সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ বনাম ‘ঘোড়ার ঘাস কাটা’ | বিশ্ব | DW | 04.12.2020
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ

সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ বনাম ‘ঘোড়ার ঘাস কাটা’

বাংলাদেশে এই সময়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ৷ ঘাস চাষ থেকে খিচুড়ি রান্না সব ধরনের প্রশিক্ষণেই এখন কর্মকর্তারা বিদেশে যান৷ এই ‘ঘোড়ার ঘাস কাটার’ প্রশিক্ষণে প্রজাতন্ত্রের কী লাভ? খরচই বা কেমন?

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দুইভাবে বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওযার সাধারণ সুযোগ আছে৷ উচ্চশিক্ষা এবং কোনো প্রকল্পের বিশেষ কোনো কাজের জন্য জ্ঞান অর্জন৷ এর বাইরে মন্ত্রীদের সঙ্গে বিদেশ সফরেরও একটা সুযোগ থাকে৷ সেখানেও অনেক বড় বহর যায়৷ আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ীরাও সুযোগ পান৷

সর্বশেষ ঘাস চাষ, খাল খনন, পুকুর কাটা, খিচুড়ি রান্না, কাজু বাদাম চাষ এবং উঁচু ভবন দেখার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রস্তাব নিয়ে শুধু সমালোচনাই নয়, বেশ মুখরোচক আলাপ হচ্ছে৷

বিদেশ সফরের অনুমোদন চূড়ান্তভাবে দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়৷ এর আগে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়ে একনেকে পাস হতে হয়৷ তাই প্রশ্ন উঠেছে এটা অনুমোদন হওয়ার সময় কেউ কি দেখেন না৷ জানা গেছে যারা এগুলো দেখবেন তারা বা তাদের আস্থাভাজন লোকেরাই এই সফরে অন্তর্ভুক্ত হন৷ আর এটাকে অনেক সময়ই বিবেচনা করা হয় উপহার বা সুযোগ সুবিধা হিসেবে৷ সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দেয়া হয় কিছুটা রিফ্রেসমেন্ট, তাজমহল বা স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখার সুযোগ হিসেবে৷ আর উচ্চশিক্ষার জন্য যারা বিদেশ যান তাদের ওই শিক্ষা সরকারের কোনো কাজে লাগার উদাহরণ তেমন নেই৷

এই প্রশিক্ষণের জন্য সরকারের যে খরচ হয় তার জন্য বাজেটে আলাদাভাবে কোনো বরাদ্দের খাত নেই৷ প্রতিটি মন্ত্রণালয় সারা বছর খরচ করে আর বছর শেষে সম্পূরক বাজেটে তা পাস করিয়ে নেয়৷ কেন্দ্রীয়ভাবে জানার সুযোগ নেই যে কোনো একটি বছরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে কত খরচ৷

তারপরও সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণ বাবদ ৩০৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা খরচের একটি হিসাব পাওয়া যায়৷ আর ২০২২ সাল পর্যন্ত আরো ২২ কোটি টাকা খরচের প্রস্তুতি আছে৷ তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এই খরচ আসলে কোনো প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে বিদেশে যাওয়ার খরচ নয়৷ এটা সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য খরচ৷ সরকারি কর্মকর্তারা বিদেশে ডিপ্লোমা, মাস্টার্স ও পিএইচডি করার সুযোগ পান৷ এই খরচ তার জন্য৷ ওই সময়ে বিসিএস কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদেশে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন ৫৭৭ জন, ডিপ্লোমা ১৫৭ জন ও সংক্ষিপ্ত কোর্স করেছেন এক হাজার ৭১৭ জন৷ এই তথ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের৷

এই সময়ে আলোচিত ৩২ কর্মকর্তার ঘাস চাষের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রস্তাব৷ প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের ‘প্রাণীপুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ নামের এই প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে ১০১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা৷ এর মধ্যে উন্নত জাতের ঘাস চাষের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ জনের প্রত্যেকের জন্য ১০ লাখ টাকা৷ আর কাজু বাদাম চাষের প্রশিক্ষণ নিতে কৃষি বিভাগের ১৬ জন কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের খরচ ধরা হয়েছিলো ৫৪ লাখ টাকা৷

তবে সবার উপরে আছে খিচুড়ি রান্না প্রশিক্ষণ! এই প্রশিক্ষণে ‘প্রাইমারি স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম’-এর আওতায় এক হাজার কর্মকর্তার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল৷ আর সেজন্য খরচ ধরা হয়েছিল পাঁচ কোটি টাকা৷ এই প্রকল্পেই আবার দেশে প্রশিক্ষণের জন্য চাওয়া হয়েছিল ১০ কোটি টাকা৷

অডিও শুনুন 04:17

সরকারি খরচে বিনোদন ভ্রমণ: হাফিজ উদ্দিন খান

জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে এপর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ৩৬টি বিদেশ সফর হয়েছে৷ এরমধ্যে উচ্চশিক্ষা ছাড়াও নানা ধরনের পেশাগত প্রশিক্ষণের কর্মশালা রয়েছে৷ পিএইচডি করতে গেছেন একজন৷ ২০১৯ সালে সালে ৮৫টি এবং ২০১৮ সালে ৭৫টি৷ তবে এর মধ্যে প্রকল্পের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণের তথ্য নেই৷
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত অডিটর এন্ড কম্পট্রোলার জেনারেল হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘‘বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে৷ কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে সরকারি খরচে বিনোদন ভ্রমণ৷ দেশের বাইরে গিয়ে পরিবারের জন্য শপিং, সাইট সিয়িং বা তাজমহল দেখা হচ্ছে৷ এটা সরকারি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়৷’’

‘‘তবে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প ভিত্তিক যে কাজে আমাদের দক্ষতা নাই সেক্ষেত্রে যাদের প্রয়োজন তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো যেতে পারে৷ তবে তারা ফিরে এসে যাতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারে,’’ বলে তিনি৷

বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানাগেছে অনেক প্রশিক্ষণই কোনো কাজে লাগে না৷ দেখা গেল অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো একজন উপ সচিবকে আধুনিক বাজেটিং নিয়ে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হল৷ দেশে ফির আসার পর তাকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হলো৷ আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পর সেই কর্মকর্তা অবসরে চলে গেছেন৷

অডিও শুনুন 00:45

অতিরঞ্জন আছে বলে আমার মনে হয়না: নঈম নিজাম

হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, ‘‘দেশেই এখন ভালো প্রশিক্ষণ হয়৷ প্রয়োজনে আরো উন্নত ইন্সটিটিউট দেশেই গড়ে তোলা যায়৷ আর পিএইচডি করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার দরকার নাই৷ এখানেই করতে পারেন৷’’ তিনি প্রশ্ন করেন, দেশের বাইরে এত প্রশিক্ষণ দেয়ার পরও বিদেশি পরামর্শক লাগছে কেন?

তবে এই প্রশিক্ষণ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সমালোচনাও আছে৷ তারা মনে করছেন মূল বিষয় না বুঝেই সংবাদমাধ্যম চটকদার হেডিং করে কাটতি বাড়াচ্ছে৷ তারা বলছেন খিচুড়ি রান্নার প্রশিক্ষণ নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে না বোঝার কারণে৷ এটা আসলে স্কুল পর্যায়ে মিড ডে মিলের পুষ্টি বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ৷ আর ঘাস চাষের বিষয়টিও অতিরঞ্জিত৷ মূল বিষয়টি হলো বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্পের উন্নয়ন৷

কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘‘সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিয়ে যে কয়টি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে সংবাদমাধ্যমে তা সঠিক ও তথ্যভিত্তিক৷ অতিরঞ্জন আছে বলে আমার মনে হয়না৷ সরকারি পর্যায়ে এটা মনে করা হলে তারাও কথা বলতে পারেন৷ তথ্য উপস্থাপন করতে পারেন৷’’

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বিজ্ঞাপন