নথিভুক্ত পত্রিকা, ৭০টিরও বেশি রেডিও-টিভি চ্যানেল আর অগণিত অনলাইন পোর্টাল৷

সংখ্যার দিক থেকে বিস্ফোরণকে সমর্থন করে৷ কিন্তু বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমের সমাহার বাংলাদেশে দুই ইজম'র (জার্নালিজম ও প্রফেশনালিজম) বিতর্ককে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে৷ সম্প্রতি তরুণ সাংবাদিকদের পেশা ত্যাগ, সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনিয়মিত বেতন-ভাতা, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, স্বাধীন সাংবাদিকতায় নানামুখী চাপ ইত্যাদি কারণে পেশাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন পেশার অবনমন ঘটেছে এবং ঘটছে৷ অনেককে হা-হুতাশ করে বলতে শোনা যায়, হিকি কিংবা কাঙাল হরিনাথের সময়, এমনকি খোদ স্বৈরশাসকের আমলেও সাংবাদিকতার এমন দুর্দিন ছিল না৷ অর্থাৎ বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বের সঙ্কট উত্তরোত্তর বাড়ছে৷ এ আশঙ্কার বাণীটি সত্য বলে ধরে নিলে এককথায় এর উত্তর দেয়া কঠিন৷ বাংলাদেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থা, এর পরিচালন ব্যবস্থা, রাষ্ট্র-সরকারের সাথে পেশাজীবীদের সম্পর্ক, সাংবাদিকতার মান৷এমন অনেক বিষয়ের সাথে পেশাদারিত্বের সঙ্কটের বিষয়টি জড়িত৷

ডেনিয়েল সি. হালিন এবং পাওলো মানচিনি ২০০৪ সালে পশ্চিমের ১৮টি দেশের তুলনামূলক চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ব্যবস্থার তিনটি মডেলের কথা বলেছেন৷ সেগুলো হলো- ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর সমবর্তিত বহুত্ববাদী মডেল, উত্তর/মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর গণতান্ত্রিক কর্পেরেট মডেল এবং উত্তর আটলান্টিক দেশগুলোর উদারবাদী মডেল৷ আমাদের দেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে প্রথম মডেলের মিল খুঁজে পাওয়া যায়৷ আটটি দেশের (স্পেন, ইটালি, ফ্রান্স, গ্রিস, পর্তুগাল, তুরস্ক, মাল্টা ও সাইপ্রাস) গণমাধ্যম ব্যবস্থা এই সমবর্তিত বহুত্ববাদী মডেলের অন্তর্ভুক্ত৷ এসব রাষ্ট্র ও তাদের গণমাধ্যম ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো হলো৷এসব দেশে গণতন্ত্র এসেছে দেরিতে এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত বিদ্যমান ছিল, সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা বা সার্কুলেশন কম, এডভোকেসি রিপোর্টিং ও মন্তব্যধর্মী সাংবাদিকতার সংস্কৃতি প্রবল, ব্যক্তি ও বেসরকারি মালিকাধীন গণমাধ্যমের সংখ্যা বেশি, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার ও সম্প্রচার নীতিমালার রাজনীতিকরণ এবং একটি স্বাধীন পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার বিকাশের গতি খুবই মন্থর৷

Bdnews-Deutsche Welle Talkshow (bdnews24.com)

মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষিণ ইউরোপ এবং আফ্রিকার দেশগুলোর মত আমাদের দেশের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হলো রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমতি/লাইসন্সে প্রাপ্তি এবং কর্পোরেট স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে পরিচালনা নীতি৷ গুটিকয়েক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে থাকা মালিকানা শুধু গণমাধ্যমের কাঠামো নির্ধারণ করে না, বরং আধেয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে৷ আমাদের গণমাধ্যমের সংবাদ কিংবা অনুষ্ঠান-উভয় ক্ষেত্রই দুটি বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ৷ একটি বলয়ে আছে রাজনীতি, আরেকটি বলয়ে তিন সি'- ক্রিকেট, ক্রাইম আর সিনেমা৷ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরতার কারণে সম্পাদকরা এখন কর্পোরেট সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপক' আর সাংবাদিকেরা কর্পোরেট সম্পাদকীয় কর্মকর্তা'৷ কর্পোরেট পলিসি আর সম্পাদকীয় নীতিতে ফারাক থাকছে না৷ সাংবাদিকরা কখনও সরকারি পাপেট, কখনও বহুজাতিক কোম্পানির পাপেট হিসেবে কাজ করে৷ পাঠক/দর্শকের কি জানা উচিত তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিজ্ঞাপনদাতা ও মালিকপক্ষ কি জানাতে চায়৷ সাথে যোগ হয়েছে অদৃশ্য নির্দেশনা বা টেলিফোনের ভয়৷ স্বৈরাচারী এরশাদের সময় মধ্যরাতের প্রেস এডভাইসে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জা পাল্টে যেত৷ ২৪ ঘন্টার সংবাদের আমলে এই এডভাইস দিব্যলোকেই ঘটছে৷ ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে দিন-দুপুরে এডভাইস দানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে৷ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সেলফ-সেন্সরশিপের জন্ম হয়৷ ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে যে ভয়ের সংস্কৃতি জন্ম নেয় তাতে সাংবাদিকরা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে চান না৷ 

সাংবাদিকতার পেশাদারিত্বের সঙ্কটের এই প্রেক্ষাপটকে ধাক্কা দেয়ার জন্য দরকার শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও সাংবাদিকদের ঐক্য৷ দু'টিই আমাদের দেশে বিরল৷ আমাদের সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আইন না থাকলেও তাদের শেকল পরানোর মতো আইন ও নীতিমালার সংখ্যা অর্ধশতের কাছাকাছি৷ সবশেষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাইবার অপরাধী ও সাংবাদিকদের একই কাতারে সামিল করার চেষ্টা পেশাদারিত্বে শৃংখল বাড়িয়েছে৷ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্রগুলো দেখিয়েছে চাপকে ঠেকাতে নিজেদের মধ্যকার ঐক্য কতখানি জরুরি৷ কিন্তু বাংলাদেশে পেশাদারি সাংবাদিকতার জন্য বিষফোঁড়া'র মত প্রতিবন্ধকতা হলো সাংবাদিকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও দলাদলি৷ জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে সাংবাদিক ইউনিয়ন দু'ভাগে বিভক্ত৷ দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে এডভোকেসি সাংবাদিকতার প্রবণতা ব্যাপক হারে বাড়ছে৷

এসব কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে চাকরির সন্তুষ্টির হার প্রায় শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে; অনেকেই অন্তর্বর্তীকালীন পেশা খুঁজছেন৷ সঙ্কট রাজধানীর চেয়ে মফস্বলেই বেশি৷ ফলশ্রুতিতে পেশায় দক্ষ ও যোগ্য কর্মীর অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে৷ উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গুজব বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন, তথ্যের বিকৃতি, সূত্র উল্লেখের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি, তথ্য ও মতামতের মিশ্রণ, ভাষাগত ত্রুটি, সংবাদমূল্য নির্ধারণে পক্ষপাত, সংবাদের আদলে বিজ্ঞাপন৷সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নৈতিকতার এসব মৌলিক জায়গাগুলোতে স্খলন বেড়েছে৷ এখনকার সাংবাদিকেরা সৃজনশীলতা এবং নৈতিকতার চাইতে ব্রেকিং নিউজ আর প্রেসের পাস-সুবিধা নেয়া কিংবা বিদেশ ভ্রমণের পিছনে দৌঁড়াতে বেশি আগ্রহী৷

বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাংবাদিকতা এখনও আমাদের কাছে অকুপেশন'; এটি প্রফেশন' হয়ে উঠতে পারছে না৷ এই দু'য়ের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য ক্ষীণ হতে পারে, কিন্তু খুব শক্তিশালী৷ যেমন চলছে তাতে জীবিকার জন্য সাংবাদিকতা একটি চাকরি হতে পারে৷ কিন্তু পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে সত্যিকারের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করতেই হবে৷ 

প্রিয় পাঠক, আপনার কি কিছু বলার আছে? লিখুন নীচের মন্তব্যের ঘরে৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন