1. কন্টেন্টে যান
  2. মূল মেন্যুতে যান
  3. আরো ডয়চে ভেলে সাইটে যান

‘‘সরকার যতটুকু দড়ি ছাড়ে আমলারা ততদূরই যায়’’

সমীর কুমার দে ঢাকা
২৭ আগস্ট ২০২১

ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান৷ শহীদ খানের মতে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর কেউ আগের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে সেটা দিতে পারেন না৷ এটা অনৈতিক৷

https://p.dw.com/p/3zZs1
ছবি: bdnews24.com

ডয়চে ভেলে : বর্তমানে কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কতটা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন?

আবু আলম মো. শহীদ খানপ্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে যেসব গণকর্মচারী কাজ করেন , তারা সব সময় চাপের মুখে থাকেন৷ তারা ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন, জনসেবা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন৷ যেমন ধরেন কেউ জমি দখল করে রেখেছে, সেটা উদ্ধার করতে গেলে প্রভাবশালীরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ তখন তারা গণকর্মচারীদের উপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন, যেটা অতীতেও করেছেন৷ এই প্রভাবশালীদের মধ্যে প্রথমেই রাজনীতিবিদ, তারপর ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ আরো অনেকেই আছেন৷ এই যে চাপ সৃষ্টি বা কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং তাদের উপর খড়গহস্ত হওয়া, তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা, ঘেরাও করা, বাসা আক্রমণ করা এই ধরনের ঘটনা বর্তমানে অনেক বেড়ে গেছে৷ এটা খুবই উদ্বেগজনক৷   

আমলাদের রাজনীতিক দায় থাকা উচিত কি?

আমলাদের তো রাজনৈতিক দায় নেই৷ কারণ তারা তো রাজনীতি করে না৷ বিধিবিধান অনুসারে গণকর্মচারীরা কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না৷ এমনকি রাজনৈতিক সভা সমাবেশে যোগ দিতে পারবেন না৷ সেটা করলে তো তারা অপরাধ করবেন৷

আমরা অনেক সময় দেখছি, প্রশাসনের কর্মকর্তারা অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করছেন৷ এই পরিচয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

এই পরিচয় উল্লেখ করা অনৈতিক৷ কোন কোন ক্ষেত্রে এটা অপরাধের পর্যায়েও পড়ে৷ আমরা তো ছাত্রজীবনে অনেকেই ছাত্র বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারি৷ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, এই যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা পরে মাঠ প্রশাসনে জনগণের সঙ্গে কাজ করতে উপকারে আসে, এই কাজটা তখন সহজ হয়ে যায়৷ কীভাবে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হয়, কীভাবে সংগঠন তৈরি করতে হয় সেই অভিজ্ঞতা তার থাকে৷ কিন্তু তার রাজনৈতিক পরিচয় প্রশাসনে কাজ করার সময় তিনি যদি সামনে নিয়ে আসেন তাহলে সেটা হবে অনৈতিক৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা অপরাধ হতে পারে৷ আমাদের যে তিনটা বিভাগ আছে, আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ তারা প্রত্যেকেই কিন্তু পৃথকভাবে কাজ করেন৷ আরেকটি কারণে আপনি পরিচয় দিতে পারেন না, আপনি ধরেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা থানার পুলিশ কর্মকর্তা বা যে পর্যায়ে কাজ করেন, আপনি তো সকল জনগণের জন্য কাজ করছেন৷ তার মনে আপনি যদি রাজনৈতিক পরিচয় দেন তখন তো বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজন মনে করবেন তারা আপনার কাছে ন্যায়বিচার পাবেন না৷ সেটা অল্প সংখ্যক লোক হতে পারে বা অনেক বেশি সংখ্যক মানুষও কিন্তু নিজেদের বঞ্চিত মনে করতে পারেন৷ এটা প্রশাসনের জন্য ভালো নয়৷ আর এই ধরনের পরিচয় মূলত সুবিধা নেওয়ার জন্যই দেওয়া হয়৷

বরিশালের ইউএনওকে আমরা দেখলাম উনি নিজের অবস্থান ব্যাখা করতে গিয়ে আগে ছাত্রলীগ করতেন বলে দাবি করলেন৷ একজন ওসিকে দেখলাম রাজনৈতিক সমাবেশে দলীয় শ্লোগান দিলেন৷ এটার প্রয়োজন পড়ে কেন?

এটার কোন প্রয়োজন নেই৷ আমাদের দেশে কিন্তু হাজার হাজার কর্মকর্তা আছেন তারা এসব না করেই করেই চাকরি করছেন৷ এই ঘটনাগুলো এক বা দুই পারসেন্টের ক্ষেত্রে৷ এরা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্যই এসব করেন৷ বরিশালের ইউএনও যদি এটা বলে থাকেন, তাহলে হয়ত তিনি এত চাপের মুখে ছিলেন যে তারও একটা পরিচয় ছিল সেটা বলার চেষ্টা করেছেন৷ এটা তার বলার কোন দরকার ছিল না৷ কিন্তু রাজনৈতিক দলের সমাবেশে যোগ দিয়ে কারো পক্ষে কাজ করতে বলা বা কাউকে জিতিয়ে দিতে বলা সেটা কোনভাবেই আইনসিদ্ধ নয়৷ বরং আইন বিরুদ্ধ৷

অনেক সময় দেখা যায়, প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার বিচ্যুতি নিয়ে তদন্ত করতে গিয়ে পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয় দেখা হচ্ছে৷ এটা কেন হচ্ছে?

এই সমস্যাটা তৈরি হয়েছে৷ এটা উচিৎ না৷ প্রশাসনে যারা যোগ দেন তারা তো বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে আসেন৷ তাদের পরীক্ষা-ভাইবা হওয়ার পর কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়৷ সেখানে দেখা হয় তিনি কোন ক্রিমিনাল এ্যাক্টিভিটিজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি-না৷ এখন যে ভেরিফিকেশন সেটা অনেক বেশি রাজনৈতিক৷ সেটা আমি ঠিক মনে করি না৷

বিসিএস পরীক্ষার পর চাকরিতে যোগদানের আগে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়?

এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কি-না এমন অভিযোগ আছে৷ অনেককে বাদ দেওয়া হচ্ছে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য বলে৷ এনএসআই বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে৷ আসলে তো এই প্রতিবেদনগুলো নেওয়া হয় তিনি আগে কোন ফৌজদারি অপরাধ করেছেন কি-না৷ তার বিরুদ্ধে কোন মামলা মোকদ্দমা আছে কি-না তা জানতে৷ কিন্তু এটা দেখার বিষয় না, যে তার বাবা কোন দল করতেন বা তিনি কোন ছাত্র সংগঠন করতেন৷ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এগুলো নাকি এখন দেখা হয়৷ এটা অন্যায়৷ এটা করা ঠিক না৷ বর্তমান শাসকদলই যে এমন করছে তা কিন্তু নয়৷ আগেও এমনটা করা হয়েছে৷ জোট সরকারের সময় আমরা দেখেছি, শুধু মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে কাউকে চাকরি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল৷ এটা শুধু অন্যায় না, সংবিধান বিরুদ্ধ৷ 

আবু আলম মো. শহীদ খান

প্রশাসনের কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠা অনিয়ম বা দুর্নীতির তদন্ত অনুমতি ছাড়া বাইরের কোন সংস্থা করতে পারে না৷ এতে কি কর্মকর্তারা অনেক বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠছেন কি-না?

এর দুইটা দিক আছে৷ আমরা যদি নাম্বারটা বিবেচনা করি, কতজনের এই সুযোগ আছে স্বেচ্ছাচারী হয়ে যাওয়ার৷ আসলে সুযোগ নেই৷ আমাদের ১৭ থেকে ১৯ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা৷ এটা সারা বিশ্বেই আছেই যে, এমনকি বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও তারা ভালো মনে যে কাজটা করবেন সেটার জন্য তার বিরুদ্ধে কোন ক্রিমিনাল অভিযোগ আনা যাবে না৷ যেমন ধরেন বরিশালে গুলি ছুড়ল সেখানে কয়েকজন আহত হলেন৷ এই গুলি চালানোর ব্যাপারে এক্সিকিউটিভ ইনকোয়ারি হবে৷ তখন যদি দেখা যায়, এটা অন্যায় হয়েছে তাহলে কিন্তু তিনি বিচারের আওতায় আসবেন৷ কিন্তু তার আগে তার বিরুদ্ধে কেউ মামলা করবে এবং বিচার শুরু হবে, সেই কারণেই এই সুরক্ষাটা দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু একজন সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী মার্ডার, রেপ বা এই ধরনের কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন তাহলে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোন বাধা নেই৷ এইটা দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র অধিক্ষেত্রে৷ যেমন বালুমহলে কোন একটা গোলমাল হল বা উচ্ছেদে গিয়ে কোন ঝামেলা হল সেই সব ক্ষেত্রে৷ আর দুদুকের ক্ষেত্রে তদন্ত করতে বাধা নেই৷ শুধুমাত্র চার্জশিট দিতে গেলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে৷  

অনেক সময় আমরা দেখি, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজনীতিকদের কোন ঝামেলা হওয়ার পর সমঝোতা হয়৷ কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত হয়, মামলাও হয়, সেখানে কী সমঝোতার সুযোগ থাকে?

আমাদের একটা তালিকা আছে৷ ওই তালিকার মধ্যেই থাকতে হবে৷ আমাদের পেনাল কোডে দু'টি জিনিস লেখা আছে, একটা আপসযোগ্য, আরেকটা আপসযোগ্য নয়৷ যেটা আপসযোগ্য নয়, সেটাতে কিন্তু আপনি আপস করতে পারবেন না৷ সেটার তদন্ত হবে এবং অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে৷

মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেটা আছে সেটা কি পর্যাপ্ত?

যারা প্রভাবশালী আছেন তারা তো প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবেনই৷ এটার চাপ সবসময় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপর থাকে৷ শুধু প্রশাসনে যারা কাজ করেন তাদের উপরই যে চাপ আসে তা কিন্তু নয়৷ বর্তমানে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপর চড়াও হওয়ার মাত্রাটা বেড়ে গেছে৷ এই কারণে আনসার গার্ড দেওয়া হয়েছে৷ কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থাই কিন্তু ফুলপ্রুফ না৷ তাদের নিরাপত্তাটা আসলে জনগণ দেবে৷ কাজটা তারা জনগণের সঙ্গে করেন৷ তিনি ভালো কাজ করলে জনগনই তার নিরাপত্তা দেবে৷ সবসময় তো তিনি পুলিশ-আনসার নিয়ে ঘুরতে পারবেন না৷ এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তন আনতে হবে৷ তাদের মনে করতে হবে, গণকর্মচারীদের কাজে সহায়তা দেওয়াও তাদের একটা কাজ৷ এই দায়িত্ব বোধটা যতক্ষণ জাগ্রত না হবে, ততক্ষণ পুলিশ-আনসার দিয়েও তো ঝামেলা মুক্ত হতে পারবেন না৷

বর্তমান সময়ে আমলারা কী একটু বেশি ক্ষমতাবান হয়ে পড়েছেন কি-না? আপনি কী মনে করেন?

আমি ঢালাওভাবে এটা মনে করি না৷ তবে কোন কোন আমলা নিশ্চয় ক্ষমতাবান৷ আমাদের বিসিএস সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এসোসিয়েশনের বিবৃতিটা যদি আমরা দেখি, সেখানে সভাপতি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটা অবশ্যই যৌক্তিক ছিল না৷ অনাকাঙ্খিত ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে৷ একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, সরকার চালায় কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা এবং শাসকদল৷  গণকর্মচারীরা সরকার চালায় না৷ এখন সরকার  গণকর্মচারীদের যতটুকু দড়ি ছাড়বে তারা ততদূরই যেতে পারবে৷ বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না, ছাগল নাচে খুটার জোড়ে৷ আপনি খুটা থেকে দড়িটা যতদূর দেবেন সে ততদূর পর্যন্ত ঘাস খেতে পারবে৷ আপনাকে তো ততদূর পর্যন্ত তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে যেন ধান ক্ষেত সে না খেতে পারে৷ এটা যারা রাষ্ট্র চালান তাদের দায়িত্ব৷ আইনসভা এই কাজটা ঠিকমতো না করতে পারলে গণকর্মচারীরা অবশ্যই আপারহ্যান্ড নেবে৷ কেউ যদি সীমা লঙঘন করে তাহলে তাকে তো শাস্তি দিতে হবে৷ এখন আপনি যদি শাস্তি না দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকেন তাহলে তারা তো আপারহ্যান্ড নেবে, এতে তাদের দোষ দিয়ে তো লাভ নেই৷