সরকারি কর্মচারীদের ঘাস চাষ বা খিচুড়ি রান্না শেখা ভ্রমণের মনস্তত্ত্ব | আলাপ | DW | 04.12.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

সংবাদভাষ্য

সরকারি কর্মচারীদের ঘাস চাষ বা খিচুড়ি রান্না শেখা ভ্রমণের মনস্তত্ত্ব

জনজীবনের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এদেশে হাসি-রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷ এটা জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টদের একটি সার্থকতা৷ তবে আজকের বিষয়, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বিষয়ে৷

সরকারি কর্মকর্তাদের বিষয়ে যাওয়ার আগে একজন ‘হঠাৎ প্রতিমন্ত্রী’র একটি ঘটনা বলি৷ কারাগারের মান-উন্নয়ন কি করে করা যায়, সরেজমিন পরিদর্শন করা করা দরকার৷ বেছে নেওয়া হলো কানাডা৷ কিন্তু কানাডার কারাগারের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া গেল না৷ প্রতিমন্ত্রীকে গাড়িতে কারাগারের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখানো হলো৷ এই সংবাদগুলো যখন থেকে আসতে শুরু করলো, মানুষের হাসির খোরাক যোগানো তখন থেকেই শুরু হলো৷

সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ যাওয়ার সংবাদ যখন সামনে আসতে শুরু করলো, প্রথমে মানুষ ধাক্কা খেলো৷ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো-সত্যি? যখন দেশের মানুষ জানলো, দুটি ক্যামেরা কেনার জন্যে তিনজন সরকারি কর্মকর্তা জার্মানি গেছেন!

বিস্ময়ের সকল সীমা ছাড়িয়ে গেল৷ বিস্ময় তখন হাসি রসিকতায় পরিণত হলো৷

প্রশ্ন হলো, এর কারণ কী বা মনস্তাত্তিক ব্যাখ্যা কী? সঠিক ব্যাখ্যা জানা যেত যদি কোনো সমাজবিদ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতেন৷ তা কেউ করেন নি৷

সাধারণভাব বোঝা যায়, গণতন্ত্র বা জবাবদিহিতাহীন সরকার ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারিতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে৷ বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ছাড়া ব্যবস্থাপনা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে৷ নির্বাচনই গণতন্ত্র বা জবাবদিহির একমাত্র উপাদান নয়৷ তবে বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রে নির্বাচন গণতন্ত্র বা জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রধানতম উপাদান৷ ভোট দেওয়ার ক্ষমতা ছাড়া জনগণের হাতে আর কোনো ক্ষমতা থাকে না,যা দিয়ে তারা রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে পারে৷ প্রশ্ন থাকলেও দেশে এর প্রতিফলন দৃশ্যমান হয়েছিল ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৯ সালে৷ ২০১৪ সাল থেকে যা আর কার্যকর নেই৷ ভোট ছাড়া নির্বাচন বা দিনের ভোট রাতে হয়ে যাওয়ার নির্বাচনি ধারার প্রচলন হয়েছে বাংলাদেশে৷ নির্বাচন বিষয়টিও হাসি-রসিকতায় পরিণত হয়েছে৷

জনগণকে ক্ষমতাহীন করে দেওয়া সরকার পদ্ধতিতে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে প্রশাসন৷ যা বাংলাদেশে এখন যে কোনো বিবেচনাতেই তা দৃশ্যমান৷ প্রশাসন বা সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে এবং তারাই সরকারকে ক্ষমতায় রাখছে, এটা তাদের বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে৷ ফলে সরকারি কর্মকর্তা পর্যায়ে এমন মানসিকতা গড়ে উঠেছে যে,আমাদের অনেককিছু পাওয়ার আছে৷ নিয়ম-নীতি বহির্ভূত হলেও, তা পেতে হবে৷ এই মানসিকতার একটি প্রকাশ বিদেশ ভ্রমণ৷ একথাও সত্যি যে, বিদেশ ভ্রমণপ্রীতি সরকারি কর্মকর্তাদের ভেতরে সব সময়ই ছিল৷ এখন তা বেড়েছে৷ সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে চক্ষু-লজ্জা৷

গণমাধ্যমের কারণে বিদেশ ভ্রমণের অযৌক্তিক কিছু ঘটনা যখন প্রকাশিত হয়,তখন তারা লজ্জা পান না৷ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন৷ ‘সাংবাদিকেরা কিছু জানে না’-এই তত্ত্ব নিয়ে সামনে এসে কথা বলেন৷

‘ঘাস চাষ শিখতে’ বিদেশ যাওয়ার পক্ষেও তাদের যুক্তি দিতে দেখা যায়৷ ‘পুকুর পুনখনন’ ‘খিচুরি রান্না শেখা’র মতো বিদেশ সফরকেও তারা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন৷ গণমাধ্যমের চাপে যখন তাদের এমন কিছু ভ্রমণ বাতিল হয়ে যায়, তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করতে থাকেন৷ আমরাই সরকারকে ক্ষমতায় রেখেছি, আর আমাদেরকে নিয়ে কথা! মানসিকতা থাকে এমনই৷

কিন্তু এতে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় খুব একটা ব্যাঘাত ঘটে না৷ একটি পরিকল্পনা বন্ধ হলে, দশটি পরিকল্পনা নিয়ে তারা অগ্রসর হন৷তাদের কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় না৷ সরকার পরিচালনারারীরা তাদের বিষয়ে তদন্ত-শাস্তি তো দুরের কথা, কিছু জানতেও চাইতে পারে না৷ ফলে তারা হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য৷

গোলাম মোর্তোজা, সাংবাদিক

গোলাম মোর্তোজা, সাংবাদিক

বাংলাদেশে প্রকল্প নির্ভর দেশ৷ বিদেশী ঋণের প্রকল্পে চলে দেশ৷ যারা ঋণ দেয় ও প্রকল্প প্রণয়নে ভূমিকা রাখে,তারা এটা জানে যে একাধিক বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ না থাকলে, সরকারি কর্মকর্তারা প্রকল্প পাস করবেন না৷ ফলে তারাও যে কোনো প্রকল্প প্রণয়নের সময় মূলত দুটি দিক খেয়াল রাখেন৷ একটি নতুন গাড়ি কেনা এবং অন্যটি বিদেশ ভ্রমণ৷বিদেশ ভ্রমণ বা গাড়ি কেনা দেশের জন্যে কতটা উপকরী বা আদৌ দরকার আছে কিনা, তা বিবেচনায় থাকে না৷

বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গে ভাতা সম্পৃক্ত থাকে, আত্মীয় বা বন্ধুর বাসায় থেকে অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ তারকা হোটেলের ভাড়ার সমপরিমাণ ডলার তুলে নেওয়া যায়৷ আর দেখা হয় নতুন নতুন দেশ৷ একারণে অনেক সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণে স্ত্রী-সন্তানদেরও ‘নিজ খরচে’ সঙ্গী করেন৷

রাজনৈতিক সরকার যদি শক্তিশালী না হয়, সরকার যদি জনগণের উপর নির্ভর না করে সরকারি কর্মচারীদের উপর নির্ভর করে ক্ষমতায় থাকে, তবে অন্যান্য অনিয়ম-দুর্নীতির মতো বিদেশ ভ্রমণও বন্ধ হবে না৷ কমবেও না৷ সরকারি পর্যায়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি হবে৷ চেষ্টা থাকবে তথ্য যাতে প্রকাশিত না হয়, সাংবাদিকরা যেন না জানে৷ চাপা দেওয়া সমাধানে বিশ্বাসী বাংলাদেশ৷ ধারণা করি,আগামি দিনে সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণও চাপা দিয়ে বা গোপনে করার কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়িত হবে৷

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন