সবার ভালোবাসায় ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় | আলাপ | DW | 28.08.2018
  1. Inhalt
  2. Navigation
  3. Weitere Inhalte
  4. Metanavigation
  5. Suche
  6. Choose from 30 Languages

ব্লগ

সবার ভালোবাসায় ক্যানসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়

ভয়াবহ ব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত আমি৷ এখনো চলছে চিকিৎসা৷ খরচ হচ্ছে প্রচুর অর্থ৷ কিন্তু মানুষের ভালোবাসা আর মানসিক শক্তি ভয়াবহ এই ব্যাধির বিরুদ্ধে আমাকে জয়ী হতে সাহায্য করেছে৷ সেই যুদ্ধ জয়ের গল্পই আজ শোনাবো আপনাদের৷

মা-র শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না৷ অনেক দিন ধরে জ্বর, কিছুতেই কমছে না৷ এই হাসপাতাল থেকে ওই হাসপাতাল৷ এই ডাক্তার থেকে ওই ডাক্তার–এই চলছিল৷ ভাবলাম , হাসপাতালেই যেহেতু সময় কাটাচ্ছি , তো আমিও নিজের শরীরটা পরীক্ষা করিয়ে নেই৷

মনে ভীষণ ভয় ছিল, মা-র যেন কঠিন কোনো অসুখ ধরা না পড়ে ! কিন্তু, নিয়তি আমার জন্য আসলে অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল৷  নিজের শরীর পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানতে পারলাম , আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে কঠিন এক রোগ, টিউমার৷

টিউমারটি ভীষণ দ্রুত বড় হচ্ছিল৷ ২ সপ্তাহে ৬ গুণ বড় হয়ে গেল৷ আর দেরি করা যায় না৷ অস্ত্রোপচার করতে হবে, কিন্তু সাথে যাওয়ার কেউ নেই৷ দেশের কোনো ডাক্তার ল্যাপ্রোস্কপিক সার্জারি করতে রাজি হলেন না৷ সাথে যাওয়ার যেহেতু কেউ নেই, তাই আমি একাই রওনা হলাম পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অভিমুখে৷

জীবনের প্রথম সার্জারি আর আমি একদম একা৷ কিন্তু মনের ভয় ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দক্ষিণ ভারতের চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি হলাম৷  একটি কাজের সুবাদে হাসপাতালের অনেক কর্মী আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন, তাই মনে সাহস সঞ্চয় করা আমার জন্য সহজ ছিল৷

ভোর ৭ টায় অপারেশন থিয়েটারের বাইরে আপেক্ষা করছি৷ হাজার রকম চিন্তা আর দুশ্চিন্তা মিলিয়ে বুকের মধ্যে দুরু দুরু ভয়৷ হঠাৎ আমার ডাক্তার মীনাক্ষী সুন্দরম আমার পাশে এসে হাত ধরে আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘‘শ্যামী, তুমি ভয় পেয়ো না৷ তুমি একদম ঠিক হয়ে যাবে, আমি তোমার খেয়াল রাখবো৷''

আমি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাইনি, কিন্তু ডাক্তার মীনাক্ষীর মায়াভরা কথাগুলো আমাকে আশ্বস্ত করতে পেরেছিল সেদিন৷ নিশ্চিন্ত মনে চোখ বুঁজেছিলাম অপারেশন থিয়েটারে৷ চেতনা ফিরে পেতে জানলাম অপারেশন সফল হয়েছে৷ পরের দিন ছাড়া পেলাম ঠিকই, কিন্তু বায়োপ্সি রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে৷ ঘুরে ফিরে ৭ দিন পার করে দিলাম৷ রিপোর্টে জানা গেল, ভয়াবহ ব্যাধি ক্যানসার আমার শরীরে বাসা বেঁধেছে৷ আমার হাতে সময় নেই, একদম নেই৷ সেদিন মনে হয়েছিল যে, জীবনের যাত্রাটা অনেকটা ট্রেন যাত্রার মতো৷ আমার গন্তব্যস্থলে ট্রেন এখনো পৌঁছায়নি, কিন্তু আমাকে ট্রেন থেকে নেমে যেতে হবে৷ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না সেদিনটা আমার কেমন লেগেছিল৷

জীবনযুদ্ধে এভাবে আমি হেরে যাব ভাবতেই ভীষণ খারাপ লাগছিল৷

Journalistin, Shammy Wadud überlebt Krebserkrankung

শ্যামী ওয়াদুদ, সাংবাদিক (ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর আগে)

সেদিন ডাক্তারের কাছ থেকে খবর পেয়ে বন্ধু শাফীক আযম আমার সাথে দেখা করতে এলো৷ অনেক গল্পের ফাঁকে একটা লাইন আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল, ‘‘পৃথিবীতে এমন কোনো তালা তৈরি হয়নি, যেটার চাবি নেই৷''

হোটেলে পৌঁছে হিসাব কষতে শুরু করলাম:

১) সবচেয়ে খারাপ পরিণতি কী হতে পারে ? – আমি মারা যাবো৷

২) আমি মারা গেলে কী হবে ? – পরিবারের সবাই অনেক কষ্ট পাবে৷ আমার মা ভীষণ কষ্ট পাবে, কিন্তু আমার মা, ভাই-বোনদের কারো জীবন থেমে থাকবে না৷ তারা কেউ অথৈ পানিতে পড়বে না৷ সবাই স্বাবলম্বী৷

৩) জীবনে কী চেয়েছি আর কী কী পেয়েছি ! – মোটামুটি সবই পেয়েছি ,

আর যা এখনো পাইনি, সেগুলো আমার জন্য না– এই ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম৷

হাসপাতালের আন্তর্জাতিক বিভাগে কর্মরত বন্ধুরা– জিথু জোস , জর্জ জোসেফ, ইন্দ্রাণী সিনহা , শাফীক আযম সবাই আমার জন্য মন খারাপ করেছিল সেদিন৷ পাশে পরিবারের কেউ ছিল না, কিন্তু এই চার বন্ধু আমার পাশে ছিল পরমাত্মীয় হয়ে পুরোটা সময় জুড়ে৷

রিপোর্ট পেয়ে ডাক্তার মীনাক্ষী জানালেন, আরেকটা সার্জারি করতে হবে, তারপর কেমোথেরাপি শুরু করবেন তাঁরা৷ পরের দিন অনকোলজির (ক্যানসার) সার্জন ডাক্তার অজিত পাই-এর সাথে দেখা করে পরবর্তী অপারেশনের খুঁটিনাটি জেনে নিয়ে গেলাম কেমোথেরাপি ডাক্তারের কাছে৷ ডা. টি. রাজা৷ একবারের জন্যও আমার মনে হয়নি যে, আমি একা এখানে৷ সব জেনে নিয়ে ফিরে এলাম দেশে৷  কারণ, আমি মানসিক ভাবে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত৷  মা-কে খুব মিস করছিলাম৷

Journalistin, Shammy Wadud überlebt Krebserkrankung

শ্যামী ওয়াদুদ, সাংবাদিক (ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর পর)

 রওনা হওয়ার আগেই বড় ভাইকে টেলিফোন করে জানিয়েছিলাম, আমার কী অবস্থা৷ মা-কে বলার সাহস জোগাড় করতে পারছিলাম না৷ বড় ভাই আমাকে নিতে বিমানবন্দরে এসেছিল সেদিন৷ এসেছিল সাহস দিতে, ‘‘বোন আমার, তুই চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা সবাই তোর পাশে আছি৷'' ভাইয়ার কথা শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলাম ৷ দুই দিন নির্ঘুম কাটানোর পর ঢাকায় ফিরে গাড়িতে ঘুমিয়েছিলাম সেদিন৷ বাসায় ফিরে আমি সোজা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ জানি না ভাইয়া কেমন করে মা আর দুই বোনকে জানিয়েছিল৷ কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর মনে হলো যেন কিছুই হয়নি৷ আমি বাসাতেই ছিলাম৷ আমার মা ভীষণ শক্ত মানুষ৷ ঠিকই সামলে উঠেছিলেন৷ পরের দিন আমার কাছে জানতে চাইলেন, কবে যাচ্ছি সার্জারি করাতে৷ খুব একটা অবাক হইনি৷ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানালাম, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ২০১৭-র কাজ হাতে নিয়েছি, ওটা একটু গুছিয়ে নিয়েই রওনা হবো৷ রাজশাহী কিংস-এর সিইও, তাহমিদ হক সব জেনে-শুনে আমাকে খেলার মাঠের পুরো কাজটা দিয়েছিলেন৷ সেইদিন ওই কাজের অনুমোদনপত্র আমাকে এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছিল৷ তাহমিদ ভাইয়ের আমার প্রতি বিশ্বাস আমার জীবনের অনেক বড় একটা মাইলফলক৷ জীবনযুদ্ধে জেতার আশা জুগিয়েছিল মনে৷

এরপর ছোট-বড় ৫ টা সার্জারি আর পাঁচ মাস কেমোথেরাপির পর এই দফা যুদ্ধ আমি জয় করেছি৷  আমি ক্যানসারকে পরাজিত করেছি৷

ক্যানসারের চিকিৎসা ভীষণ ব্যয়বহুল৷ চিকিৎসার মাঝ পর্যায়ে এসে আমার জমানো সব টাকা শেষ হয়ে যায়৷ কিন্তু আমার বন্ধুরা সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো৷ ছোটবোন শারমিনের বিয়ের  জন্য  জমিয়ে রাখা টাকা শারমিন আমাকে  দিয়ে বলেছিলো, ‘‘আপু, আমার বিয়ে  কয়দিন  পর হলেও  কিছু হবে না , কিন্তু  তোমার  কিছু  হলে  তোমাকে কোথায়  পাবো? টাকা আবার আসবে৷ তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে এসো৷''  ছোটবেলার বান্ধবী জিহান তখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা, ওই অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে আমাকে বাসায় এসে টাকা দিয়ে গিয়েছিল৷ জিহান বলেছিল, ‘‘শ্যামী, সামান্য অর্থের অভাবে তুমি হারতে পারো না৷ এই যুদ্ধে তোমাকে জিততেই হবে৷'' একে একে নুপুরজান, তৌফিক, তন্ময়, ডেভিড, সালিম ভাই, চিশতী, সিফাত, প্রদ্যুৎ, সাবরিনা, আরিফ, রাউলফিয়া, অমৃতা,লুশা, শামিমা, পায়েল,জুনান, সামরিন, হাসান ভাই, মাযহার ভাই, ঈশিতা আপু সবাই পাশে দাঁড়িয়েছিল৷

২০১২ সালে চ্যানেল আই ছেড়েছিলাম এবং ঈশিতা আপুর সাথে আমার শেষ দেখা তখনই৷ ৬ বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না৷ কিন্তু আপু আমাকে ঠিকই মনে রেখেছেন৷ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহায্যের হাত৷ নুপুরজানকে বলেছিলাম, কিভাবে তাঁর এত ঋণ আমি শোধ করবো? উত্তরে নুপুরজান আমাকে বলেছিল, ‘‘শ্যামী, তুমি আমার জীবনের একটা অংশ৷ তুমি অস্ট্রেলিয়াতে আমার বাসায় প্লাস্টিকের বোতল কেটে যেই মানিপ্ল্যান্টগুলো লাগিয়ে গিয়েছিলে, গাছগুলোতে নতুন পাতা গজিয়েছে৷ আমার মনে হয়, এই নতুন পাতাগুলোর মতো তুমি আবার সজীব, সতেজ প্রাণ নিয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবে৷'' ঈশিতা আপু আর নুপুরজান আমাকে ভীষণভাবে কাঁদিয়েছিল, কিন্তু সেই কান্না ছিল ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা মেশানো, যা আমাকে জয়ী হওয়ার শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে৷

এই মানুষগুলো আমাকে চিরজীবনের জন্য ঋণী করে ফেলেছে৷ ভালোবাসার এই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করবো সেটা হয়তো শুধু সৃষ্টিকর্তাই বলতে পারবেন৷

নির্বাচিত প্রতিবেদন

বিজ্ঞাপন