সমাধিকে ঘর বানালেন মোনা | বিশ্ব | DW | 09.06.2017
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ভারত

সমাধিকে ঘর বানালেন মোনা

দক্ষিণ এশিয়ায় হিজড়া হয়ে জন্মগ্রহণ করা একটা অপরাধের মতো৷ কেবল হিজড়া হওয়ার কারণেই তাঁদেরকে সব হারাতে হয়, পরিবারও তাঁদের ত্যাগ করে৷ গৃহত্যাগী হয়ে কষ্টে কাটানো জীবনে তাঁরা স্বপ্ন দেখেন ফের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার৷

নয়া দিল্লির মোনা আহমেদ সে রকম একটি সুযোগ পেয়েও ছিলেন৷ তবে কাঙ্ক্ষিত সেই জীবনে বেশি দিন থাকতে পারেননি৷ এ কারণে ফিরে আসেন নিজের পরিচিত দুনিয়ায়৷ ফিরে এসে ঘর হিসাবে বেছে নেন মেহদিয়ান এলাকার  করবস্থানকে৷

এখানে মোনার প্রতিবেশীরা যৌনকর্মী, কবর খননকারী এবং ভিক্ষুক৷ তাঁদের জীবন জড়িয়ে আছে এই কবরের সঙ্গেই৷ তাঁরা কমপ্লেক্সের ভেতরে থাকেন৷ ভেজা জামা-কাপড় শুকোতে দেয় বাইরের সমাধিস্তম্ভের বাইরের দিকে৷

কয়েক দশক ধরে মোনা এখানেই বাস করছেন৷

মোনার বন্ধু ও নারীবাদী লেখক উর্বশী বুটালিয়া বলেন, এক সময় মোনা এই অদ্ভূত এলাকাটি ছাড়তে চাইতেন৷ তাঁর ইচ্ছা ছিল, দিল্লীর কোনো একটি অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে বাস করবেন৷

১৯৫৫ সালে পারিবারিক বাসা থেকে পালিয়েছিলেন মোনা৷ সমাজের মূল স্রোতের বাইরে এই এলাকায় বাস করতে থাকেন৷ ভারত তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিলে ২০১৪ সালে এদের মূল ধারায় ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হয়৷

তবে ফ্ল্যাটে ফেরার পর এটাকে তার কাছে কারাগার মনে হতে থাকে৷ মানুষে গমগম করা স্থানে থাকতেন তিনি৷ সেখানে উৎসবে হিজরাদের ঐতিহ্যবাহী নাচ হতো৷ এ ছাড়ার তাঁর কাছে অনেকেই আসতো পরামর্শের জন্য৷

তবে এই জীবন ছাড়ার পর এককালের পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বাভাবিক জীবন আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না৷ পূর্বের জীবনই হয়তো তার কাছে স্বাভাবিক জীবন৷ পরিবর্তিত জীবন তাঁর কাছে কোনো আবেদনই তৈরি করতে পারেনি৷ এখানে বরং একাকীত্বই তাঁর কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়৷

হিজড়াদের যমপুরী

এশিয়া-প্যাসিফিক ট্র্যান্সজেন্ডার নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠি'র মতো অধিকার কর্মীরা তৃতীয় লিঙ্গের নারীদেরকে আড়াল থেকে বের করতে শুরু করেন৷ সমাজে এই নারীদেরকে সব সময়ই সন্দেহের চোখে দেখা হতো৷

তবে তাঁদের একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে৷ হিন্দু শাস্ত্রে হিজড়াদেরকে ভাগ্যের প্রতীক মনে করা হতো৷ এ কারণে বিয়ে বা জন্মক্ষণে তাঁদের আশীর্বাদ নেয়া হতো৷

তবে এটা তাঁদের জীবনে খুব কম ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পেরেছে৷ ভারতে ২০ লাখের মতো এমন মানুষ রয়েছে৷ তাঁদের অধিকাংশই গরিব পরিবার থেকে এসেছেন৷

যৌবনে মোনাও অন্য হিজড়াদের মতো একজন পুরুষ গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ তিনি হিজড়াদের অন্তরালের জগতকে নিয়ন্ত্রণ করেন৷ এটা হিজড়াদের অন্য রকম পরিবার৷ সেখানে আধিপত্য চলে ওই গুরুর৷ সেখানে সদস্যদের উপর নানা বিধিনিষেধ থাকে৷ তাঁরা পুলিশসহ বাইরের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না৷

শিষ্যত্ব গ্রহণকারী হিজড়াদের বিভিন্ন গ্রুপ বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে৷ নিজ নিজ এলাকায় তাঁরা মালী, বাসার কাজের লোক, দোকানদারদের নিয়ে একটা যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করে৷ তাঁদের মাধ্যমে তাঁরা বিয়ে, শিশুর জন্ম, নতুন চাকুরি, নতুন বাড়িসহ যে কোনো উদযাপনের খবর সংগ্রহ করেন৷

খবর পাওয়ার পর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, অর্থাৎ হিজড়ারা সেখানে গিয়ে টাকা আদায় করেন৷ বিয়ের জন্য নব দম্পত্তিকে ২০ হাজার রূপি দিতে হয়৷ নয়তো তাঁরা জনসম্মুখে নিজেদের জামা-কাপড় খুলে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেন৷ ব্যক্তি ও উপলক্ষ্যভেদে এই টাকা ১ লাখ রূপিও হতে পারে৷

আশীর্বাদের কাজটা হিজড়াদের উঁচু শ্রেণির লোকজনই করে থাকে৷ বাকিদের যৌনকর্মী, ভিক্ষুক হয়েই জীবন কাটাতে হয়৷ 

মেহদিয়ান এলাকার অধিবাসীরা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ দখলদার৷ তাঁরা তাঁদের সম্পত্তির জন্য নামজারি করতে পারেন না৷ যদিও দশকের পর দশক ধরে বেশ কয়েকটি বাড়ি রয়েছে৷

আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হলেও কর্তৃপক্ষ প্রতিরোধের ভয়ে এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করে না৷

মধ্য আশির দশকে মোনা এখানে একখণ্ড জমি নেন৷  সেখানেই এখন তাঁর একটি ঘর রয়েছে৷

তবে তাঁর ঘরের দরজা সব সময়ই খোলা থাকে৷ এমনকি ঘরে ডাকাতির পরও তিনি এই নিয়ম থেকে সরে আসেননি৷ যে কেউ চাইলেই যে কোনো সময় তাঁর ঘরে যেতে পারেন৷

বুটালিয়া বলেন, দরজা কখনো বন্ধ হয় না৷ দরজা ধাক্কা দিলেই ভেতরে ঢোকা যায়৷ তখন হয়তো তিনি নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন৷ কিন্তু এরপরও যে কেউ ঘরে গিয়ে টিভি দেখতে পারে৷ এটা তাঁর কাছে একেবারেই স্বাভাবিক৷ যতদিন তিনি বেঁচে আছেন ততদিনই হয়তো এটা চলবে৷

এসএন/এসিবি (থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন)

নির্বাচিত প্রতিবেদন